শিশুর শারীরিক মানসিক নৈতিক ও বুদ্ধিভিত্তিক বিকাশ কতটা সমৃদ্ধ হবে, তা বহুলাংশে নির্ভর করে মা-বাবা কীভাবে লালন করছেন তার ওপরে। অভিভাবকরা না জেনে শিশুর সঙ্গে এমন আচরণ করেন, যা সন্তানের স্বাভাবিক বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত করে। শিশুর সঙ্গে কী ধরনের আচরণ করা যায়, আর কী আচরণ করা যায় না জানা গুরুত্বপূর্ণ। লিখেছেন শ্যামল আতিক।
গর্ভাবস্থায় মা যদি ট্রমার শিকার হয় (যেমন মারাত্মক কোনো দুর্ঘটনা, আপনজন মারা যাওয়া অথবা বড় কোনো মানসিক আঘাত) বা মানসিকভাবে নির্যাতিত হন, তাহলে গর্ভস্থ ভ্রুণের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। জন্মের পরই শিশুদের মধ্যে সমস্যাপূর্ণ আচরণ দেখা দিতে পারে। আহার, ঘুম, নিরাপত্তা, মনোযোগ, মমতাপূর্ণ স্পর্শ ও ভালোবাসা এই চাহিদাগুলো স্বাভাবিক পন্থায় পূরণ না হলে, ত্রুটিপূর্ণ আচরণের মাধ্যমে শিশু তা অর্জনের চেষ্টা করে। শিশু যদি মনে করে সে কাক্সিক্ষত নয়, কেউ তাকে ভালোবাসে না, কারও মনোযোগ পাচ্ছে না এমন ধারণা প্রতিহত করার জন্য সে এমন আচরণ করবে, যাতে সবার মনে বিরূপ ধারণার জন্ম নেয়। এটাই সমস্যাপূর্ণ আচরণ।
শিশু যদি মা-বাবার কাছ থেকে অতিমাত্রায় প্রশংসা, স্নেহ, নিরাপত্তা, স্বাধীনতা কিংবা মনোযোগ পায়, এক্ষেত্রেও আচরণগত সমস্যা দেখা দিতে পারে। নিরাপত্তার নামে শিশুর সব ব্যাপারে অযাচিত হস্তক্ষেপ করলে শিশু বিদ্রোহী হয়ে উঠতে পারে। বাচ্চা খুব দুষ্ট, কথা শোনে না, কিছুই খেতে চায় না এই কথাগুলো শিশুর সামনে অন্যকে বলতে হয় না। এর প্রতিক্রিয়ায় শিশু আরও বেশি সমস্যাপূর্ণ আচরণ করে। শিশুকে প্রহার বা ধমক দিয়ে কোনো কাজ বা আচরণ করতে বাধ্য করা হলে, শিশুমনে এই ধারণা বদ্ধমূল হয় যে, সবকিছু জোর করেই আদায় করতে হয়। সেও বড় হয়ে সবার সঙ্গে জোর জবরদস্তি করে। মা-বাবা পেশাজীবী হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা শিশুর সব আবদার পূরণ করেন, সমস্যাপূর্ণ আচরণকে সহ্য করেন এ সবকিছুতেই ছাড় দেন, যা শিশুর সমস্যাপূর্ণ আচরণ বাড়িয়ে তোলে।
খুব ছোট শিশু যখন ভাঙচুর করে, আঘাত বা চিৎকার চেঁচামেচি করে কথা বলে তখন পরিবারের সবাই এতে আনন্দ পান। ভুল আচরণ করেও শিশু প্রশ্রয় পেতে থাকে। অন্যকে থুথু দেওয়া, আঘাত করা, ভাঙচুর করা, কথা না শোনা প্রথম তিন বছর এগুলো বিকাশের অংশ, তারপর আচরণগত সমস্যা। বেশি উপদেশ শিশুরা পছন্দ করে না। শিশুকে অযথা বকাঝকা বা গালমন্দ করবেন না। বেশি বকাবকি করলে শিশু বিগড়ে যেতে পারে। শিশুর জেদ নিয়ে অন্য কারও কাছে কিছু বলবেন না। এতে তার এই আচরণটি জেদ হিসেবে গুরুত্ব পায়। পরিবারে নতুন সদস্য আসলে বড় শিশুটি আগের মতো আদর ও মনোযোগ পায় না। নিজেকে বঞ্চিত মনে করে নানা প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। নবজাতকের প্রতি সূক্ষ্ম ঈর্ষাবোধ থেকে সে তাকে প্রহারও করতে পারে। পারিবারিক পরিবেশও শিশুর আচরণগত সমস্যার কারণ হতে পারে। পরিবারে শিশু যদি সহিংসতা, ঝগড়া-বিবাদ, চিৎকার চেঁচামেচি, কলহ ইত্যাদি দেখে বড় হয়, পরবর্তী সময় শিশুদের মধ্যে সহিংস আচরণ করতে দেখা যায়। সহিংস ভিডিও গেমস, কার্টুন, মুভি ইত্যাদি দেখেও শিশুর মধ্যে আচরণগত সমস্যা দেখা দিতে পারে।