কাউন্সিলর প্রার্থিতা দ্বন্দ্বে খুন!

রাজধানীর তেজগাঁওয়ে ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আজিজুর রহমান মোসাব্বিরকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় প্রধান শুটারসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। ঢাকার মানিকগঞ্জ থেকে একজনকে ও গাজীপুর থেকে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও গতকাল শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত অভিযান চলমান ছিল। হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্রটিও এখনো উদ্ধার করতে পারেননি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র দেশ রূপান্তরকে বলেন, কারওয়ান বাজারকেন্দ্রিক ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থিতা নিয়ে দ্বন্দ্ব থেকে মোসাব্বিরকে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই ওয়ার্ডে বিএনপির একাধিক কাউন্সিলর প্রার্থী রয়েছেন। তাদের সঙ্গে মোসাব্বিরেরও দ্বন্দ্ব ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, মোসাব্বিরকে তার আশপাশের লোকজনই টার্গেট করে হত্যা করেছে। গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদে আরও তথ্য জানা যাবে বলেও জানান তদন্ত সংশ্লিষ্ট এই কর্মকর্তা।

ডিবির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, মোসাব্বিরকে হত্যায় ‘প্রাইম শুটার’ জিনাতকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ হত্যাকা-ের সন্দেহভাজন পরিকল্পনাকারী বিল্লাল ও হত্যায় সহযোগিতার সম্পৃক্ত একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ছাড়া এ ঘটনায় সন্দেহভাজন জড়িত অর্ধশতাধিক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। রাজনৈতিক নেতাকর্মীদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

গতকাল বিকেলে ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (ডিবি) নাসিরুল ইসলাম বলেন, আমাদের একাধিক টিম ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জায়গায় অভিযানে রয়েছে। তারা অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা করছে, তাদের মধ্যে সন্দেহভাজনরা আছে কি না, তা যাচাই-বাছাই করছে ডিবি।

এ বিষয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম বলেন, এখন পর্যন্ত এ ঘটনায় প্রায় অর্ধশতাধিক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বিভিন্ন সময় ডাকা হয়েছে। যাদের কাছে তথ্য পাওয়া যাবে এবং যাদের সন্দেহ হবে, তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

গত বুধবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে তেজতুরী বাজারের স্টার হোটেলের পাশের একটি গলিতে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন স্বেচ্ছাসেবক দল ঢাকা মহানগর উত্তরের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান মোসাব্বির (৪৫)। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। এ সময় কারওয়ান বাজার ভ্যানচালক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবু সুফিয়ান মাসুদ গুলিবিদ্ধ হন। গুরুতর আহত অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়ার পর তিনি চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এ ঘটনায় মোসাব্বিরের স্ত্রী সুরাইয়া বেগম বাদী হয়ে তেজগাঁও থানায় একটি হত্যা মামলা করেছেন।

এ মামলার ছায়া তদন্তকারী র‌্যাব বলছে, ২৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদপ্রার্থী নিয়ে দ্বন্দ্বে এ হত্যাকা- হয়েছে। এই ওয়ার্ডে উল্লেখযোগ্য বিএনপির একাধিক কাউন্সিলর পদপ্রার্থী রয়েছেন। এদের মধ্যে মোসাব্বিরের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ছিল। এসব কারণগুলো সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তদন্ত কার্যক্রম চালাছে। অন্যদিকে কারওয়ান বাজারকেন্দ্রিক চাঁদাবাজি ও দখলদারিকে সামনে রেখে তদন্ত করছে র‌্যাব।

জানা গেছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অধীনে ২৬ নম্বর ওয়ার্ড। এই ওয়ার্ডটি কারওয়ান বাজার বাণিজ্যিক এলাকা, কারওয়ান বাজার, কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউ, গ্রিন রোড, তেজতুরী বাজার পূর্ব, তেজতুরী বাজার পশ্চিম, স্টেশন রোড, তেজকুনীপাড়ার শহীদ বীর উত্তম জিয়াউর রহমান সড়ক ও বসুন্ধরা সিটি মার্কেট এলাকা নিয়ে গঠিত। এর আয়তন ১.৩৭ বর্গকিলোমিটার।

পারিবারিক ও দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে মোসাব্বির একাধিক মামলার আসামি হন এবং দীর্ঘ সময় কারাগারে ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর তিনি আবার সক্রিয়ভাবে দলীয় রাজনীতিতে যুক্ত হন। সাম্প্রতিক সময়ে এলাকায় তার রাজনৈতিক তৎপরতা বেড়েছিল বলে স্থানীয়দের ভাষ্য।

কারওয়ান বাজারের স্থানীয় একাধিক সূত্র দেশ রূপান্তরকে বলেন, কারওয়ান বাজার, তেজতুরী বাজার ও আশপাশের এলাকা নিয়ন্ত্রণ এবং চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে একটি পক্ষের সঙ্গে মোসাব্বিরের দীর্ঘদিনের বিরোধ চলছিল। একই সঙ্গে ২৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থী হওয়াকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পর্যায়ে আরেকটি পক্ষের সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। ওয়ার্ড কাউন্সিলর নির্বাচন ঘিরে এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর সঙ্গেও তার বিরোধ ছিল। এ ছাড়া ঢাকা-১২ আসনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় দলীয় মনোনয়ন থেকে বঞ্চিত একটি অংশের সঙ্গেও তার বিরোধ ছিল বলেও জানা যায়।

এদিকে ফার্মগেট এলাকায় একটি গ্যারেজ দখলকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই দুপক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ও টানাপড়েন চলছিল। পুলিশের প্রাথমিক অনুসন্ধানে ওই গ্যারেজ দখলের ঘটনায় মোসাব্বিরের সম্পৃক্ততার তথ্য মিলেছে বলেও জানা গেছে। এসব প্রেক্ষাপটে তার বিরুদ্ধে ওঠা জীবননাশের হুমকি-সংক্রান্ত অভিযোগগুলোর সঙ্গে ঘটনার বাস্তব কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে। একই সঙ্গে হত্যাকা-ের পেছনে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বা সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, গ্রেপ্তারদের আদালতে হাজির করে রিমান্ড চাওয়া হবে। তদন্ত শেষে হত্যাকা-ের প্রকৃত কারণ এবং পেছনের পরিকল্পনাকারীদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানানো হবে।