একশর বেশি দিন ধরে গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও গাজাবাসীর দুঃস্বপ্ন যেন শেষ হওয়ার নয়। প্রথম ধাপের শান্তিচুক্তি নাজুক অবস্থায় থাকায় দ্বিতীয় ধাপ নিয়েও শঙ্কিত তারা। শান্তিচুক্তি কার্যকর হওয়ার পর থেকে প্রায় ৫০০ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে ইসরায়েল। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার গাজার পূর্ব শহর জেইতুনে ইসরায়েলি হামলায় কমপক্ষে পাঁচ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রায় ৫০০ বার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলেও, এ পরিস্থিতিতেই গাজা শান্তি পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ শুরুর ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্প প্রস্তাবিত এ শান্তিচুক্তির সবচেয়ে স্পর্শকাতর প্রক্রিয়া এটি। এ ধাপেই গাজা উপত্যকা শাসনকারী গোষ্ঠী হামাসের নিরস্ত্রীকরণের শর্ত আছে। যদিও হামাস বরাবরই অস্ত্র ছাড়ার দাবি প্রত্যাখ্যান করে আসছিল। তবে সম্প্রতি নিজেদের সিদ্ধান্ত বদলের ইঙ্গিত দিয়েছে হামাস। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম স্কাই নিউজের আরবি সংস্করণ স্কাই নিউজ অ্যারাবিকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামাস অস্ত্র সমর্পণ করতে রাজি। তবে সেজন্য দুটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত জুড়ে দিয়েছে গোষ্ঠীটি। হামাস বলছে, গাজা থেকে নেতাদের নিরাপদে মুক্তি দেওয়া এবং সম্পূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড রূপান্তরের বিনিময়ে অস্ত্র সমর্পণে সম্মত হয়েছে তারা।
ফিলিস্তিনি সূত্রের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমটি জানায়, সমঝোতার আওতায় ইতিমধ্যে ভূগর্ভস্থ টানেল নেটওয়ার্কের কিছু অস্ত্র এবং মানচিত্র যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করেছে হামাস। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা গোষ্ঠীটির নেতাদের এই মর্মে নিশ্চয়তা দিয়েছেন যে, হামাস গাজায় রাজনীতি করতে পারবে এবং গাজার প্রশাসন ও পুলিশ বিভাগে হামাসের কিছু নেতাকর্মী-সমর্থককে অন্তর্ভুক্তও করা হবে। তবে এ ক্ষেত্রে অবশ্যই সেসব নেতাকর্মী-সমর্থককে ‘ইসরায়েলি-আমেরিকান সিকিউরিটি চেক’ পরীক্ষায় পাস করতে হবে। প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয় যে, গাজা ত্যাগ করা হামাস নেতাদের ওপর ভবিষ্যতে ইসরায়েল হামলা চালাবে না, এমন আশ্বাসও দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এ ব্যাপারে আরও বিস্তারিত জানতে হামাস, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল স্কাই নিউজ অ্যারাবিক, কিন্তু কোনো কর্মকর্তাই মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে সূত্রের বরাতে জানা গেছে, হামাস এবং ওয়াশিংটনের কর্মকর্তাদের এ সমঝোতায় ইসরায়েল একেবারেই ‘খুশি নয়’। বিশেষ গাজার প্রশাসনে হামাসের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং তার অনুগত কর্মকর্তাদের ব্যাপক আপত্তি আছে। এ আপত্তির বড় কারণ তারা হামাসকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করতে চেয়েছিলেন। তবে ইসরায়েলের এ আপত্তিকে আমলে নিচ্ছেন না যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা। গাজায় হামাস-ইসরায়েল যুদ্ধ স্থায়ীভাবে থামাতে গত ২৯ সেপ্টেম্বর ২০টি পয়েন্ট সংবলিত যে শান্তি পরিকল্পনা প্রস্তাব করেছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, সেখানে হামাসের অস্ত্র সমর্পণ, গাজায় একটি টেকনোক্র্যাট সরকার গঠন এবং সেই সরকারকে নির্দেশনা প্রদান ও যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা পুনর্গঠন তদারক করতে ‘বোর্ড অব পিস’ নামের একটি পরিষদ গঠনের বিষয়ে উল্লেখ ছিল। ইতিমধ্যে টেকনোক্র্যাট সরকার ও বোর্ড অব পিস গঠিত হয়েছে এবং আনুষ্ঠানিক কার্যক্রমও শুরু করেছে। এখন বাকি আছে শুধু হামাসের অস্ত্র সমর্পণের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা।
দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের পর গত ১০ অক্টোবরে হওয়া যুদ্ধবিরতির চুক্তি সাধারণ মানুষকে সাময়িকভাবে কিছুটা স্বস্তি দিলেও, ইসরায়েলের চলমান হামলার কারণে গাজার মানুষের জীবন এখনো অনিরাপদ। যুদ্ধবিরতির পর জীবন যতটা সহজ হবে বলে ভেবেছিল গাজাবাসী, ততটা সহজ হয়নি। পানি ও খাবার কিছুটা সহজলভ্য, বিদ্যুৎ ফিরেছে সীমিতভাবে, শহরের ভেতরে চলাচল করা যাচ্ছে। কিন্তু ইসরায়েলের ত্রাণ ও ক্রসিং নিয়ন্ত্রণ, হামাস নির্মূলের নামে হামলা করা গাজাবাসীদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে দিচ্ছে না। সঙ্গে পণ্যের দামবৃদ্ধি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দুই বছরের ধ্বংসযজ্ঞ, পরিবার-ঘরবাড়ি হারিয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকার কারণে গাজাবাসী সার্বিকভাবে শান্তি বা নিরাপদ অনুভব করতে পারছে না। যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’ তাদের বাস্তব জীবনে আদৌ কোনো পরিবর্তন আনবে কি না, তা নিয়েও সন্দিহান গাজার স্থানীয়রা। পাশাপাশি গাজার বর্তমান অবস্থার জন্য দায়ী ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এ বোর্ডে যোগ দেবেন, যা গাজার মানুষের আশার আলো নেভানোর জন্য যথেষ্ট। এসবের মধ্যেই গাজার মানুষ পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলার চেষ্টা করছে। নিজ উদ্যোগে ধ্বংসাবশেষ সরাচ্ছে, ছোট দোকান ও বিশ্ববিদ্যালয় খুলেছে, ভবন মেরামত করছে এবং সীমিত সরঞ্জাম দিয়ে প্রয়োজনীয় সেবা ফিরিয়ে আনছে।
যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাবিত ‘নিউ গাজা’ : গাজাকে নতুন করে গড়ে তোলার একটি পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এ পরিকল্পনার নাম দেওয়া হয়েছে ‘নিউ গাজা’। যুদ্ধবিধ্বস্ত এ ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডটিকে একেবারে নতুনভাবে পুনর্গঠনের কথা বলা হয়েছে এতে। ‘নিউ গাজা’ নিয়ে উপস্থাপিত সøাইডে দেখা গেছে, ভূমধ্যসাগরের তীর জুড়ে সারি সারি উঁচু ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। রাফাহ এলাকায় থাকবে আবাসিক প্রকল্প। একটি মানচিত্রে দেখানো হয়েছে, গাজার প্রায় ২১ লাখ মানুষের জন্য ধাপে ধাপে নতুন আবাসিক এলাকা, কৃষিজমি ও শিল্পাঞ্চল তৈরি করা হবে। সুইজারল্যান্ডের দাভোসে আয়োজিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের এক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে এসব পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। সেখানেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন শান্তি পর্ষদের যাত্রা শুরুর ঘোষণা দেন। এ বোর্ডের দায়িত্ব হবে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে দুই বছর ধরে চলা যুদ্ধের অবসান ঘটানো এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা পুনর্গঠনের কার্যক্রম পরিচালনা করা।
ট্রাম্প বলেন, মনেপ্রাণে আমি একজন রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী এবং এটি পুরোপুরি জায়গার খেলা। সমুদ্রের ধারের এ জায়গাটি দেখুন। এ অসাধারণ ভূখণ্ডটি দেখুন। অনেক মানুষের জন্য এটি অনেক বড় কিছু হয়ে উঠতে পারে। ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার গত অক্টোবরে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির আলোচনায় ভূমিকা রেখেছিলেন। তিনি বলেন, গাজায় প্রায় ৯০ হাজার টন গোলাবারুদ ব্যবহার করা হয়েছে এবং সেখানে প্রায় ছয় কোটি টন ধ্বংসস্তূপ জমে আছে, যা পরিষ্কার করতে হবে। কুশনার বলেন, হামাস নিরস্ত্রীকরণের চুক্তিতে সই করেছে এবং সেটি বাস্তবায়ন করা হবে। যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনায় গাজায় উপকূলীয় পর্যটন এলাকা দেখানো হয়েছে, যেখানে প্রায় ১৮০টি উঁচু ভবন থাকবে। পাশাপাশি থাকবে আবাসিক এলাকা, শিল্প অঞ্চল, তথ্যপ্রযুক্তি কেন্দ্র, আধুনিক কারখানা, পার্ক, কৃষিজমি ও খেলাধুলার সুবিধা।
মিসর সীমান্তের কাছে একটি নতুন সমুদ্রবন্দর ও বিমানবন্দর নির্মাণের কথাও বলা হয়েছে এতে। পাশাপাশি, সেখানে এমন একটি বিশেষ সীমান্ত পারাপারের ব্যবস্থা থাকবে, যেখানে মিসর ও ইসরায়েলের সীমান্ত মিলিত হয়েছে। গাজা পুনর্গঠনের কাজ চারটি ধাপে করা হবে। প্রথমে রাফাহ থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে উত্তরের দিকে গাজা শহরের দিকে অগ্রসর হওয়া হবে। মানচিত্রে মিসর ও ইসরায়েল সীমান্ত বরাবর একটি খালি ভূখণ্ড দেখানো হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এটি ডোনাল্ড ট্রাম্পের সেই ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনায় উল্লেখ করা নিরাপত্তা এলাকা, যেখানে গাজা পুরোপুরি নিরাপদ না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলি বাহিনী অবস্থান করবে।
আরেকটি সøাইডে বলা হয়, নিউ রাফাহ এলাকায় এক লাখের বেশি স্থায়ী ঘর, ২০০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ৭৫টি চিকিৎসাকেন্দ্র তৈরি করা হবে। যুদ্ধের আগে গাজার দক্ষিণের এ শহরে প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার মানুষ বসবাস করত। কিন্তু ইসরায়েলি হামলা ও পরিকল্পিত ধ্বংসের ফলে শহরটি প্রায় পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে এবং এখন এটি ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণাধীন। কুশনার বলেন, দুই থেকে তিন বছরের মধ্যেই নিউ রাফাহ নির্মাণ শেষ করা সম্ভব। তিনি জানান, ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। নিউ গাজা হতে পারে আশার প্রতীক, একটি নতুন গন্তব্য এবং শিল্পনির্ভর একটি এলাকা। তিনি আরও বলেন, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ওয়াশিংটনে একটি সম্মেলন হবে।