ভোট দেওয়া ধর্মীয় দায়িত্ব

দেশের তরুণ আলেমদের মধ্যে গবেষণা, হাদিসের দরস, লেখালেখিসহ নানা কাজে যারা আলো ছড়াচ্ছেন, মুফতি লুৎফুর রহমান ফরায়েজি তাদের অন্যতম। তিনি তালীমুল ইসলাম ইনস্টিটিউট অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার ঢাকার পরিচালক। এই প্রতিষ্ঠানটি ইসলামি জীবনবিধান সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ফতোয়া প্রদান এবং লেখালেখি নিয়ে কাজ করছে নিবিড়ভাবে। অনুপ্রেরণাদায়ক ব্যক্তিত্ব হিসেবে আহলে হক মিডিয়ার পরিচালক মুফতি ফরায়েজি দেশের নানা প্রান্তে ওয়ায়েজ হিসেবে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। এ ছাড়া তিনি বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। সম্প্রতি এই ইসলামি স্কলার কথা বলেছেন নির্বাচন, নাগরিকের অধিকার, ভোটাধিকারসহ নানা বিষয়ে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মুফতি আতিকুর রহমান

দেশ রূপান্তর : ভোট দেওয়া কি কেবল নাগরিক দায়িত্ব? নাকি মুসলমান হিসেবে ধর্মীয় দায়িত্বও?

মুফতি লুৎফুর রহমান ফরায়েজি : ভোট দেওয়া শুধুই নাগরিক দায়িত্ব নয়, বরং এটি ধর্মীয় দায়িত্বও বটে। প্রত্যেক ব্যক্তির সাধ্যানুযায়ী অন্যায় ও অবিচার রুখে দেওয়ার তাগিদ কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। ভোট দিয়ে যোগ্য ও ন্যায়পরায়ণ প্রার্থীকে নির্বাচিত করতে পারলে ইসলাম ও মানবতার জন্য ক্ষতিকর ব্যক্তি থেকে কিছুটা হলেও রক্ষা পাওয়া যায়। জুলুম দেখেও প্রতিহত না করে একদম হাত গুটিয়ে বসে থাকার ব্যাপারে হাদিসে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারিত হয়েছে। হজরত আবু বকর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যদি লোকেরা জালেম ব্যক্তিকে দেখেও তাকে বাধা না দেয়, তাহলে মহান আল্লাহ তাদের সবার ওপর আজাব নাজিল করে দিতে পারেন।’ (সুনানে আবু দাউদ ৪৩৩৮)

যদি কারও চোখের সামনে জালেম নির্বাচিত হয়ে ইসলাম, মুসলমান ও সাধারণ জনগণের ক্ষতি করে, তাহলে এক্ষেত্রে নির্বাচনের আগে যারা জালেমের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ না করবে, তারা কেয়ামতের দিন মহান আল্লাহর দরবারে লাঞ্ছিত হবে। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তির সামনে কোনো মুমিনকে অপমান করা হয়, অথচ তাকে সহায়তা করার ক্ষমতা ওই ব্যক্তির থাকা সত্ত্বেও সে তাকে যদি সাহায্য না করে, তাহলে কেয়ামতের দিন মহান আল্লাহ তাকে সবার সামনে লাঞ্ছিত করবেন।’ (মুসনাদে আহমাদ ১৫৯৮৫)

জালেমের শক্তিকে রুখে দেওয়ার সামর্থ্য বা কর্মপদ্ধতি থাকা সত্ত্বেও বসে থাকা জায়েজ নয়। সুতরাং আমাদের দেশে যেহেতু নির্বাচনের সময় ভোটের দ্বারাই জালেম প্রার্থীদের রুখে দেওয়া অনেকাংশে সম্ভব হয়ে থাকে, তাই এ পদ্ধতিকে ব্যবহার না করে বসে থাকা জায়েজ হবে না। এ জন্য হকপন্থিকে ভোট দিয়ে সাধ্যানুযায়ী বাতিল শক্তির প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করতে হবে।

দেশ রূপান্তর : যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে একজন মুসলমান কোন কোন নৈতিক মানদণ্ড অনুসরণ করবে?

মুফতি লুৎফুর রহমান ফরায়েজি : যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে একজন মুসলমানের জন্য কয়েকটি বিষয় লক্ষ্য রাখা জরুরি। যেমন মুত্তাকি-পরহেজগার, ধীমান, সুবিবেচক, সাহসী ও ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী হওয়া, দ্বীনের মৌলিক শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে জাগতিক শিক্ষায় প্রয়োজনীয় জ্ঞান থাকা এবং ইসলামি আদর্শে আদর্শবান ও দেশপ্রেমিক হওয়া। এই গুণগুলো যার মাঝে থাকবে তাকে ভোট দেওয়া।

দেশ রূপান্তর : ইসলামের দৃষ্টিতে অযোগ্য বা দুর্নীতিগ্রস্ত প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার বিধান কী?

