অস্তিত্ব সংকটে ন্যাটো!

দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে একের পর এক সিদ্ধান্তে বিশ্বজুড়ে এক টালমাটাল পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। শত্রু-মিত্রসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশের ওপর শুল্ক চাপিয়ে একদিকে বাণিজ্য যুদ্ধের দামামা উসকে দিয়েছেন; আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের নিরসনে মধ্যস্থতা করেছেন দাবি জানিয়েছিলেন নোবেল শান্তি পুরস্কারেরও। নিজেকে শান্তির দূত হিসেবে উপস্থাপন করা সেই ট্রাম্পই আবার গভীর অন্ধকারে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাস থেকে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করে নিউ ইয়র্কে নিয়ে আসার নির্দেশ দেন। ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের কর্র্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টার মধ্যেই ট্রাম্প এবার নিশানা করেছেন গ্রিনল্যান্ডকে। ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি দিয়ে ন্যাটোকে এক নজিরবিহীন সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছেন তিনি, যা জোটটির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন জাগিয়েছে।

হোয়াইট হাউজে ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তন ইউরোপের বহুদিনের নির্ভার ধারণাকে এক রকম আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে। ওয়াশিংটনের হুমকির কারণে নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশনের (ন্যাটো) কেন্দ্রীয় মূলনীতি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। মূলনীতিটি হলো জোটের কোনো সদস্য দেশ আক্রান্ত হলে তা সবার ওপর হামলা হিসেবে ধরে জবাব দেওয়া হবে; কিন্তু এখন জোটের সবচেয়ে প্রভাবশালী সদস্যই আরেক সদস্য দেশের ওপর হামলার হুমকি দিচ্ছে। গত সপ্তাহেই হোয়াইট হাউজ জানিয়েছে, গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ‘নানা বিকল্প’ নিয়ে আলোচনা করছেন। যার মধ্যে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনাও বিবেচনাধীন। ট্রাম্পের উপদেষ্টা স্টিফেন মিলার সিএনএনকে বলেন, আমরা একটি পরাশক্তি। আমরা পরাশক্তির মতোই আচরণ করব। তার এ কথা এমন এক পুরনো পৃথিবীর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে, যখন শক্তিশালীরা যা পারত দখল করত। আর দুর্বলরা দখলদারি মেনে নিত। যদিও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গ্রিনল্যান্ডে সামরিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কা কিছুটা কমানোর চেষ্টা করেছেন। তার ভাষ্যমতে, ট্রাম্প প্রশাসন আসলে গ্রিনল্যান্ড কেনার কথা বিবেচনা করছে।

তবে ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপ নিয়ে স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ন্যাটোর আরেকটি সদস্য দেশের ওপর সামরিক অভিযান চালায়, তাহলে ন্যাটোসহ সবকিছু থেমে যাবে। একই সঙ্গে সেই নিরাপত্তাব্যবস্থাও (অকার্যকর হয়ে পড়বে), যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে গড়ে উঠেছে। কিন্তু এমন প্রেক্ষাপটেও মুখে কুলুপ এঁটেছেন অন্য ইউরোপীয় নেতারা। ইউরোপের অন্যান্য নেতা অন্তত প্রকাশ্যে নিজেদের মুখে কুলুপ এঁটে আছেন। তাদের এই নীরবতার পেছনে রয়েছে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মনোভাব বদল। যুক্তরাষ্ট্র আগের মতো ইউরোপের নির্ভরযোগ্য মিত্র নয়; কিন্তু এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের জন্য অপরিহার্য। রাশিয়াকে মোকাবিলায় ইউরোপ এখনো ওয়াশিংটনের সামরিক ও কূটনৈতিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। ফলে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের নতুন হুমকি ইউরোপকে এক জটিল দোটানায় ফেলে দিয়েছে। দোটানাটি এমন, যুক্তরাষ্ট্রকে একদিকে গ্রিনল্যান্ড থেকে দূরে রাখতে হবে, অন্যদিকে ইউক্রেনের বিষয়ে সক্রিয় রাখতে হবে। গত সপ্তাহে প্যারিসে এক অনুষ্ঠানে টানাপড়েনের চিত্রটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রসহ ৩৫টি দেশের প্রতিনিধিরা রাশিয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য শান্তিচুক্তির পর ইউক্রেনের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা করেন। বৈঠকটি মোটের ওপর শান্তিপূর্ণভাবেই শেষ হয় এবং কিছু সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতিও আসে। তবে দিনব্যাপী কূটনৈতিক আলোচনা শেষে সংবাদ সম্মেলনে গ্রিনল্যান্ডে ট্রাম্পের হুমকির বিষয়ে প্রকাশ্যে সমালোচনার পথ কৌশলে এড়িয়ে যান  কিয়ার স্টারমার ও ইমানুয়েল মাখোঁ।

এদিকে, ডেনমার্কের পার্লামেন্ট সদস্য এবং প্রতিরক্ষা কমিটির চেয়ারম্যান রাসমুস জারলোভ বলেছেন যুক্তরাষ্ট্র যদি গ্রিনল্যান্ডে আক্রমণ করে, তবে ডেনমার্কেরই তা রক্ষা করতে হবে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিকে দেওয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে জারলোভ বলেন, আমরা এটাও স্পষ্ট করতে চাই, আমাদের ওপর সামরিক হামলা গ্রহণযোগ্য নয়। এতে ন্যাটোভুক্ত দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ার মতো একটি বোকামিপূর্ণ এবং বিধ্বংসী পরিস্থিতি তৈরি হবে, যা সম্পূর্ণ ধ্বংসাত্মক এবং খুবই, খুবই বোকামি এবং অপ্রয়োজনীয়। ট্রাম্পের দখলের হুমকিতে ক্ষোভ ও শঙ্কা জানিয়েছে গ্রিনল্যান্ডবাসী। গ্রিনল্যান্ডের মানুষ আমেরিকান হতে চায় না, আমরা বিক্রির জন্য নই বিবিসিকে এভাবেই নিজের ক্ষোভ জানান গ্রিনল্যান্ডের রাজধানী নুকের বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী মিয়া চেমনিৎজ। গ্রিনল্যান্ড বিজনেস অ্যাসোসিয়েশনের ক্রিশ্চিয়ান কেলডসেন বলেন, গ্রিনল্যান্ডের মানুষ এতে বিরক্ত। আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যবসা করতে প্রস্তুত, কিন্তু তারা আমাদের দখল করে নেবে এটা মানা যায় না।