কেয়ামতে আলেমদের অগ্রভাগে অবস্থানকারী সাহাবি

হজরত মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) ছিলেন ইসলামের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তার উপনাম আবু আবদুর রহমান। তিনি খাজরাজ গোত্রের একজন প্রসিদ্ধ আনসারি সাহাবি এবং নিজ গোত্রের শ্রেষ্ঠ যুবক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। শারীরিক গঠনে ছিলেন অত্যন্ত সুদর্শন। শুভ্র ও দীপ্তিময় গাত্রবর্ণ, ঝকঝকে দাঁত এবং সুরমাকালো পাপড়ির চোখ তার সৌন্দর্যকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছিল। বাহ্যিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি তিনি ছিলেন অসাধারণ মেধাবী, প্রখর বুদ্ধিমান, সহনশীল, উদার ও বদান্য চরিত্রের অধিকারী। তিনি কেয়ামত দিবসে আলেমদের অগ্রভাগে অবস্থান করবেন।

ইলম ও ফিকহের জগতে তার মর্যাদা ছিল অতুলনীয়। প্রসিদ্ধ গ্রন্থ আল-হিলয়াতে ইমাম আবু নুয়াইম (রহ.) তাকে ফকিহদের ইমাম এবং ওলামায়ে কেরামের জ্ঞানভাণ্ডার বলে আখ্যায়িত করেছেন। দানশীলতায় তিনি ছিলেন অনন্য। দুহাতে খরচ করতেন। আল্লাহর পথে অকাতরে দান-সদকা করতেন।

মাত্র আঠারো বছর বয়সে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং ঐতিহাসিক আকাবার বাইয়াতে শরিক হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। বিশ বছর বয়সে তিনি বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং এরপর ওহুদসহ প্রায় সব যুদ্ধেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে অংশগ্রহণ করেন। সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে তিনি একজন বিশিষ্ট ফকিহ হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত ছিলেন।

হজরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করিম (সা.) মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) সম্পর্কে বলেন, ‘আমার উম্মতের মধ্যে হালাল ও হারাম সম্পর্কে সর্বাধিক জ্ঞান রাখে মুয়াজ ইবনে জাবাল।’ (জামে তিরমিজি ৩৭৯০) হজরত মুহাম্মদ ইবনে কাব কুরাজি (রহ.) থেকে (মুরসাল সূত্রে) বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কেয়ামতের দিন মুয়াজ ইবনে জাবাল ওলামায়ে কেরামের অগ্রভাগে অবস্থান করবে।’ (জামে সগির ৮১৬৭)

রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। নবীজি (সা.) একদিন তাকে বলেন, ‘হে মুয়াজ! আমি তোমাকে ভালোবাসি।’ মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.)-ও জবাব দিলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমিও আপনাকে ভালোবাসি।’ (আদাবুল মুফরাদ ৫৩৩)

হিজরতের পর রাসুলুল্লাহ (সা.) হজরত জাফর ইবনে আবু তালিব (রা.) ও হজরত মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.)-এর মাঝে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন স্থাপন করেন। আবার কোনো কোনো বর্ণনায় হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর সঙ্গে তার ভ্রাতৃত্ব স্থাপনের কথাও উল্লেখ আছে।

তিনি কোরআনুল কারিমের নির্ভরযোগ্য কারি ও গভীর পাণ্ডিত্যের অধিকারী আলেম ছিলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগেই তিনি অন্যান্য সাহাবির সঙ্গে পবিত্র কোরআন সংকলনের সৌভাগ্য অর্জন করেন। (সহিহ বুখারি ৫০০৩)

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে নবীজি (সা.) ইরশাদ করেন, ‘তোমরা চারজনের কাছ থেকে কোরআন শিক্ষা করো। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.), উবাই ইবনে কাব (রা.), মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) এবং আবু হুজায়ফা (রা.)-এর মুক্ত দাস সালিম (রা.) থেকে।’ (সহিহ বুখারি ৩৮০৮)

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সময়েই হজরত মুয়াজ (রা.) একজন নির্ভরযোগ্য মুফতি হিসেবে গণ্য হন। মক্কা বিজয়ের পর যখন নবীজি (সা.) হুনায়নের যুদ্ধের উদ্দেশে রওয়ানা হন, তখন তিনি মুয়াজ (রা.)-কে মক্কায় রেখে যান, যাতে তিনি মানুষকে দ্বীন ইসলাম ও কোরআনের শিক্ষা দিতে পারেন। (মুসতাদরাকে হাকেম ৫২৬৯)

পরবর্তী সময় তাকে ইয়েমেনের আল-জান্দ অঞ্চলে দাঈ ও মুবাল্লিগ হিসেবে প্রেরণ করা হয়। তার আন্তরিক দাওয়াত ও প্রজ্ঞাপূর্ণ তাবলিগের ফলে ইয়েমেনের শাসক ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ইসলাম গ্রহণ করেন। এরপর রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে ইয়েমেনের গভর্নর নিযুক্ত করে পাঠান এবং ইয়েমেনবাসীর উদ্দেশে লিখিত চিঠিতে বলেন, ‘আমি তোমাদের কাছে আমার লোকদের মধ্য থেকে সর্বোত্তম ব্যক্তিকে পাঠালাম।’

ইয়েমেনে প্রেরণের সময় নবীজি (সা.) তাকে গুরুত্বপূর্ণ নসিহত প্রদান করেন। তিনি আদেশ করেন মানুষের জন্য সহজতা অবলম্বন করতে, কঠোরতা আরোপ না করতে, সুসংবাদ দিতে এবং এমন কিছু না বলতে যাতে তারা দ্বীন থেকে বিমুখ হয়। বিচারকার্যে কোরআন ও সুন্নাহ অনুসরণের নির্দেশ দেন এবং নতুন সমস্যায় ইজতিহাদের অনুমতিও প্রদান করেন। (সহিহ মুসলিম ১৭৩৩)

রাসুলুল্লাহ (সা.) ওফাতের সময় হজরত মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) ইয়েমেনে ছিলেন। পরে হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর খেলাফতকালে তিনি মদিনায় ফিরে আসেন এবং হজরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.)-এর শাসনামলে তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শদাতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ওমর (রা.) তার ফিকহ ও প্রজ্ঞাকে এতটাই গুরুত্ব দিতেন যে, একবার বলেছিলেন ‘মুয়াজ না থাকলে ওমর ধ্বংস হয়ে যেত।’ এক ভাষণে হজরত ওমর (রা.) ঘোষণা করেন, ‘যে ব্যক্তি দ্বীন ও ফিকহের জ্ঞান অর্জন করতে চায়, সে যেন মুয়াজ ইবনে জাবাল রাদিআল্লাহু আনহুর নিকট যায়।’

হজরত মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) শাম অভিযানে অংশ নেন। সেখানেই ১৮ হিজরিতে ভয়াবহ প্লেগে আক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেন।

হজরত মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) বলেন, ইয়েমেনের শাসনভার অর্পণ করে বিদায় দেওয়ার সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে কিছু উপদেশ দিয়েছিলেন। সেই মুহূর্তের দৃশ্যটি ছিল অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী। আমি বাহনে আরোহী আর নবীজি (সা.) পায়ে হেঁটে আমার পাশে পাশে চলছিলেন। পথ চলতে চলতে তিনি এমন এক কথা বললেন, যা আমার হৃদয়কে ভারী করে তুলল। তিনি ইরশাদ করলেন, ‘সম্ভবত এ বছরের পর আমাদের আর দেখা হবে না।’

এই বাক্য শুনতেই বিচ্ছেদের আশঙ্কায় আমার চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠল। বিদায়ের বেদনায় আমি নিজেকে আর সংবরণ করতে পারলাম না। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) তার চেহারা মোবারক মদিনার দিকে ফিরিয়ে বললেন, ‘আমার ইন্তেকালের পর যে ব্যক্তি আল্লাহভীতিতে সবচেয়ে অগ্রগামী হবে, সেই হবে আমার সবচেয়ে নিকটবর্তী। সে ব্যক্তি কে এবং কোথায় অবস্থান করছে এটা কোনো বিবেচ্য বিষয় না।’ এরপর অশ্রুসিক্ত নয়নে আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বিদায় জানালাম। (সুনানে বাইহাকি ৯/২২)

লেখক : মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা