আত্মশুদ্ধি সফলতার মানদণ্ড

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কোরআনে মানবজীবনের সাফল্য ও ব্যর্থতার মাপকাঠি সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে দিয়েছেন। দুনিয়ার ধন-সম্পদ, ক্ষমতা, খ্যাতি কিংবা বাহ্যিক অর্জন মহান আল্লাহর কাছে সফলতার মানদণ্ড নয়। বরং সফলতা নির্ধারিত হয় মানুষের নফস ও অন্তরের পরিশুদ্ধতার ওপর। মহান আল্লাহ সুরা শামসে সফলতা ও ব্যর্থতার মানদণ্ড স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই সে সফল হয়েছে, যে নিজের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করেছে। আর সে ব্যর্থ হয়েছে, যে সেটাকে কলুষিত করেছে।’ (সুরা শামস, আয়াত ৯-১০)

আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.) তাফসিরে কোরআনুল আজিমে এ আয়াত দুটির ব্যাখ্যায় বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে নিজের নফসকে পবিত্র করেছে, সেই সফল হয়েছে। আর যে ব্যক্তি গুনাহ ও অবাধ্যতার মাধ্যমে নফসকে ধ্বংস করেছে, সেই ব্যর্থ হয়েছে। এ সত্যকে মানুষের অন্তরে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য মহান আল্লাহ সুরা শামসে একের পর এক মোট ১১টি বিষয়ের কসম করেছেন। যেমন সূর্য, চন্দ্র, দিন, রাত, আকাশ, পৃথিবী এবং মানুষের নফসের। এর উদ্দেশ্য একটাই, মানুষ যেন উপলব্ধি করে, নফসের পরিশুদ্ধি কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়, এটি জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

বিখ্যাত মনীষী শেখ সাদি (রহ.) পরিশুদ্ধ নফসের আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, বিশুদ্ধ নফস হলো ওই নফস, যে নফসে আম্মারার অনুসরণ করে না। অর্থাৎ নফস যে কাজে টানে, যদি তা মহান আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে হয়, তবে বুঝে নিতে হবে সেটাই মন্দ কাজ। সে কাজ পরিত্যাগ করাই হলো ইসলাহে নফস, আর এই চেষ্টার নামই তাজকিয়া বা আত্মশুদ্ধি।

মনে রাখতে হবে নফস একটিই। ওলামায়ে কেরামের সর্বসম্মত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কর্মগুণে নফস তিন স্তরের হয়ে থাকে। ১. নফসে আম্মারা বা মন্দ কাজে প্ররোচনাকারী নফস। ২. নফসে লাওয়ামাহ বা গুনাহের কারণে নিজেকে তিরস্কারকারী নফস। ৩. নফসে মুতমাইন্নাহ বা নেক আমলে প্রশান্ত নফস। এ তিন প্রকার নফসের আলোচনা কোরআনে এসেছে।

প্রথম প্রকার নফস সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই নফস মন্দ কাজের নির্দেশ দেয়।’ (সুরা ইউসুফ, আয়াত ৫৩) দ্বিতীয় প্রকার নফসের উল্লেখ রয়েছ সুরা কিয়ামায়। ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি শপথ করি কেয়ামত দিবসের। আরও শপথ করি সেই মনের, যে নিজেকে ধিক্কার দেয়।’ (সুরা কিয়ামা, আয়াত ১-২)

তাফসিরে মারেফুল কোরআনে নফসে লাওয়ামাহ সম্পর্কে বলা হয়েছে, নফসে লাওয়ামাহ এমন একটি নফস, যে নিজের কাজকর্মের হিসাব নিয়ে নিজেকে ধিক্কার দেয়। অর্থাৎ কৃত গুনাহ অথবা ওয়াজিব কর্মে ত্রুটির কারণে নিজেকে ভর্ৎসনা করে। সৎকর্ম সম্পর্কেও নিজেকে এই বলে তিরস্কার করে যে, আরও বেশি সৎকাজ সম্পাদন করে উচ্চমর্যাদা লাভ করলে না কেনো? হজরত হাসান বসরি (রহ.) নফসে লাওয়ামাহ-এর তাফসির করেছেন, ‘নফসে মুমিনা’। তিনি বলেন, আল্লাহর কসম! মুমিন তো নিজেকে সর্বাবস্থায় ধিক্কায় দেয়। সৎকর্মসমূহেও সে আল্লাহর শানের মোকাবিলায় আপন কর্মে অভাব ও ত্রুটি অনুভব করে। কেননা আল্লাহর হক পুরোপুরি আদায় করা সাধ্যাতীত ব্যাপার। ফলে তার দৃষ্টিতে ত্রুটি থাকে এবং তার জন্য নিজেকে ধিক্কার দেয়।

তৃতীয় প্রকার নফসের আলোচনা এসেছে সুরা ফাজরে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে প্রশান্ত আত্মা! তুমি তোমার পালনকর্তার কাছে ফিরে যাও সন্তুষ্ট ও সন্তোষভাজন হয়ে। অতঃপর আমার বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও; এবং আমার জান্নাতে প্রবেশ করো।’ (সুরা ফাজর, আয়াত ২৭-৩০)

তাফসিরে মারেফুল কোরআনে নফসে মুতামায়িন্নাহ সম্পর্কে বলা হয়েছে, এ আত্মা আল্লাহর প্রতি তার সৃষ্টিগত ও আইনগত বিধিবিধানে সন্তুষ্ট এবং আল্লাহও তার প্রতি সন্তুষ্ট। মহান রাব্বুল আলামিন এসব প্রশান্ত আত্মাকে সম্বোধন করে বলেন, আমার বিশেষ বান্দাদের কাতারভুক্ত হয়ে যাও এবং আমার জান্নাতে প্রবেশ করো। ধারাবাহিক সাধনা ও আত্মসংযমের মাধ্যমে। আম্মারাহ নফসই ধীরে ধীরে লাওয়ামাহ, তারপর মুতমাইন্নাহতে রূপান্তরিত হয়।

পৃথিবীর বুকে নবী প্রেরণের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো মানুষের নফস পরিশুদ্ধ করা। মহান আল্লাহ সুরা আলে ইমরানের ১৬৪ নম্বর আয়াতে নবীর অন্যতম কাজ হিসেবে তাজকিয়া বা আত্মশুদ্ধির উল্লেখ করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নবীর অন্যতম কাজ হলো ইউজাক্কিহিম বা রাসুল তাদের আত্মশুদ্ধি করেন।’ অর্থাৎ অন্তরের রোগ দূর করে উত্তম গুণাবলি স্থাপন করেন। এটি আমাদের ওপর মহান আল্লাহর বিশেষ ইহসান যে, আমাদের নফসকে ইসলাহ করে দেওয়া, পাক-সাফ করে দেওয়ার দায়িত্ব তিনি তার প্রিয় নবীর ওপর ন্যস্ত করেছেন।

পীর মাশায়েখ ও সুফিরা বলেন, আত্মশুদ্ধির রয়েছে দুই ধাপ, তাখলিয়া ও তাহলিয়া। তাখলিয়া মানে খালি করা, মুক্ত করা ও পরিচ্ছন্ন করা। আর তাহলিয়া মানে সাজানো, সুসজ্জিত করা ও পরিপাটি করা। প্রথম কাজ তাখলিয়া অর্থাৎ অন্তরের বিশেষ দশটি রোগ থেকে অন্তরকে পাক-সাফ করতে হবে। এই পাক-সাফ করার নামই তাখলিয়া। জনৈক সুফি বলেন, তুমি যদি তোমার দিলকে আয়নার মতো ঝকঝকে পরিষ্কার করতে চাও, তাহলে দিল থেকে দশটি জিনিস বের করে দাও। তা হলো লোভ, দীর্ঘ আশা, রাগ, মিথ্যা, গিবত, কৃপণতা, হিংসা, রিয়া, অহংকার ও বিদ্বেষ। এই দশটি রোগ ভেতর থেকে আগে বের করতে হবে। রোগ ভেতরে রেখে যত চেষ্টাই করা হোক, কাজ হবে না, সবই বিফলে যাবে। এ জন্য সবার আগে চেষ্টা করতে হবে অন্তর থেকে রোগ বের করে দেওয়ার। আগে রোগ দূর হবে, তারপরই সুস্থতা আসবে।

আর দ্বিতীয় কাজ হলো তাহলিয়া অর্থাৎ উত্তম গুণাবলি দিয়ে অন্তরকে সুসজ্জিত করা। এর মধ্যে মৌলিক গুণ ৯টি। এই ৯টি গুণ অবশ্যই অর্জন করতে হবে।

জনৈক কবি বলেন, যদি চাও মহান আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে, তাহলে নিজের নফসকে ৯টি জিনিসের তালিম দাও। তা হলো সবর বা ধৈর্য, শোকর বা কৃতজ্ঞতা, কানাআত বা অল্পে তুষ্ট থাকা, ইলম বা জ্ঞান, একিন বা বিশ্বাস, তাফবিয বা আল্লাহর কাছে নিজেকে সোপর্দ করা, তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর ওপর ভরসা, রেজা বা আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকা এবং তাসলিম বা মহান আল্লাহর পূর্ণ আনুগত্য করা।

আত্মা পরিশুদ্ধ করতে চাইলে এ ৯টি গুণ অর্জন করতেই হবে। তবে এগুলো অর্জনের আগে যে দশটি দোষের কথা বলা হলো, সেগুলো বর্জন করতে হবে। এই অর্জন ও বর্জনের নামই হলো ইসলাহে নফস। নফসের পরিশুদ্ধি ছাড়া জান্নাতে যাওয়ার কোনো বিকল্প পথ নেই। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে আত্মশুদ্ধির পথে অবিচল থাকার তওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল চরপাথালিয়া সালমান ফারসী (রা.) মাদরাসা, গজারিয়া, মুন্সীগঞ্জ