মুফতি লুৎফুর রহমান ফরায়েজি : অযোগ্য ও দুর্নীতিগ্রস্ত প্রার্থীকে ভোট দেওয়া সম্পূর্ণরূপে হারাম। কারণ ভোট দেওয়ার মানে হলো, তার যোগ্যতার সাক্ষী প্রদান করা, দেশ ও জাতির খেদমতের জন্য উকিল নিযুক্ত করা, যোগ্য বলে তার পক্ষে সুপারিশ করা। আর অযোগ্য ও দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তির পক্ষে সাক্ষী দেওয়া, উকিল বানানো এবং সুপারিশ করা কোনোভাবেই জায়েজ নয়। তাই এমন প্রার্থীকে ভোট দেওয়া হারাম।

দেশ রূপান্তর : নির্বাচনের সময় দলীয় স্বার্থের সঙ্গে নৈতিকতার সংঘর্ষ হলে কোনটিকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত?

মুফতি লুৎফুর রহমান ফরায়েজি : অবশ্যই নৈতিকাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে যোগ্য ব্যক্তির পক্ষে থাকাই নৈতিক দায়িত্ব।

দেশ রূপান্তর : নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা সম্পর্কে ইসলাম কী বলে?

মুফতি লুৎফুর রহমান ফরায়েজি : প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা ভঙ্গকারী ব্যক্তিকে হাদিসে মুনাফিক বলা হয়েছে। (সহিহ বুখারি ২৬৮২) কোরআনে এমন ব্যক্তির ওপর অভিশম্পাত করা হয়েছে। (সুরা আলে ইমরান ৬১) এমনটি করা পরিষ্কার ধোঁকাবাজি। আর ধোঁকাবাজ ব্যক্তি উম্মতে মুহাম্মদির অন্তর্ভুক্ত নয় বলে হাদিসে ইরশাদ হয়েছে। (সুনানে ইবনে মাজাহ ২২২৫)

তবে প্রতিশ্রুতি রক্ষায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করার পরও যদি ওয়াদাকৃত কাজটি করতে না পারে, তাহলে ওই ব্যক্তি মাজুর (অপারগ) সাব্যস্ত হবেন। সেই হিসেবে তিনি মুনাফিক, ধোঁকাবাজ ও অভিশম্পাতের অধিকারী হবেন না।

দেশ রূপান্তর : ভোট কেনাবেচা এবং অর্থ বা সুবিধার বিনিময়ে ভোট দেওয়ার শরয়ি অবস্থান কী?

মুফতি লুৎফুর রহমান ফরায়েজি : ভোট দেওয়া ভোটারের নাগরিক অধিকার ও দায়িত্ব। নিজ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অন্যের কাছ থেকে সুবিধা গ্রহণ করা গর্হিত কাজ। সুবিধা গ্রহণ করে যদি অযোগ্য প্রার্থীকে ভোট দেয়, তাহলে সেটি হারাম ও মারাত্মক গুনাহের কাজ হবে।

দেশ রূপান্তর : অনেকেই নির্বাচনী প্রচারণায় মিথ্যা আশ্বাস ও অপপ্রচার করে। এই বিষয়ে কী বলবেন?

মুফতি লুৎফুর রহমান ফরায়েজি : মিথ্যা আশ্বাস দেওয়া মারাত্মক গুনাহের কাজ। এটি জাতির সঙ্গে প্রতারণা। আর এমন প্রতারক ব্যক্তিদের বিষয়ে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ধোঁকা দেয়, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা ২৩১৪৭) সুতরাং অপপ্রচার মানেই মিথ্যার বিস্তার করা। এটি হারাম কাজ, যা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক।

দেশ রূপান্তর : গণতন্ত্র ও ইসলামি শাসনব্যবস্থার মধ্যে মৌলিক মিল ও অমিল কী?

মুফতি লুৎফুর রহমান ফরায়েজি : (কিছু মিল) ইসলামে জমহুর তথা অধিকাংশ সাধারণ মানুষের মত গ্রহণ একেবারে মূল্যহীন নয়। বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনমতও গ্রহণযোগ্য। বিশেষ করে ‘আরিফুল কওম’ বা জনপ্রতিনিধি নির্বাচনে অধিকাংশ মানুষের মতও গুরুত্বপূর্ণ। হুনাইন যুদ্ধের পর হাওয়াজিন গোত্র থেকে প্রাপ্ত গনিমত ফেরত প্রদানের ক্ষেত্রে ‘আরিফুল কওম’-এর মাধ্যমে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জনমত যাচাই করেছিলেন। সুতরাং এ ক্ষেত্রে ইসলামি শাসনব্যবস্থা ও গণতন্ত্রের সঙ্গে মিল পাওয়া যায়। যদিও সরকারপ্রধান নির্বাচনের ক্ষেত্রে সব জনগণের মত যাচাই না করে বরং দেশের গ্রহণযোগ্য জ্ঞানী, আলেম-ওলামা, শিক্ষাবিদ, শাস্ত্রবিদ, বিভিন্ন বাহিনীর প্রধান ও জনপ্রতিনিধির মত অনুযায়ী হওয়া ইসলামে কাম্য।

(কিছু অমিল) এক. গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় সংখ্যাধিক্যের কারণে সংসদে যাওয়া গুটিকয়েক লোক নিজেদের মতো করে আইন প্রণয়ন করে জনগণের ওপর চাপিয়ে দেয়। এভাবে প্রচলিত গণতন্ত্রে মানুষের ওপর মানুষের প্রভুত্ব, শাসন ও শোষণ পাকাপোক্ত হয়। গণতান্ত্রিক শাসনে মানুষের অভিরুচি ও মানসিকতা অনুযায়ী আইন পরিবর্তন হয়। ফলে অসাধু স্বৈরাচারী কারও হাতে ক্ষমতা গেলে নিজের ইচ্ছেমতো আইন তৈরি করে মানুষকে গোলামে পরিণত করে। এসব কারণে জনগণ তাদের জীবনাচার নিয়ে আশ^স্ত থাকতে পারে না। কিন্তু ইসলামি শাসনব্যবস্থায় স্রষ্টা নির্ধারিত আইনকে সৃষ্টির জন্য প্রয়োগ করা হয়। ইসলামি শাসনব্যবস্থায় মানুষের প্রভুত্ব নয়, বরং আল্লাহর প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। ইসলামি শাসনে যেহেতু আল্লাহর নির্ধারিত আইনে দেশ পরিচালিত হয়, তাই আইনের যাঁতাকালে জনগণ নিষ্পেষিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। দুই. ইউরোপীয় গণতন্ত্রে জনগণের ধর্মীয় বিশ্বাসকে রাজনীতি থেকে আলাদা সাব্যস্ত করা হয়। কিন্তু ইসলামি শাসনব্যবস্থায় ইসলামই হয় রাজনীতির নিয়ন্ত্রক। তিন. পশ্চিমা গণতন্ত্রের মূল দর্শন অনুযায়ী জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস, জনগণই শুরু, জনগণই শেষ, জনগণ যা বৈধ বলবে তা বৈধ, জনগণ যা অবৈধ বলবে তা অবৈধ। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে সব ক্ষমতার প্রকৃত মালিক মহান আল্লাহ। তিনিই আসমান-জমিনের সার্বভৌমত্বের মালিক। শাসন ও বিচারের মূল অধিকার একমাত্র তার। জনতা ও শাসকের মালিকানা খোদাপ্রদত্ব ও শরিয়া নিয়ন্ত্রিত। চার. প্রচলিত গণতন্ত্রে আইন প্রণয়নের অধিকার জনপ্রতিনিধির। এক্ষেত্রে তারা সম্পূর্ণ স্বাধীন। এমন কি তারা কোরআন ও সুন্নাহ বিরোধী আইন করারও অধিকার রাখে। কিন্তু ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থায় আইন প্রণয়নের অধিকার একমাত্র আল্লাহ ও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের। কোরআন ও সুন্নাহ হলো আইনের উৎস। কোরআন ও সুন্নাহ বিরোধী কোনো আইন প্রণয়ন করতে পারবে না। মানুষ আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে আল্লাহ ও নবীর আইনকে বাস্তবায়ন করবে ও শরিয়ার অধীনে প্রয়োজনীয় আইন রচনা করবে। পাঁচ. প্রচলিত গণতন্ত্রে ভালো ও মন্দ আপেক্ষিক বিষয়। জনগণ যখন যেটাকে ভালো বলবে সেটা ভালো। আর যেটাকে খারাপ বলবে সেটা খারাপ। কিন্তু ইসলামি শাসনে ভালো ও মন্দের মাপকাঠি কোরআন ও সুন্নাহ। যা কিছু কোরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী হবে সেটা ভালো আর বিরোধী হলে তা খারাপ।