আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ৩৩০ ব্যক্তিকে ‘দুষ্কৃতকারী’ ঘোষণা করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। একইসঙ্গে তাদের নগরে প্রবেশ এবং অবস্থানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে গত শনিবার গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। তবে এই তালিকা নিয়ে খোদ পুলিশসহ বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। তালিকায় স্থান পাওয়া দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার অভিযান জোরদার না করে নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে কেন তাদের নগরে ঢুকতে না দেওয়ার নোটিস জারি করা হলো। আবার দাগি সন্ত্রাসীদের সঙ্গে কেন রাজনৈতিক নেতাদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হলো।
এ দুটি প্রশ্নের উত্তর জানতে সিএমপি কমিশনার হাসিব আজিজসহ একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মোবাইলে গতকাল রবিবার ফোন করা হলেও কেউ সাড়া দেননি। তবে সিএমপির মুখপাত্র সহকারী পুলিশ কমিশনার আমিনুর রশিদ গতকাল বিকেলে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাজনৈতিক বিবেচনায় দুষ্কৃতকারীদের তালিকা করা হয়নি। ক্রিমিনাল ডাটাবেজ অনুসরণ করে তালিকা করা হয়েছে।’
জানা গেছে, সবশেষ ২০২১ সালের মে মাসে সন্ত্রাসী তালিকা হালনাগাদ করেছিল সিএমপি। সে সময় তালিকায় স্থান পেয়েছিল ৩২৩ জন সন্ত্রাসী। এর মধ্যে দাগি অপরাধীদের পাশাপাশি তালিকায় স্থান পেয়েছিলেন আওয়ামী লীগের ৪২ জন, বিএনপির ৩৮ জন এবং জামায়াতের ১৩ জন নেতাকর্মী।
গত শনিবার জারি করা সিএমপির গণবিজ্ঞপ্তিতে আগের তালিকায় থাকা আওয়ামী লীগের উক্ত ৪২ জনকে নতুন করে যুক্ত করা হলেও ‘দুষ্কৃতকারী’ হিসেবে এবারের তালিকায় হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া বিএনপি বা জামায়াতের নেতাকর্মীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
সবশেষ ২০২১ সালে হালনাগাদ করা তালিকায় থাকা বিএনপি ৩৮ এবং জামায়াতের ১৩ নেতাকর্মীর কাউকে এবারের ‘দুষ্কৃতকারীর’ তালিকায় রাখা হয়নি কেন, এমন প্রশ্নের উত্তরে সিএমপির মুখপাত্র আমিনুর রশিদ বলেন, ‘৩৩০ জনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট দুষ্কৃতকারীর সমসাময়িক অপরাধ কর্মকা- বিবেচনায় নিয়ে তালিকা করা হয়েছে। দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার অভিযান চলমান আছে।’ তবে গত শনিবার জারি করা গণবিজ্ঞপ্তিতে নগর বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মীও রয়েছেন। এর মধ্যে আছেন নগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক শওকত আজম খাজার নাম। তবে গণবিজ্ঞপ্তি জারির কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তার (শওকত আজম খাজা) নাম সংশোধন করে শনিবার মধ্যরাতে গণমাধ্যমে প্রেস রিলিজ পাঠিয়েছে সিএমপির জনসংযোগ শাখা।
নগর বিএনপির উক্ত নেতাকে ‘দুষ্কৃতকারী’ হিসেবে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে সিএমপির জনসংযোগ শাখা থেকে জানানো হয় ভুলবশত বিএনপির ওই নেতার নাম তালিকায় চলে এসেছে। তবে সংশোধিত তালিকায় শওকত আজম খাজার নাম বাদ দেওয়া হলেও নগর বিএনপি এবং এর অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীর নাম রয়ে গেছে। এর মধ্যে আছে বাকলিয়ার বিএনপি নেতা মোর্শেদ খান, যুবদল নেতা হাসান ও পাহাড়তলী থানার মাসুম। তালিকায় নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের আধিক্য প্রসঙ্গে সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগ ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে ও গোপনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করছে। তাই জননিরাপত্তার স্বার্থে তাদের ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।’
এদিকে আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে ৩৩০ ‘দুষ্কৃতকারী’ ঘোষণা এবং নগরে তাদের প্রবেশ ও অবস্থানের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও অস্ত্রধারী শীর্ষ সন্ত্রাসী এবং আওয়ামী লীগের পলাতক নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করতে ব্যর্থ হয়ে এই তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন সিএমপির একাধিক কর্মকর্তা। তবে এসব কর্মকর্তা গণমাধ্যমে তাদের নাম প্রকাশ করতে নিষেধ করেছেন। অপরদিকে সিএমপির ওই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে ২০২৫ সালের নভেম্বরে মারা যাওয়া চসিক ৩০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আতাউল্লা চৌধুরীকে। মৃত ব্যক্তিকে দুষ্কৃতকারীর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে বক্তব্য দিতে রাজি হননি সিএমপির দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তা। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনা ও সমালোচনা চলছে।
সবশেষ গত শনিবার প্রকাশ করা ৩৩০ জনের তালিকায় আছেন কারাগারে থাকা চট্টগ্রাম-৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ফজলে করিম চৌধুরী ও চট্টগ্রাম-১১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এম এ লতিফ। আরও আছেন আওয়ামী লীগের পলাতক সাবেক মন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, চট্টগ্রাম-১০ আসনের পলাতক সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন বাচ্চু, চসিকের সাবেক মেয়র ও পলাতক নগর আওয়ামী লীগ নেতা আজম নাছির উদ্দিন, ফজলে করিমের ছেলে ফারাজ করিম চৌধুরী। তালিকায় আরও আছে জুলাই আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে পিস্তল হাতে নেতৃত্ব দেওয়া আওয়ামী লীগ নেতা হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা নুরুল আজিম রনি, জামালখান ওয়ার্ড কাউন্সিলর শৈবাল দাশ সুমন, নুর মোস্তফা টিনু, আব্দুল কাদের ওরফে মাছ কাদের, আব্দুল নবী ওরফে মাছ নবী, শাহেদ ইকবাল, এসরারুল হকসহ চসিকের বিভিন্ন ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগের পলাতক ওয়ার্ড কাউন্সিলররা।
এদিকে অস্ত্রধারীদের শনাক্ত এবং তাদের গ্রেপ্তার অভিযান জোরদার না করে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগ মুহূর্তে চিহ্নিত অস্ত্রধারীদের ‘দুষ্কৃতকারী’ আখ্যা, নগরে তাদের প্রবেশ ও অবস্থানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সিএমপি কমিশনার হাসিব আজিজ ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছেন, তা মাঠ পর্যায়ের কর্মরত পুলিশের কাছে স্পষ্ট নয়। উক্ত তালিকায় ৮৯ নম্বরে আছেন পুলিশ এবং ইন্টারপোলের রেড নোটিসে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে ‘বড় সাজ্জাদ’-এর নাম। পুলিশ জানিয়েছে, দীর্ঘ দুই দশক ধরে দেশের বাইরে বসেই সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদ নগর ও জেলার বিস্তৃৃত সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করছেন। ইন্টারপোলের তালিকায় তিনি সাজ্জাদ হোসেন খান হিসেবে উল্লিখিত।
পুলিশ আরও জানায়, নগরের চান্দগাঁও, বায়েজিদ বোস্তামী ও পাঁচলাইশ এবং চট্টগ্রাম জেলার হাটহাজারী, রাউজানসহ পাঁচ থানার ৫ লাখের বেশি মানুষকে সাজ্জাদের বাহিনীর কারণে আতঙ্কে থাকতে হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে চট্টগ্রামে জোড়া খুনসহ মোট ১১টি খুনের ঘটনায় সাজ্জাদের অনুসারীদের নাম উঠে এসেছে। কারাবন্দি শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদের নাম রয়েছে তালিকার ৩০ নম্বরে। ছোট সাজ্জাদের স্ত্রী শারমিন তামান্নার নাম আছে ১৯১ নাম্বারে। এছাড়া বাকলিয়া জোড়া খুনের আসামি সাজ্জাদ গ্রুপের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড রায়হান আলম, খোরশেদ, বোরহান ও মোবারক হোসেন ইমনের নাম আছে তালিকায়।