দেশের বাজারে চিনি, এলপিজি ও ভোজ্য তেলের দামে অস্বাভাবিক এবং ধারাবাহিক বৃদ্ধিকে অযৌক্তিক বলে মনে করছে কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। বিভিন্ন গণমাধ্যমের উদ্ধৃতি দিয়ে ক্যাব দাবি করেছে, আমদানি, মিলপর্যায়ে উৎপাদন ও সরবরাহে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে একটি প্রভাবশালী চক্র সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ এবং সিন্ডিকেট করে চিনির বাজারকে অস্থির করে তুলেছে। একই সঙ্গে এলপিজি, সয়াবিন ও পাম তেলের বাজারেও অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়ানো হচ্ছে। যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যয়ের ওপর। ক্যাব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির তীব্র নিন্দা জানানোর পাশাপাশি জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।
গতকাল শনিবার ক্যাবের পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব দাবি জানানো হয়।
ক্যাবের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এক সপ্তাহ আগেও যেখানে চিনির দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল, বর্তমানে পাইকারি বাজারে হঠাৎ করেই দাম বেড়ে গেছে এবং খুচরা বাজারে প্রতি কেজি চিনির দাম কেজিপ্রতি ১০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। সাদা চিনির আমদানি কার্যত বন্ধ থাকা এবং মিলপর্যায়ে উৎপাদন ও সরবরাহে ঘাটতির অজুহাত দেখিয়ে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করাই এই মূল্যবৃদ্ধির মূল কারণ। রমজানের আগে সুকৌশলে চিনির দাম বাড়ানো প্রতিবছরের রীতিকে অনুসরণ করে ব্যবসায়ীরা এ কারসাজির আশ্রয় নিয়েছেন।
অন্যদিকে, সাম্প্রতিক সময়ে সয়াবিন ও পাম তেলের দাম প্রতি লিটারে ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। টিসিবির তথ্য অনুযায়ী গত এক বছরে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম খুচরাপর্যায়ে ১২ দশমিক ৮৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতির অজুহাত দেখিয়ে ভোজ্য তেলের দাম বাড়ানো হলেও দাম কমার ক্ষেত্রে একই ধরনের দ্রুততা বা উদ্যোগ দেখা যায় না। ফলে ভোক্তারা একতরফাভাবে মূল্যবৃদ্ধির চাপ বহন করতে বাধ্য হচ্ছেন। এ ছাড়া বিনা কারণে এলপিজির দাম বাড়ানোর কোনো যুক্তিসংগত কারণ নেই। এলপিজির চাহিদা বাড়ার অজুহাতে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি দাম নিচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে আমদানিকারক ও তাদের পরিবেশকদের কারসাজি থাকতে পারে। যেহেতু বিইআরসি দাম নির্ধারণ করেই ক্ষান্ত, সে কারণে ব্যবসায়ীরা সরকারের নির্ধারিত দামকে উপেক্ষা করে তাদের মতো করেই দাম নেন। এটা যেন রীতিতে পরিণত হয়েছে।
ক্যাব মনে করে, রমজান ও আসন্ন বিভিন্ন উপলক্ষকে সামনে রেখে প্রশাসনিক ব্যস্ততার সুযোগ নিয়ে অসাধু ব্যবসায়ী এবং সিন্ডিকেট চক্র পরিকল্পিতভাবে চিনি ও ভোজ্য তেলের বাজারে কারসাজি করছে। প্রকৃত সরবরাহ পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক বাজারের দামের সঙ্গে বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির কোনো যৌক্তিক সামঞ্জস্য নেই। এটি স্পষ্টভাবে বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও কার্যকর নজরদারির অভাবের প্রতিফলন।
ক্যাবের মতে, চিনি ও ভোজ্য তেলের মতো মৌলিক নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার যদি এভাবে সিন্ডিকেটের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়, তবে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বাজারব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা আরও দুর্বল হয়ে পড়বে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ক্যাব সরকারের কাছে সাতটি দাবি বাস্তবায়নের অনুরোধ করেছে। এই দাবিগুলোর হলো মিলপর্যায়ে চিনি উৎপাদন, মজুদ ও সরবরাহের প্রকৃত তথ্য যাচাই করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের চিহ্নিত করা, চিনি ও ভোজ্য তেলের বাজারে সিন্ডিকেট ও মজুদদারদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা। ভোজ্য তেলের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারদর, আমদানিব্যয় ও স্থানীয় বাজার মূল্যের মধ্যে যৌক্তিক সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা। পাইকারি ও খুচরা বাজারের দামের অযৌক্তিক ব্যবধান কমাতে কার্যকর প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ জোরদার করা। এলপিজির দাম নির্ধারিত দামে বিক্রিতে মাঠপর্যায়ে জেলা প্রশাসন, ভোক্তা অধিদপ্তর ও আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষের কার্যকর সমন্বয় জোরদারে জ¦ালানি মন্ত্রণালয়কে উদ্যোগে নিতে হবে। এলপিজির আমদানিকারক ও তাদের পরিবেশকদের মজুদ, সরবরাহ ও খুচরা বিক্রির তদারকি জোরদার করা এবং নিত্যপণ্যের বাজার তদারকি যেন নির্বাচন বা অন্য যেকোনো অজুহাতে জেলা/উপজেলা প্রশাসনের অগ্রাধিকার তালিকা থেকে সরে না যায়, সেজন্য সরকারের শীর্ষপর্যয়ের নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন।