আঞ্চলিক প্রতিপক্ষ দুর্বল হবে?  

ভেনেজুয়েলায় কী হয়েছে, আমরা জানি। বাস্তবতা হচ্ছে জোরপূর্বক সরকার পরিবর্তন, মার্কিন গণতন্ত্র এবং নোবেল রাজনীতির মধ্যে এক গভীর সংযোগ তৈরি করেছে। সামগ্রিকভাবে, ভেনেজুয়েলার সরকার পরিবর্তন আন্দোলন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয় নীতি এবং মাচাদোর নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রাপ্তি এই তিন বিষয় একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এটা সত্য, ভেনেজুয়েলা একটি কর্র্তৃত্ববাদী শাসকের অধীনে ছিল এবং দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক ও মানবিক সংকটে ভুগছে। বিরোধীদলীয় নেত্রী ও ২০২৫ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী মারিয়া কোরিনা মাচাদো প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো সরকারের বিরুদ্ধে জোরালো অবস্থান নিয়েছিলেন। তিনি সেখানে ডাক দিয়েছিলেন গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে আন্তর্জাতিক সমর্থনের পাশাপাশি সরকার পরিবর্তনের। নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার পর, মাচাদো জনগণের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা এবং এডমুন্ডো গঞ্জালেজ উরুতিয়াকে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এর আগে তিনি প্রকাশ্যে মার্কিন হস্তক্ষেপের আহ্বান জানান এবং তার নোবেল পুরস্কার তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে উৎসর্গ করেছিলেন, যা নোবেল পুরস্কারের রাজনৈতিক ব্যবহার নিয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর, মাচাদো জোর দিয়ে বলেন ‘ভেনেজুয়েলা ইতিমধ্যে রাশিয়ান এবং ইরানি এজেন্ট, সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এবং মাদক কার্টেল দ্বারা নিয়ন্ত্রন্ত্রিত হচ্ছে’ এবং ‘জনসংখ্যার ৬০ শতাংশ রাশিয়ানদের জন্য কাজ করে।’ তারপর অনেক ঘটনা। ভেনেজুয়েলার দৃষ্টান্ত স্পষ্টত দেশটির সার্বভৌমত্ব এবং জাতিসংঘ সনদের উল্লেখযোগ্য লঙ্ঘন। জাতিসংঘের মহাসচিব উল্লেখ করেছেন যে, এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইনের নিয়মগুলো পূরণ করা হয়নি।

রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা দিয়েছেন যে এখন থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলাকে ‘চালনা’ করবে এবং আরও ব্যাপক শক্তি প্রয়োগের হুমকির মুখে, রাজনৈতিক পরিবর্তন বা শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করবে। এছাড়াও, কথিত ‘চুরি’ বা জাতীয়করণকৃত মার্কিন সম্পদ এবং তেলের ক্ষতিপূরণ হিসেবে তহবিল এবং সম্পদ আহরণের জন্য তারা শক্তি ব্যবহার করার দৃঢ় সংকল্প করেছে। হোয়াইট হাউজ দাবি করেছে তারা আমেরিকান জনগণকে ‘মাদক-সন্ত্রাসীদের’ অবৈধ মাদক আমদানির ভয়াবহ পরিণতি থেকে রক্ষা করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ করেছে যে, মাদুরো ২০২৪ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কারচুপি করেছিলেন, যে নির্বাচনে বিরোধী প্রার্থী এডমুন্ডো গঞ্জালেস উরুতিয়া প্রকৃত বিজয়ী ছিলেন এবং ভেনেজুয়েলার কর্র্তৃপক্ষ ২০২৫ সালের সংসদীয় নির্বাচনের ফলাফল জাল করেছিলেন। তবে সন্দেহ নেই যে, ঐ নির্বাচনী প্রক্রিয়া ত্রুটিপূর্ণ ছিল। ওয়াশিংটন বছরের পর বছর ল্যাটিন আমেরিকাকে অবহেলা করার পর, ট্রাম্প যদি সফল হন তাহলে তিনি ভেনেজুয়েলাকে একটি আজ্ঞাবহ রাষ্ট্রে পরিণত এবং পশ্চিম গোলার্ধকে মার্কিনপন্থি শক্তির অঞ্চলে রূপান্তরিত করার প্রচেষ্টাকে এগিয়ে নিতে পারেন।

ভেনিজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট মাদুরোর ক্ষমতাচ্যুতির বিষয়ে প্রকাশ্যে তীব্র সমালোচনা করে আসছেন। কিন্তু গত রবিবার ট্রাম্প হুমকি দিয়ে বলেন ‘যদি তিনি যা সঠিক, তা না করেন, তাহলে তাকে অনেক বড় মূল্য দিতে হবে, সম্ভবত মাদুরোর চেয়েও বড়’। এমন হুমকি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে : ওয়াশিংটন কি সত্যিই ভেনেজুয়েলার নেতাদের অফশোর নৌবাহিনী, বিশেষ বাহিনীর অভিযান, গোয়েন্দা অভিযান বা বিমান হামলার হুমকির মাধ্যমে মেনে নিতে বাধ্য করতে পারে? ন্যাটোতে নিযুক্ত প্রাক্তন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ইভো ডালডার সিএনএনকে বলেন যে ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষে ভেনেজুয়েলাকে সঠিকভাবে পরিচালনা করার জন্য, প্রয়োজনীয় প্রতিশ্রুতি না দিয়ে ‘চালানো’ অসম্ভব। নিকোলাস মাদুরোর স্বৈরশাসনের পতন ল্যাটিন আমেরিকার জন্য বিরাট সুখবর। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে, ভেনেজুয়েলার একনায়ক এবং তার পূর্বসূরি হুগো শ্যাভেজ এই অঞ্চল জুড়ে সমাজতন্ত্রের প্রধান সমর্থক ছিলেন। এটি কেবল ভেনেজুয়েলাকেই নয়, অন্য দেশগুলোকেও বামপন্থি কর্র্তৃত্ববাদ এবং অর্থনৈতিক পতনের দিকে পরিচালিত করেছিল। যদিও মাদুরো শাসনের অবসান সুসংবাদ, তবু ভেনেজুয়েলা দখল বা শাসন করা আমেরিকার জন্য ভুল হবে। দেশটিতে একজন বৈধ রাষ্ট্রপতি আছেন, এডমুন্ডো গঞ্জালেজ উরুতিয়া, যিনি ২০২৪ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ৬৭ শতাংশেরও বেশি ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছিলেন। বিরোধীদলীয় নেতা মারিয়া করিনা মাচাদোর সমর্থনে, যিনি তখন প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে নিষিদ্ধ ছিলেন এবং সম্প্রতি ভেনেজুয়েলায় গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টার জন্য নোবেল শান্তি পুরস্কার জিতেছেন।  গঞ্জালেজ উরুতিয়া দেশটির ক্ষমতা গ্রহণ করতে প্রস্তুত, যেখানে গৃহযুদ্ধ বা সামাজিক পতনের কোনো ঝুঁকি নেই। তাকে এখন অন্তর্বর্তীকালীন রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিতে হবে এবং একটি নতুন নির্বাচনের ডাক দিতে হবে। এটি ২৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে ভেনেজুয়েলার নাগরিকরা যে দুঃসহ যন্ত্রণা সহ্য করেছে, তার অবসান ঘটাতে পারে। এই অভিযানের তিনটি মূল বিষয় হচ্ছে প্রথমত, এটি সাম্প্রতিক ভেনেজুয়েলার ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত, বিশেষ করে বৃহত্তর ল্যাটিন আমেরিকান মানুষের জন্য। ট্রাম্পের ঘোষণায় স্পষ্ট হয়ে গেছে যে এই অভিযান একটি শাসন-পরিবর্তনের প্রচেষ্টা। দ্বিতীয়ত, মার্কিন সামরিক অভিযান ভেনেজুয়েলায় সরাসরি মার্কিন সম্পৃক্ততার এক নতুন স্তরের সূচনা, তবে শেষ নয়। ট্রাম্প নিশ্চিত করেছেন যে ভেনেজুয়েলা পরিচালনার জন্য একটি দল মনোনীত করা হয়েছে, যেখানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব রদ্রিগেজের সঙ্গে জড়িত থাকবেন। যদিও মার্কিন বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর চারপাশে নিরাপত্তা প্রদান করবে বলে আশা করা হচ্ছে। আধাসামরিক গোষ্ঠী, গেরিলা এবং আন্তর্জাতিক কার্টেল দ্বারা জর্জরিত এই দেশে বৃহত্তর জননিরাপত্তা এবং নাগরিকদের সুরক্ষা এখনো চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। শত শত রাজনৈতিক বন্দি এখনো আটকে আছে, তাদের ভাগ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তৃতীয়ত, আজকের পদক্ষেপগুলো ট্রাম্পের নতুন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের প্রথম বাস্তব অর্জন, যেখানে পশ্চিম গোলার্ধের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ট্রাম্প স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, এ অঞ্চলে ভবিষ্যতে মার্কিন অভিযানগুলোর বিষয়ে। তিনি কলম্বিয়া এবং কিউবাকে এমন দেশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যাদের নেতাদের এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা না করার পরিণতি সম্পর্কে জানা উচিত। চতুর্থত, ভেনেজুয়েলায় চূড়ান্ত পরিণতির জন্য মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দায়ী থাকবে। বর্তমানে চ্যালেঞ্জ হবে এমন একটি দেশে, একটি ‘নিরাপদ এবং ন্যায়সংগত রূপান্তর’ নিশ্চিত করা যেখানে প্রকৃত পরিবর্তন মার্কিন স্বার্থ এবং ভেনেজুয়েলার জনগণের জন্য মৌলিক।

