বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় সব রাজনৈতিক দলসহ সাধারণ মানুষকে এখনই ঐকমত্যে পৌঁছাতে হবে। সমস্যা অনেক ঊর্ধ্বে চলে গেছে বলে মন্তব্য করেন আলোচকরা। তারা বলেন, দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার সিদ্ধান্তে দলগুলোকে একমত হতে হবে। দেশ একটি ভূরাজনীতির মধ্যে পড়ে গেছে। রাজনৈতিক দলগুলো অনেক ক্ষেত্রে ক্ষমতায় যেতে বিদেশি শক্তির কাছেও ধরনা দিচ্ছে।
গতকাল সোমবার সকালে সিরডাপ মিলনায়তনে ‘জাতীয় নিরাপত্তা এবং আইনশৃঙ্খলা : গণতান্ত্রিক শাসনের চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক নীতি-সংলাপের আয়োজন করে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)। সিজিএস সভাপতি জিল্লুর রহমানের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় সাবেক আমলা, রাজনৈতিক নেতা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানে জাতীয় নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রয়োগ, গণতান্ত্রিক শাসনের চ্যালেঞ্জ, নাগরিক অধিকার সুরক্ষা এবং জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে জাতীয় নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা এবং জবাবদিহি নিয়ে আলোচনা করা হয়।
সাবেক আইজিপি ড. এম এনামুল হক বলেন, জাতীয় নিরাপত্তা জোরদারে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিশেষভাবে নজর দিতে হবে। এর মধ্যে বিচারব্যবস্থা ও দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি রাজস্ব বোর্ড, পরিবহন খাতসহ রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ ছাড়া নতুন নতুন কমিশন গঠনের পরিবর্তে একটি মাত্র কমিশনের মাধ্যমে পূর্ববর্তী কমিশনগুলোর কাজের জবাবদিহি নিশ্চিত করা উচিত। এ সময় তিনি বলেন, আগামী প্রজন্মকে জাতীয় স্বার্থে কাজ করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। তা না হলে রোহিঙ্গা সংকট ভবিষ্যতে দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে।
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, বাংলাদেশের মতো দেশে জাতীয় নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; রাষ্ট্র এতে ব্যর্থ হলে গণতন্ত্র গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। এদিকে আসন্ন নির্বাচনের পর বাংলাদেশে নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ দেখা দেবে এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে পুরনো নিরাপত্তাব্যবস্থার সংস্কার প্রয়োজন হবে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন জ্ঞান ও সক্ষমতা গড়ে তোলা এবং রাজনৈতিক দল, অংশীজন ও জনগণের ঐক্য অপরিহার্য।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমদ বলেন, আইনশৃঙ্খলা ও গণতান্ত্রিক শাসন নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব, যা কার্যকর করতে জনগণের সচেতনতা জরুরি। নাগরিক অধিকার সুরক্ষার মূল ভিত্তি স্বাধীন ও কার্যকর বিচারব্যবস্থা। তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার মবের কাছে নতজানু অবস্থানে রয়েছে। জুলাই বিপ্লবের পর পুলিশ ও আমলাতন্ত্র পুনরুজ্জীবিত করার বদলে তাদের অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বল হচ্ছে। এসব বাহিনীর মনোবল ফিরিয়ে আনা জরুরি। সীমান্ত নিরাপত্তা সংকটের পেছনে পররাষ্ট্রনীতির কৌশলগত দুর্বলতার কথাও তুলে ধরে তিনি বলেন, আবেগ নয়, জাতীয় স্বার্থ অগ্রাধিকার দিয়েই পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করতে হবে।
সাবেক প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক আবু সাঈদ বলেন, এই নির্বাচন সঠিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বলা যায় না, কারণ এটি নির্বাচিত ও পক্ষপাতদুষ্টভাবে হচ্ছে। এটি জনগণের ইচ্ছা বা কল্যাণকে প্রতিফলিত করে না। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে দেশ গভীর সংকটে পড়বে। তিনি বলেন, জাতীয় নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা উভয়ই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের বিষয়। নিরাপত্তা, জবাবদিহি ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত না হলে জন-আস্থা আরও দুর্বল হবে এবং গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
গণফোরাম সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেন, বিজিবির উপস্থিতির মধ্যেই অপরাধীরা কীভাবে সীমান্ত পেরিয়ে যাচ্ছে সে প্রশ্ন তুলে তিনি আত্মসমালোচনার অভাব বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে জনগণ ও রাষ্ট্রের স্বার্থে কাজ করতে হবে; রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বাহিনীগুলোর ঘনিষ্ঠতা ভবিষ্যতে নতুন সংকট তৈরি করতে পারে।
নৈতিক সমাজ বাংলাদেশের সংগঠক মেজর জেনারেল (অব.) আমসা আমিন বলেন, দেশের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার না দিলে কোনো সংস্কারই কার্যকর হবে না। ক্ষমতায় যে-ই আসুক না কেন, অতীতের একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করা উচিত নয়। যৌথ জাতীয় চেতনা না থাকলে জনগণ ভোগান্তির শিকার হতে থাকবে। জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার করতে একটি জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল এবং একটি পুলিশ কাউন্সিল গঠন প্রয়োজন, যাতে তদারকি, পেশাদারিত্ব ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা যায়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাহেদ উর রহমান বলেন, নির্বাচিত সরকারের হাত ধরেই অনেক সময় শাসনব্যবস্থা ফ্যাসিবাদী রূপ নেয়। বৈশ্বিক পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশে জাতীয় নিরাপত্তা এখন একটি প্রধান উদ্বেগে পরিণত হয়েছে। জুলাই ২০২৪ আন্দোলনের পর রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভাজন বেড়েছে এ কথা উল্লেখ করে তিনি সতর্ক করে বলেন, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত না হলে দেশ গৃহযুদ্ধের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
ব্যারিস্টার মোহাম্মদ আলী বলেন, জাতীয় নিরাপত্তা ও সাইবার নিরাপত্তার ঘাটতি এখন একটি বড় হুমকিতে পরিণত হয়েছে। তথ্য ফাঁস কীভাবে অর্থনীতিকে অস্থির করে তুলতে পারে, তার উদাহরণ ইতিমধ্যে দেখা গেছে। দেশ বর্তমানে শুধু জাতীয় নিরাপত্তাহীনতাই নয়, খাদ্য ও পানির নিরাপত্তাহীনতারও মুখোমুখি।
মেজর জেনারেল (অব.) মনিরুল ইসলাম আকন্দ বলেন, নাগরিকরা চাইলে অনেক কিছুই করতে পারেন। কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে আইনের আওতায় থেকে নাগরিকদের হস্তক্ষেপ করা উচিত। দেশে আইন সমানভাবে প্রয়োগ হচ্ছে না। দরিদ্র জনগোষ্ঠী আইনপ্রয়োগের প্রধান শিকার হলেও অর্থ ও প্রভাবশালীরা প্রায়ই দায়মুক্তি পেয়ে যান।
আলোচকদের মধ্যে আরও ছিলেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী গোলাম সারওয়ার মিলন, বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. মোশতাক হোসেন, খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান ফয়সাল, সিপিবি সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. আলী আকবর, মুক্তিযোদ্ধা, লেখক ও গবেষক মেজর (অব.) এ এস এম শামসুল আরেফিন, অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল উ কান থেইন, বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের নেতা ইবনুল সায়েদ রানা, ব্যারিস্টার এম সারোয়ার হোসেন, বাসদ নেতা নিখিল দাস এবং শিক্ষক ও রাজনীতিবিদ মোশাররফ আহমেদ ঠাকুর প্রমুখ।