রাজবাড়ীতে আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ভোটারদের দ্বারপ্রান্তে যাওয়ার চেষ্টা করছেন প্রার্থীরা। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচারণায় না যেতে পারলেও বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও উঠান বৈঠকের মাধ্যমে ভোটারদের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করছেন প্রার্থীরা। রাজবাড়ীতে বিগত সময়ে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যদের আধিপত্য থাকলেও আওয়ামী লীগ না থাকাতে বিএনপি-জামায়াতের মধ্যেই লড়ায়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে এই নির্বাচনে।
পাঁচটি উপজেলা ও তিনটি পৌরসভা মিলে রাজবাড়ী জেলা গঠিত। এই জেলার ভোটার সংখ্যা ৯ লাখ ৮৯ হাজার ৯০৮ জন। জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী রাজবাড়ীতে দুটি আসনে ১৬ জন প্রার্থী তাদের মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে দুটি আসন মিলে ১১ জন বৈধ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন। এর মধ্যে রাজবাড়ী-১ আসনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জাকের পার্টি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী দিয়েছে। রাজবাড়ী-২ আসনে বিএনপি, জামায়াতসহ সাত দলের প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে এই আসনে বামপন্থি জোট ‘গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের’ কোনো প্রার্থী নেই।
রাজবাড়ী-১ (সদর ও গোয়ালন্দ) : রাজবাড়ী সদর ও গোয়ালন্দ উপজেলা নিয়ে রাজবাড়ী-১ আসন গঠিত। বিএনপির প্রথম দফায় ঘোষিত প্রার্থীদের তালিকায় আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়মের নাম ঘোষণা করা হয়। নাম ঘোষণার পর থেকে কিছু নেতাকর্মীর মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিলেও এখন আর তা চোখে পড়ছে না।
আলী নেওয়াজ মাহমুদ রাজবাড়ী জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য। এর আগে তিনি টানা তিনবার রাজবাড়ী পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে তিনি রাজবাড়ী দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া দ্বিতীয় পদ্মা সেতু ও পাংশায় পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের জন্য সামাজিকভাবে আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। তিনি মনে করেন, পদ্মা ব্যারাজ ও পদ্মা সেতু নির্মাণ হলে রাজবাড়ীসহ এই অঞ্চলের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটবে।
এই আসনের ধানের শীষের কর্মী-সমর্থকদের ভাষ্য অনুযায়ী রাজবাড়ী শহরের উন্নয়নের ছায়া লেগেছে মূলত খৈয়মের হাত ধরেই। ২০০৮ সালের পর থেকে এ অঞ্চলের মানুষের ভাগ্যের তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। তাই এবারের নির্বাচনে আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়মের বিকল্প নেই।
আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম বলেন, ‘আমি সব নেতাকর্মীকে নিয়েই নির্বাচনের মাঠে নেমেছি। এই নির্বাচনে আমি বিজয়ী হবএ বিষয়ে আমি শতভাগ আশাবাদী।’
এদিকে ৫ আগস্টের পর থেকে ভোটের জন্য কাজ করছে জামায়াতে ইসলাম। গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে জেলা জামায়াতের আমির ও কেন্দ্রীয় শূরা সদস্য অ্যাডভোকেট মো. নুরুল ইসলামের নাম প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তারপর থেকেই তিনি বিভিন্ন সভা-সমাবেশ করে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
অ্যাডভোকেট মো. নুরুল ইসলাম বলেন, ‘একটি নতুন বাংলাদেশ গড়তে মানুষের সেবা করার জন্য একজন সেবক হিসেবে কাজ করতে চাই। আমরা জনগণের ভালোবাসা ও সমর্থন নিয়ে একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্র হিসেবে গড়তে কাজ করব।’ জেলার শিক্ষা, চিকিৎসা, নদীভাঙন ও বেকার সমস্যা সমাধানের জন্য কাজ করার কথাও বলেন তিনি।
১৯৯১ সালের পর এই আসন থেকে মাত্র একবার জয়লাভ করেছে বিএনপি। এ ছাড়া প্রতিবারই এ আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী জয়লাভ করেছেন। এই নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত ছাড়াও জাতীয় পার্টির প্রার্থী খোন্দকার হাবিবুর রহমান ও জাকের পার্টির মোহাম্মদ আলী বিশ^াস প্রার্থী হয়েছেন। আসনটিতে ভোটার রয়েছেন ৪ লাখ ৩০ হাজার ২১৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ১৬ হাজার ১৪৯ জন। নারী ভোটার ২ লাখ ১৪ হাজার ৫৮ জন। হিজড়া ভোটার আটজন। এই আসনে স্থায়ী ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ১৫৬টি। স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলে ভোটকক্ষের সংখ্যা ৯১২টি।
রাজবাড়ী-২ (পাংশা, বালিয়াকান্দি ও কালুখালী) : রাজবাড়ীর পাংশা, বালিয়াকান্দি ও কালুখালী উপজেলা নিয়ে গঠিত রাজবাড়ী-২। এই আসনে ১৯৯১ সালে জামায়াতের প্রার্থী জয়লাভ করেন। এরপর ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী নির্বাচিত হন। এ ছাড়া সবগুলো নির্বাচনেই জয়লাভ করেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ না থাকায় বিএনপির প্রার্থী মো. হারুন অর রশিদ ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোহাম্মদ হারুন অর রশিদের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। তবে এ আসনে বিএনপির ভয় বিদ্রোহী প্রার্থী। এ ছাড়া গণ অধিকার পরিষদের প্রার্থী জাহিদ শেখ নির্বাচনে অংশ নিয়ে গণসংযোগ করছেন।
দ্বিতীয় দফায় প্রার্থীর নাম ঘোষণার সময় রাজবাড়ী-২ আসনে জেলা বিএনপির সদস্য ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও মো. হারুন অর রশিদের নাম ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকেই মনোনয়নপ্রত্যাশী দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মো. নাসিরুল হক সাবু সংবাদ সম্মেলন করে হারুন অর রশিদের মনোনয়ন বাতিলের দাবি জানান। এখন তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন।
অন্যদিকে খেলাফত মজলিশ ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) জামায়াত জোটে থাকলেও এই আসনটিতে তাদের প্রার্থী রয়েছে। খেলাফত মজলিশের প্রার্থী কাজী মিনহাজুল আলম ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) জামিল হিজাযী এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এ ছাড়া এই আসনটিতে জাতীয় পার্টির মো. শফিকুল আজম খান বৈধ প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
বিএনপির পদপ্রার্থী মো. হারুন অর রশিদ বলেন, ‘দল থেকে আমাকে মনোনয়ন দিয়েছে। এখানে দলের একজন সিনিয়র নেতা প্রার্থী হয়েছেন। আমি বারবার তার কাছে গিয়েছি। তার সঙ্গে কথা হয়েছে। তিনি আমাকে আশ^াস দিয়েছেন ধানের শীষের বাইরে আসলে ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই। আমি আশাবাদী, তিনি নির্ধারিত তারিখের মধ্যেই তার প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেবেন। এ ছাড়া আমি দীর্ঘ সময় এ আসনের মানুষের জন্য কাজ করছি। একেবারে তৃণমূলপর্যায়ের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের দ্বারে দ্বারে আমি যাচ্ছি। মানুষ আমাকে সারা দিচ্ছে। দলমত-নির্বিশেষে এই আসনের মানুষ আমাকেই তাদের প্রতিনিধি হিসেবে বেছে নেবেন।’
জামায়াত মনোনীত প্রার্থী মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ বলেন, নির্বাচনী পরিবেশ এখন পর্যন্ত ভালো রয়েছে। কেন্দ্র থেকে তাকে নিশ্চিত করা হয়েছে, তিনিই সেখানে প্রার্থী থাকবেন। জোটের অন্য প্রার্থীর বিষয়ে তিনি বলেন, প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সময় এখনো চলে যায়নি। ২০ জানুয়ারির পর জোটের প্রার্থী সম্পর্কে বলা যাবে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে তিনি বিজয়ী হবেন।
এই আসনের ভোটার ৫ লাখ ৫৯ হাজার ৬৯৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৮৫ হাজার ৬০৯ ও নারী ভোটার ২ লাখ ৭৪ হাজার ৭৯ জন। হিজড়া ভোটার ৫ জন। ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ৩৫৪টি। ভোটকক্ষের সংখ্যা ২ হাজার ১১৫ টি।