ভোটের ঝুঁকি পলাতক সন্ত্রাসীরা

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের বাকি আর ২৬ দিন। কয়েক দিনে সারা দেশে সন্ত্রাসীদের গুলিতে ডজনখানেক খুনের ঘটনা ঘটেছে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আশ্বাস ব্যক্ত করলেও উদ্বেগ-আতঙ্ক কাটেনি, উৎকণ্ঠাও কমেনি। এরই মধ্যে ঢাকায় ৩৯৬ অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীর তালিকা করেছে পুলিশের একটি বিশেষ ইউনিট।

পুলিশ জানিয়েছে, তালিকার অধিকাংশই আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী। তাদের বিরুদ্ধে জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী মামলাসহ আগের একাধিক অস্ত্র ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলা রয়েছে। তালিকাটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এদের ধারে-কাছেও ঘেঁষতে পারছে না পুলিশ। ফলে নির্বাচনকালে ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (প্রশাসন) নাসিরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচন কেন্দ্র করে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। ডিবির প্রতিটি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের টিমকে মনিটরিং করা হচ্ছে। অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হচ্ছে। নির্বাচন সুষ্ঠু ও ভালোভাবে সম্পন্ন করার জন্য যা করা দরকার পুলিশ করবে।’

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, গণঅভ্যুত্থানের সময় কারাগারের ফটক ও দেয়াল ভেঙে সন্ত্রাসীরা পালিয়ে গিয়ে অথবা পরে জামিনে বেরিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঘোলাটে করে তোলে। চাঁদাবাজি, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, দখলদারি, চুক্তিতে হত্যাসহ এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অনেক ঘটনা ঘটিয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের অপরাধ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে গেল বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে হত্যাকা-ের শিকার হয়েছে ৫ হাজার ৩৫৮ জন। গড়ে প্রতিদিন ১১টি হত্যাকা- ঘটেছে। এ ছাড়া পারিবারিক কলহে ও ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে অনেক হত্যাকা- ঘটেছে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদির ওপর গুলির ঘটনায় সামনে আসে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের নাম। হাদি হত্যা মামলার এক নম্বর আসামি করা হয় আদাবর এলাকার ছাত্রলীগ নেতা ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদকে। তার সহযোগী হিসেবে মোটরসাইকেলের চালক ছিলেন যুবলীগ নেতা আলমগীর হোসেন এবং পরিকল্পনা করেন আওয়ামী লীগের ওয়ার্ড কমিশনার তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী। চার্জশিটে ১৪ জনের নাম রয়েছে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ঢাকার চারটি এলাকাকে রেড জোন ঘোষণা করে নজরদারি বাড়িয়েছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। এগুলো হচ্ছে ধানম-ি-হাজারীবাগ, মোহাম্মদপুর, মিরপুর-পল্লবী ও পুরান ঢাকার কোর্ট এলাকা। এসব এলাকায় সক্রিয় সন্ত্রাসীদের কার্যক্রম নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে। নির্বাচনের আগে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও অবনতির শঙ্কা রয়েছে। নির্বাচনে বড় ধরনের রক্তপাত ঘটতে পারে।’

পুলিশ সূত্র জানায়, চলতি মাসের শুরু থেকে ঢাকাসহ সারা দেশে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের তালিকা করছে পুলিশের একাধিক ইউনিট। তারপরও অস্ত্র উদ্ধারেও সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে উল্লেখযোগ্য সাফল্য নেই। তালিকায় থাকা সন্ত্রাসীদের অধিকাংশই পলাতক। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনা থেকে লুট হওয়া এক হাজার ৩৩৫টি অস্ত্র এখনো সন্ত্রাসীদের হাতে। সীমান্ত পথেও দেশে অস্ত্রের প্রবেশ বেড়েছে।

এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্বাচনের আগে পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার হওয়া জরুরি। আমাদের রাজনীতিকদের ভালো হতে হবে। অস্ত্রধারীদের ব্যবহার করে রাজনীতিকরা, প্রার্থীরা শক্তি প্রদর্শনে সন্ত্রাসীদের হায়ার করে। এ ছাড়া বড় ঝুঁকি হতে পারে আওয়ামী লীগের দোসররা। কারণ আওয়ামী লীগ বা তাদের দোসরদের লাভবান হওয়ার বড় সুযোগ রয়েছে।’

নতুন তালিকায় সন্ত্রাসীদের তথ্য : দেশ রূপান্তরের হাতে আসা একটি সংস্থার করা সন্ত্রাসীদের তালিকায় দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী মতিঝিল এলাকায়। হাজারীবাগ, ধানম-ি, সূত্রাপুর, ওয়ারী-যাত্রাবাড়ীসহ আরও কয়েকটি থানায় একজন করে সন্ত্রাসী সক্রিয় আছে। কারাগারে রয়েছে ৫৮ জন, ৩০২ জন পলাতক, জামিনে রয়েছে ১১ জন, দুবাই, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছে ৬ জন, গোয়েন্দা সংস্থার কাছে তথ্য নেই ১৯ সন্ত্রাসীর।

রাজনৈতিক নেতাদের শেল্টারে থাকার অভিযোগ : ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) এক ঊর্ধŸতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার ও অস্ত্র উদ্ধার জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পুলিশ কাজ করছে ঠিকই, তবে ঝামেলা এড়াতে কর্মকর্তারাই অভিযানকে নিরুৎসাহী কনের অনেক সময়। কারণ প্রায়ই অস্ত্রসহ ধরার পরও তাদের ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, গত বছর সারা দেশে অস্ত্র আইনে ১ হাজার ৮১৫টি মামলা হয়েছে, যা ২০২৪ সালের চেয়ে বেশি। ২০২৫ সালে ডিএমপিতে ২৩২টি অস্ত্র মামলা হয়েছে, যা ২০২৪ সালের দ্বিগুণ। সারা দেশে গত ১৩ ডিসেম্বরে শুরু হওয়া ডেভিল হান্ট ফেজ-২ অপারেশনে ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত ২৩৬টি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে।

সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রিত এলাকা : খিলগাঁও এলাকার সন্ত্রাসী রানা ওরফে পিস্তাল রানা, তেজগাঁও এলাকার জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে মন্টু মিয়া, হাজারীবাগে যুবলীগ নেতা শাকিল হোসেনসহ ছয়জন, ধানম-ির আমজাদ হোসেন, সূত্রাপুরের রাতুল, ওয়ারী-যাত্রাবাড়ীর ক্রাস ইয়াছিন উদ্দিন লিটন ওরফে আখন্দ ওরফে শুটার লিটন, ধানম-ি, নিউ মার্কেট ও হাজারীবাগ নিয়ন্ত্রণ করে শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজেদুল ইসমাল ইমন। ৫ আগস্টের পর জামিনে বেরিয়ে আত্মগোপনে চলে গেছেন তিনি। রয়েছে পিচ্চি হেলাল ওরফে সুমন, জাহাঙ্গীর ফেরদৌস ওরফে কালা জাহাঙ্গীর, আমির হোসেন ওরফে টুন্ডা আমির ওরফে পিস্তাল আমির, আব্বাস ওরফে কিলার আব্বাস ও সুব্রত বাইনসহ ১৬ জন। কলাবাগান এলাকায় সঞ্জিত চন্দ্র শীল, মাহিন নৈয়ব ও সৈয়দ ওমর ফারুক সায়মনসহ ১৩ জন। চকবাজার এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী রাজিব ওরফে পিচ্চি রাজিব ও আল-আমিন ওরফে ভাঙা আল আমিনসহ ৯ জন, কোতোয়ালির সন্ত্রাসী শাহবুদ্দিন জনি, জাবেদ হোসেন মিঠু, টাইগার হাবিব ও মিলন সিকদারসহ সাতজন, লালবাগ এলাকায় কমল দাস ও রাকেশ আহম্মেদ ওরফে আসিফসহ সাতজন, গে-ারিয়ার ভাগ্নি ফারুক ওরফে বক্সার ফারুক, শরিফুল ইসলাম ওরফে লেদু শরীফ, সজল ওরফে অটো সজল, রনি ওরফে বেলবাটি রনি ওরফে পিচ্চি রনি, নয়ন ওরফে জোড়াসহ ১৬ জন, পল্লবীর আবু সালেহ সিকদার ওরফে শুটার সালেহ, জাকির সদ্দার ওরফে শুটার জাকির, কালা সোহাগ ওরফে কিলার সোহাগ ও আকাশ ওরফে টানা আকাশ, কদমতলীর মামুন ওরফে জামাই মামুন, সাবেক সংসদ সদস্য সানজিদা খানমের ভাই শাকিল ও তার ঘনিষ্ঠ সহচর এস কে মামুন, মামুন ওরফে টোকাই মামুনসহ ৩৪ জন এবং মতিঝিল এলাকার কামরুল হাসান তাসনিম ওরফে শোভন, রাজ্জাক হোসেন ওরফে রাজ, জুলফিকার আবু নাসের ওরফে আপেল মাহমুদ ও রাশেদুল ইসলাম ওরফে রয়েলসহ ১০৬ জন সক্রিয় রয়েছে। এ ছাড়া ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ৩৯৬ জন সন্ত্রাসী সক্রিয় রয়েছে।

ডিএমপির কোন বিভাগে কত সন্ত্রাসী : ডিএমপির মতিঝিল বিভাগে ১১৮ জন, রমনা বিভাগে ৩৬, লালবাগে ২৪, ওয়ারীতে ৭৩, তেজগাঁওয়ে ৬১, মিরপুরে ৬০, উত্তরায় ১৩ ও গুলশান বিভাগে ১৬ জন অবৈধ অস্ত্রধারী রয়েছে। এসব তালিকাভুক্ত অবৈধ অস্ত্রধারী ও তাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বলে জানা গেছে। সরকারের আরেকটি সংস্থা সারা দেশের ৭৫৮ জন অবৈধ অস্ত্রধারী এবং অস্ত্র ব্যবসায়ীর তালিকা তৈরি করেছে। এ তালিকায় রাজধানীতে অবৈধ অস্ত্রধারীর সংখ্যা ৪৭২।

মতিঝিল এলাকার অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের তালিকায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসের নামও রয়েছে। তাকে পলাতক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া উত্তর সিটির ২০ নম্বর ওয়ার্ডে সাবেক কাউন্সিলর নাছির ওরফে কালা নাছিরসহ ৬৯ জন আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী। এ তালিকায় আন্ডারওয়ার্ল্ডের কোনো সন্ত্রাসীর নাম নেই।

সীমান্তে বিজিবির অস্ত্র উদ্ধার : সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশি-বিদেশি পিস্তল ৬১টি, রাইফেল ১০, এসএমজি ২, শটগান ৬, একনলা বন্দুক ১, ম্যাগাজিন ৫২, গুলি ১ হাজার ৪৭০ রাউন্ড, গ্রেনেড ২২, গান পাউডার, পেট্রোল বোমা ও ককটেলসহ ৪৪টি অস্ত্র উদ্ধার করেছে।