সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর অর্থ পাচারের অভিযোগ অনুসন্ধানে নেমে আরও পাঁচ দেশে সম্পদ কেনার তথ্য পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দেশগুলো হলো ভারত, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও ফিলিপাইন। দুদক এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে ৯টি দেশে সম্পদ কেনার তথ্য পেয়েছে। সেসব সম্পদের মূল্য প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা, যা ক্রোক করার আদেশ দিয়েছে আদালত। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে আদালতের আদেশ আজকালের মধ্যে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোয় পাঠানো হবে বলে জানা গেছে। দুদকের উপপরিচালক মশিউর রহমানের নেতৃত্বাধীন একটি দল অভিযোগটি অনুসন্ধান করছে।
দুদকের তথ্যমতে, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে পালানোর পর সরকারের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য (এমপি), আমলা ও রাজনৈতিক নেতাদের অনিয়ম, দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন ও বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ দুদকে জমা হতে থাকে। কয়েক মাসের মধ্যে দুদকে আওয়ামী লীগসংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী, সরকারি ও বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে হাজারের বেশি অভিযোগ জমা পড়ে। ওই তালিকায় রয়েছেন সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর নাম। তিনি অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ এবং সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, দুবাই ও সিঙ্গাপুরে পাঠান।
অনুসন্ধানের তথ্য অনুযায়ী, সাইফুজ্জামান চৌধুরীর যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, দুবাই ও সিঙ্গাপুরে তার ৫৮১টি ফ্ল্যাট-বাড়ি ও আটটি প্রতিষ্ঠানের সন্ধান পায় দুদক। এসব সম্পদের মূল্য প্রায় ৩ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা। আর আটটি প্রতিষ্ঠানের মূল্য ২ হাজার ৪২৩ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে তার দেশের বাইরে ৬ হাজার ২৬৩ কোটি টাকার সম্পদ থাকার তথ্য পায় দুদক।
জানা গেছে, সাইফুজ্জামান চৌধুরী একসময় তার দেশের বাইরের সম্পদের হিসাব নিজেই রাখতেন। সম্পদের পরিমাণ বাড়তে থাকায় তার হিসাব রাখতে তিনি আব্দুল আজিজ ও উৎপল রায় নামের দুজন কর্মচারী নিয়োগ দেন। যখন বিদেশে কোনো সম্পদ কেনা হতো, তখন তার তথ্য চলে আসত আজিজ ও উৎপলের কাছে। তারা তার সম্পদের হিসাব রাখতেন। সম্প্রতি তাদের অফিসসহ বিভিন্ন স্থান থেকে সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তার পরিবারের সদস্যদের নামীয় ২৩ বস্তা রেকর্ডপত্র জব্দ করে দুদক। এসব রেকর্ডপত্র যাচাই-বাছাই করে নতুন করে আরও পাঁচটি দেশে বাড়ি, গাড়ি ও ব্যবসা গড়ে তোলার তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়। এসব দেশে তার প্রায় ৩০০টি সম্পদ রয়েছে। সব মিলিয়ে সাইফুজ্জামান চৌধুরীর ৯টি দেশে ৮০০টির বেশি সম্পদ থাকার তথ্য পেয়েছে দুদক, যা দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ক্রোক করার আদেশ দিয়েছে ঢাকা মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত। আদালতের আদেশ বাস্তবায়নে আজকালের মধ্যে আদেশ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোয় পাঠিয়ে দেওয়া হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে দুদকের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, সাইফুজ্জামান চৌধুরী ইউসিবি ব্যাংক থেকে ঋণের নামে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা লোপাট এবং প্রায় ৭০০ কোটি ঘুষ গ্রহণসহ প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির তথ্য পেয়েছিল দুদক। অনুসন্ধানকালে প্রথমে সাইফুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে চারটি দেশে অর্থ পাচারের তথ্য পাওয়া গেলেও নতুন করে আরও পাঁচটি দেশে অর্থ পাচারের তথ্য পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে তার ৯টি দেশে ১০ হাজার কোটি টাকার সম্পদ থাকার তথ্য মিলেছে। তিনি পাচার করা অর্থে এসব সম্পদের মালিক হয়েছেন। ঢাকা মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত গত ১৫ জানুয়ারি সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সব সম্পদ ক্রোক করার আদেশ দিয়েছে, যা আজকালের মধ্যে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোয় পাঠিয়ে দেওয়া হবে।
দুদকের তথ্যমতে, অবৈধ সম্পদ অর্জন, জালিয়াতির মাধ্যমে ঋণের নামে ব্যাংকের অর্থ আত্মসাৎ, ঘুষগ্রহণ ও বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা করেছে দুদক। সাইফুজ্জামানের অভিযোগ অনুসন্ধান ও তদন্তের অংশ হিসেবে দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সাইফুজ্জামান ও তার স্ত্রীর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করে আদালত। এরপর গত ১৭ অক্টোবর সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তার পরিবারের নামে থাকা দেশ-বিদেশের ৫৮০ বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট, জমিসহ স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ জব্দের আদেশ দিয়েছে ঢাকা মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত। নতুন করে আরও পাঁচ দেশে থাকা সম্পদ জব্দের আদেশ দিয়েছে একই আদালত।
সাইফুজ্জামান চৌধুরী ২০১৩ সালের উপনির্বাচনে চট্টগ্রাম-১২ আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন। এরপর ২০১৪ সালে চট্টগ্রাম-১৩ আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন। তিনি ২০১৪ সালের ১২ জানুয়ারি থেকে ২০১৯ সালের ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত ভূমি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি ২০১৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পরও ২০১৯ সালের ৭ জানুয়ারি ভূমিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি চট্টগ্রাম-১৩ থেকে আবার এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন।