প্রতিশ্রুতি রক্ষার প্রার্থী চান ভোটাররা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাকি আর মাত্র ২৯ দিন। ফলে খুলনা জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনে ভোটের অঙ্ক কষতে ব্যস্ত সময় পার করছে রাজনৈতি দলগুলো। আনুষ্ঠানিক প্রচার না চালালেও বসে নেই প্রার্থীরা। কৌশলে কাকডাকা ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ভোটারদের কাছে নানা প্রতিশ্রুতি নিয়ে হাজির হচ্ছেন তারা। তবে ভোটাররা বলছেন, শুধুই কথার ফুলঝুরি নয়, এবার কাজে পারদর্শী ও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সক্ষম এমন প্রার্থীর ব্যালটে ভোট দিতে চান তারা। বিশেষ করে খুলনার হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে বন্ধ মিল-কারখানা চালু, জলাবদ্ধতা নিরসন, টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, উপকূলীয় এলাকায় সুপেয় পানির সংকট দূরীকরণ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন এমন যোগ্য প্রার্থীকে বেছে নিতে চান তারা।

খুলনা-১ আসন : খুলনা-১ (দাকোপ-বটিয়াঘাটা) আসনটি দীর্ঘদিন থেকে আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। সর্বশেষ ১৯৯৬ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে এ আসনটি আওয়ামী লীগের দখলে ছিল। আসন্ন নির্বাচনে এ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. আবু সাঈদ, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির আমির এজাজ খান, জামায়াতে ইসলামীর কৃষ্ণ নন্দী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ফিরোজুল ইসলাম, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডির প্রসেনজিৎ দত্ত, বাংলাদেশ মাইনরিটি জাতীয় পার্টির প্রবীর গোপাল রায়, বাংলাদেশ সম অধিকার পরিষদের (বিইপি) সুব্রত মন্ডল, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির কিশোর কুমার রায়, জাতীয় পার্টির মো. জাহাঙ্গীর হোসেন ও বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের সুনীল শুভ রায়।

সাধারণ ভোটাররা জানান, আসনটিতে বিএনপি, জামায়াত ও বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। তবে আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক থেকে বিশেষ করে ‘হিন্দু ভোট’ যে প্রার্থী বেশি টানতে পারবেন, তিনিই এগিয়ে থাকবেন। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষায় প্রতিশ্রুত প্রার্থীই ভোটারদের আস্থা পাবেন।

খুলনা-২ আসন : খুলনা সিটি করপোরেশনের ১৬ থেকে ৩১ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত খুলনা-২ আসন। আসনটি বিভাগীয় শহরে হওয়ায় এটিকে জেলার গুরুত্বপূর্ণ আসন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এবারের নির্বাচনে চারজন প্রার্থী। তারা হলেন, সাবেক সংসদ সদস্য ও খুলনা মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু, জামায়াতে ইসলামী খুলনা মহানগরীর সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলাল, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নগর সভাপতি মুফতি আমানুল্লাহ এবং খেলাফত মজলিসের মো. শহিদুল ইসলাম।

ভোটারদের অভিমত, এ আসনে মূলত জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ও বিএনপি প্রার্থীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। তবে যে প্রার্থী নগরের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা নিরসন, বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয় করে পরিকল্পিত উন্নয়ন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন যিনি নিশ্চিত করতে পারবেন, তাকেই ভোট দিতে আগ্রহী ভোটাররা।

খুলনা-৩ আসন : খুলনা সিটি করপোরেশনের ১ থেকে ১৫ নম্বর ওয়ার্ড, যোগীপোল ও আড়ংঘাটা ইউনিয়ন নিয়ে খুলনা-৩ আসন। শ্রমিক-অধ্যুষিত এ এলাকায় অতীতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি পালা করে জিতেছে। ২০১৮ সালে বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক রকিবুল ইসলাম বকুল প্রার্থী ছিলেন, এবারও প্রার্থী হয়েছেন। এ আসনেও জামায়াত ১৯৯৬ সালের পর কখনো প্রার্থী দেয়নি। এবার জামায়াতে ইসলামীর মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান। এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলনের মো. আব্দুল আউয়াল, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদের জনার্দন দত্ত, জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন-এনডিএমের শেখ আরমান হোসেন, জাতীয় পার্টির মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের এফ এম হারুন অর রশীদ এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. মুরাদ খান লিটন ও মঈন মোহাম্মদ মায়াজ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

ভোটারদের মতে, এ আসনে বিএনপির প্রার্থীর সঙ্গে জামায়াত জোট প্রার্থীর মূল প্রতিযোগিতা হবে। তবে এরমধ্যে যে প্রার্থী খুলনার হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে বন্ধ মিল-কারখানা চালু করে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে যিনি কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারবেন, তাকেই ভোট দেবেন তারা।

খুলনা-৪ আসন : রূপসা, তেরখাদা ও দীঘলিয়া নিয়ে খুলনা-৪ আসন। আসনটি অতীতে কখনো বিএনপি, কখনো আওয়ামী লীগের দখলে গেছে। ত্রয়োদশ নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ইউনুস আহম্মেদ সেখ, বিএনপির এস কে আজিজুল বারী হেলাল, খেলাফত মজলিসের এস এম সাখাওয়াত হোসাইন এবং জামায়াতে ইসলামীর মো. কবিরুল ইসলাম প্রার্থী হয়েছেন।

ভোটাররা জানান, ইসলামী দলগুলোর মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা চলছে। জোট গঠিত হলে বিএনপির প্রার্থীর সঙ্গে জামায়াত জোট প্রার্থীর লড়াই হবে। কিন্তু বিপদ-আপদে পাশে পাবেন এবং এলাকার উন্নয়নে কাজ করবেন এমন প্রার্থী পছন্দ করবেন তারা।

খুলনা-৫ আসন : ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলা নিয়ে গঠিত খুলনা-৫ আসন। অতীতে আসনটি আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের মধ্যে পালাবদল হয়েছে। এবার মর্যাদার আসন হয়ে উঠেছে এটি। ২০০১ সালে এখানে চারদলীয় জোট থেকে বিজয়ী হন জামায়াতের বর্তমান সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। এবারও জামায়াতের প্রার্থী তিনি।

অন্যদিকে, দীর্ঘ ২৯ বছর পর বিএনপি এ আসনে প্রার্থী দিয়েছে আলী আসগার লবিকে। ২০০১ সালের নির্বাচনে খুলনা-২ আসন থেকে খালেদা জিয়া নির্বাচিত হন। পরে তিনি আসনটি ছেড়ে দিলে উপনির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন আলী আসগার। এই ব্যবসায়ী ২০০৯ সাল থেকে রাজনীতির মাঠে ছিলেন না। তবে এ আসনে দলের প্রার্থী হয়েছেন। এ ছাড়া প্রার্থী হয়েছেন বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির চিত্তরঞ্জন গোলদার এবং খেলাফত মজলিসের মো. আব্দুল কাইয়ুম জমাদ্দার।

অবশ্য, স্থানীয় ভোটাররা বলছেন, এটি মূলত আওয়ামী লীগের আসন। হিন্দু সম্প্রদায়ের উল্লেখযোগ্য ভোটার রয়েছে। নির্বাচনে জিততে আসনটিতে আওয়ামী লীগের ভোট ও হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোট গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। ফলে বিএনপি, জামায়াত দুই দলই তাদের ভোট টানতে মরিয়া। এ দুই দলের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লাড়াই হবে।

খুলনা-৬ আসন : খুলনা-৬ (কয়রা-পাইকগাছা) আসনটি উপকূলীয় এলাকা নিয়ে গঠিত। ২০০১ সালের নির্বাচনে চারদলীয় জোটের অংশ হিসেবে আসনটি জামায়াতকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। এবার জামায়াতের প্রার্থী কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও খুলনা অঞ্চলের সহকারী পরিচালক আবুল কালাম আজাদ। এর আগেও তিনি ওই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। এখানে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সদস্য সচিব মনিরুল হাসান বাপ্পী। তার বাড়ি রূপসা উপজেলায়। এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. আছাদুল্লাহ ফকির এবং বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির প্রশান্ত কুমার ম-ল প্রার্থী হয়েছেন।

ভোটাররা বলছেন, এ আসনে বিএনপির প্রার্থীর সঙ্গে জামায়াতের প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। বিএনপির প্রার্থীর বহিরাগত পরিচয় স্থানীয় রাজনীতিতে কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারে। তবে উপকূলীয় এ দুটি উপজেলায় প্রাধান সমস্যা দুর্বল বেড়িবাঁধ। তাই টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণে প্রতিশ্রতিবদ্ধ ও স্থানীয় প্রার্থীই ভোটারদের সমর্থন পাবেন।