মাদুরোকে অপসারণের জন্য ট্রাম্পের সাহসী অভিযানের সাফল্য, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বব্যাপী হুমকি সৃষ্টি করবে। শনিবারের সফল অভিযান শুক্রবার ইরানের নেতাদের কাছে ট্রাম্পের ‘লকড অ্যান্ড লোডেড’ বার্তাটিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ। তবে, ভেনেজুয়েলার অভিযানের পরিকল্পনা করতে কয়েক মাস সময় লেগেছে এবং এমন কোনো লক্ষণ নেই যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইরানে অনুরূপ কিছু করার ক্ষমতা বা উদ্দেশ্য আছে। ভেনেজুয়েলায় অভিযান এবং স্বৈরশাসক নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রীকে গ্রেপ্তারের ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব সীমিত হতে পারে। কারণ বিশ্বব্যাপী ক্ষমতার ভারসাম্যের ওপর এর প্রভাব হবে ক্ষীণ। তবুও, দুটি ছোট কিন্তু সম্ভাব্য তাৎপর্যপূর্ণ পূর্বাভাস দেওয়া যেতে পারে। প্রথমত, ভবিষ্যতে অন্য বৃহৎ শক্তিগুলো, বলতে পারে যে আক্রমণটি বৈধ ছিল, কারণ মাদুরো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অভিযোগের মুখোমুখি ছিলেন। কেউ কল্পনা করতেই পারে যে, তাইওয়ানের নেতার বিরুদ্ধে চীনা অভিযোগ, তাইওয়ানের ওপর চীনা আক্রমণকে বৈধ করবে। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুক্তি দেবে যে এটি অযৌক্তিক, কারণ মার্কিন অভিযোগ বৈধ ছিল। দ্বিতীয়ত, এই আক্রমণ মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির অস্থিরতার ওপর অন্যান্য দেশের বিশ্বাসকে আরও গভীর করবে। ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে আড়ালে থাকা নেতারা সম্ভবত আরও সাবধানতার সঙ্গে চিন্তা করবেন যে, তারা কীভাবে তাদের শাসন ধরে রাখতে পারেন। এর অর্থ চীন বা রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলা। অথবা কারাকাসের মতো একই ধরনের প্রচারণা এড়াতে আরও ভালো এবং স্পষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করা। আরও ভয়ের সঙ্গে সতর্ক চিন্তাভাবনা করা হবে, কীভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াই করা যায়।

জ্বালানির দৃষ্টিকোণ থেকে, ভেনেজুয়েলার ওপর মার্কিন চাপ একটি কারণ। বিশ্বব্যাপী তেল বাজারে প্রচুর সরবরাহ রয়েছে, যেখানে ভেনেজুয়েলা চীন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেল আমদানিতে ৪ শতাংশ অবদান রাখে। ভেনেজুয়েলার ওপর মার্কিন চাপ চীনা ‘টিপট’ শোধনাগারগুলো সস্তা ব্যারেলের ক্ষতি করবে। এটি চীনের তেল খাতের জন্য একটি বড় হুমকি। দীর্ঘমেয়াদে, ভেনেজুয়েলা বিশ্ব তেল বাজারে অনেক বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। কারণ এর বিশাল, এমনকি ব্যয়বহুল মজুদ রয়েছে। মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার ফলে আমেরিকার এক ঢিলে একাধিক পাখি মারার সম্ভাবনা রয়েছে। বিষয়টি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তেল সরবরাহ বৃদ্ধি করবে এবং তেলের দাম কমাতে পারে। মাদক পাচার রোধ হবে। চীন, রাশিয়া এবং ইরানকে তাদের কৌশলগত অবস্থান থেকে সরিয়ে আনবে এবং কিউবা এবং নিকারাগুয়ার মতো অন্যান্য আঞ্চলিক প্রতিপক্ষকে দুর্বল করে দিতে পারে। আবার এটি ভেনেজুয়েলার সম্পদের জন্য ধাক্কাও ডেকে আনতে পারে। বিশেষ করে চীন তেল প্রবাহ, ৬০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি ঋণে ডুবে যাওয়া এবং পশ্চিম গোলার্ধে তার নির্ভরযোগ্য রাজনৈতিক অবস্থান হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে। কিন্তু ভিন্ন একটি সমস্যাও দেখা দিতে পারে। ভবিষ্যতে অন্য কোনো দেশ যদি একই পথ অনুসরণ করে তখন কী হবে!

লেখক: গবেষক ও প্রাবন্ধিক 

avijitbarua3@gmail.com