আঞ্চলিক রাজনীতির নতুন মাঠ বেলুচিস্তান!

চীন এবং পাকিস্তানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে ভারতের সমর্থন ও সহযোগিতা চেয়েছেন বেলুচিস্তানের প্রখ্যাত নেতা এবং মানবাধিকার কর্মী মীর ইয়ার বালুচ। পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে চীনা সামরিক বাহিনী মোতায়েনের সম্ভাবনা রয়েছে। এমন আশঙ্কা জানিয়ে ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের উদ্দেশ্যে একটি খোলা চিঠি লিখেছেন তিনি।

বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের ভূখণ্ড থেকে লেখা এই চিঠিতে থাকা সতর্কবার্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি এমন ঘটনা ঘটে, তাহলে তা শুধু বেলুচিস্তানের জন্য নয়, ভারতের ভবিষ্যতের জন্যও একটি অপ্রত্যাশিত এবং ভয়াবহ হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

চিঠিতে ভারতের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন ব্যক্ত করেছেন মীর ইয়ার বালুচ। নতুন বছরের প্রথম দিন তিনি এই চিঠি সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ পোস্ট করেন এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকেও ট্যাগ করেন। ২০২৫ সালের মে মাসে বালুচ জাতীয়তাবাদী নেতারা পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন। এখন মীর ইয়ার বালুচ জানাচ্ছেন যে, তাদের ‘রিপাবলিক অব বেলুচিস্তান’ নতুন বছরের প্রথম সপ্তাহে ‘২০২৬ বেলুচিস্তান গ্লোবাল ডিপ্লোমেটিক উইক’ আয়োজন করবে। এর মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বেলুচিস্তানের সরাসরি কূটনৈতিক যোগাযোগ স্থাপিত হবে।

স্বাধীন বেলুচিস্তান রিপাবলিকের প্রতিনিধি হিসেবে দাবি করে ২০২৬ সালের নববর্ষ উপলক্ষে জয়শঙ্করকে এই খোলা চিঠি লিখেছেন মীর ইয়ার। চিঠিতে তিনি অভিযোগ করেছেন যে, পাকিস্তানের অধীনে বেলুচিস্তান দশকের পর দশক ধরে চরম নিপীড়নের শিকার হয়ে আসছে। তার ভাষায়, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সন্ত্রাসবাদ, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং স্বাধীনতাপ্রার্থীদের ওপর সহিংসতা দীর্ঘকাল ধরে চলে আসছে। এই দীর্ঘদিনের সমস্যা এখন মূল থেকে উচ্ছেদ করার উপযুক্ত সময় এসেছে, যাতে বালুচ জাতির জন্য স্থায়ী শান্তিএবং সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত হয়।

মীর ইয়ার লিখেছেন, ‘যদি বেলুচিস্তানের প্রতিরক্ষা ও স্বাধীনতাপ্রার্থী গোষ্ঠীগুলোকে আরও শক্তিশালী না করা হয় এবং পূর্বের মতোই তাদের উপেক্ষা করা চলতে থাকে, তাহলে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে চীন তাদের সামরিক বাহিনী মোতায়েন করে বেলুচিস্তান দখল করতে পারে।’

সতর্ক করে তিনি আরও বলেছেন, ‘৬ কোটি বালুচ জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বেলুচিস্তানের মাটিতে চীনা সেনার পদধ্বনি পড়লে তা কেবল এই অঞ্চলের জন্য নয়, ভারতের ভবিষ্যতের জন্যও একটি ভয়ংকর এবং অকল্পনীয় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।’

চিঠিতে সবচেয়ে জোরালোভাবে উঠে এসেছে পাকিস্তান ও চীনের কৌশলগত মিত্রতা এবং জোটের বিষয়। মীর ইয়ার বালুচের দাবি, চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর (সিপিইসি) এখন তার ‘চূড়ান্ত পর্যায়ে’ পৌঁছেছে।

এই প্রকল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বেলুচিস্তানের ওপর দিয়ে গেছে। প্রকল্পটি দ্রুত সমাপ্তির দিকে এগোনোর কারণে চীন এই প্রকল্পের নামে বেলুচিস্তানে সেনা মোতায়েন করতে পারে।

চিঠিতে মীর ইয়ার ভারতের জনগণকে নতুন বছরের আন্তরিক শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী মোদী সরকারের নিরাপত্তা নীতির প্রশংসা করেছেন। বিশেষভাবে পাকিস্তান-সমর্থিত সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ভারতের দৃঢ় অবস্থানের কথা উল্লেখ করেছেন তিনি।

তার মতে, আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রশ্নে ভারত যদি আরও সক্রিয় ভূমিকা নেয়, তাহলে বেলুচিস্তান তার থেকে উপকৃত হবে।

চিঠিতে মীর ইয়ার ভারতের ‘অপারেশন সিঁদুর’-এরও উচ্চ প্রশংসা করেছেন। কাশ্মীরের পেহলগামে সন্ত্রাসবাদী হামলায় ২৬ জন নিহত হওয়ার প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তান এবং পাক-অধিকৃত কাশ্মীরে ভারতের চালানো এই অভিযানকে তিনি ‘অসাধারণ সাহসিকতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও ন্যায়ের প্রতি অটল প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন’ বলে অভিহিত করেছেন।

চিঠির একটি অংশে ভারত ও বেলুচিস্তানের ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক সম্পর্কের কথাও তুলে ধরেছেন বালুচ নেতা। হিংলাজ মাতা মন্দির (ননি মন্দির) এবং তার সংলগ্ন জাতীয় উদ্যানের উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, এই পবিত্র তীর্থস্থান দুই অঞ্চলের আধ্যাত্মিক ও সভ্যতাগত বন্ধনের জ¦লন্ত প্রতীক।

তার মতে, এই সম্পর্ক শুধু সাংস্কৃতিক নয়, কৌশলগত সহযোগিতার ক্ষেত্রেও ভিত্তি প্রদান করতে পারে। ভারত ও বেলুচিস্তানের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন তিনি।