আ.লীগের ভোট নিয়ে টানাটানি

নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের বিজয় নিশ্চিত করা, ভোটকে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক করে তোলার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য স্থির করে এ সময়ে আওয়ামী লীগের ভোটারদের কদর বেড়েছে বিএনপি-জামায়াত, জাতীয় পার্টিসহ নির্বাচনে অংশ নেওয়া অন্য সব দলের কাছে। বিএনপি-জামায়াতসহ নির্বাচনী লড়াইতে নামা সব দলই আওয়ামী লীগের ভোট টানতে উঠে পড়ে লেগেছে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আওয়ামী লীগের ভোট টানতে যেসব আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছেন, সেটিকে ভালো চোখে দেখছেন না। বিএনপি-জামায়াতের এ কৌশলকে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন ও নিরেট আদর্শহীন রাজনীতি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

এ প্রসঙ্গে দেশ রূপান্তরকে বিশ্লেষকরা বলেন, ক্ষমতায় যাওয়ার রাজনীতি ও বুর্জোয়া রাজনীতিতে এটাই স্বাভাবিক। নিরেট আদর্শবাদী রাজনৈতিক দল ও রাজনীতি থাকলে আওয়ামী লীগের ভোট পেতে এভাবে উঠে পড়ে লাগত না। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, এটাই ভোটের প্রতিযোগিতা। ভোটের কৌশল। তবে বিএনপি-জামায়াত যা করছে তা বাড়াবাড়ি পর্যায়ে। যেভাবে আশ্বাস দিচ্ছে, এগুলো উৎকোচ দেওয়ার সমতুল্য। প্ররোচনা। আচরণবিধি লঙ্ঘনের শামিল।

গতকাল শনিবার ঠাকুরগাঁওয়ে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, দেশে শুধু দুটোই মার্কা। নৌকা আর ধানের শীষ। নৌকা এখন আমাদের কাছে নেই, তাহলে ভোট দেবেন ধানের শীষে। নতুন যে মার্কা দাঁড়িপাল্লা এসেছে তা স্বাধীনতাবিরোধী দল।

এর আগের দিন গত শুক্রবার নির্বাচনী প্রচারণায় একই জায়গায় তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের বিনা অপরাধীদের সঙ্গে তিনি ও তার দল থাকবে। নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিয়ে জামায়াত নেতারাও আওয়ামী লীগের ভোট টানতে নানা রকম আশ্বাস দিচ্ছেন।

জামায়াতের পক্ষ থেকেও করা হচ্ছে একই কাজ। দলটি আওয়ামী লীগ নেতাদের দলে ভিড়িয়ে তাদের মাধ্যমে ‘নৌকার’ ভোট টানার চেষ্টা করছে। গত বৃহস্পতিবার কুমিল্লা-১১ (চৌদ্দগ্রাম) আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের নির্বাচনী সমাবেশে বক্তৃতা দিয়েছেন আওয়ামী লীগের স্থানীয় এক নেতা। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। আওয়ামী লীগের ওই নেতার নাম সালাউদ্দিন আহমেদ মজুমদার। তিনি কালিকাপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি। তিনি নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। ৫ আগস্টের পর তাকে অপসারণ করা হয়।

ভোট ঘিরে আওয়ামী লীগের ভোট টানতে বিএনপি-জামায়াতের যে লড়াই শুরু হয়েছে তার পেছনে আরও কিছু কারণ রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের ভাষ্য, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে বাইরে রাখার ফলে নির্বাচন নিয়ে দেশে-বিদেশে এক ধরনের সমালোচনা ও চাপ দেখা দিয়েছে। নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নির্বাচনের আগেই প্রশ্ন তোলার চেষ্টা চলছে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী-সমর্থকরা ভোট বর্জন করলে ভোটার উপস্থিতি হতাশাজনক হবে। তাতে নির্বাচন নিয়ে বিদেশিদের সমালোচনা শুনতে হবে। দুর্বল হয়ে উঠবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ঘিরে সামনে উঠে আসা এসব ইস্যু ছাই চাপা দিতে আওয়ামী লীগবিরোধী সব পক্ষই এ কৌশল গ্রহণ করেছে। দলটির ভোট টানতে নানা রকম আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছে।

তবে বিএনপি-জামায়াত আওয়ামী লীগের ভোট পেতে সর্বোচ্চ চেষ্টা অব্যাহত রাখলেও জাতীয় পার্টি এ লড়াইয়ে একটু পিছিয়ে রয়েছে। দলটি বিশ্বাস করে আমরা নিশ্চিত আওয়ামী লীগের ভোটাররা কেন্দ্রে ভোট দিতে আসবে না। যদি এসেই থাকে সেই ভোটারগুলো জাতীয় পার্টিকেই ভোট দেবে। ফলে আওয়ামী লীগের ভোটারদের পিছনে না ছুটলেও চলবে তাদের।

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ দল হিসেবে এখনো নিষিদ্ধ নয়। আওয়ামী লীগকে রাজনীতি করতে দেওয়া হচ্ছে না ঠিক আছে, কিন্তু তাদের সমর্থকদের ভোট দিতে দেবেন না, নাগরিকত্বের অধিকার দেবেন না, এটি কখনো কোনো দেশে হয়নি। তারা নির্বাচনে আসতে চাইলে তাদের চাপ দেওয়া হচ্ছে।’

কাদের বলেন, ‘বলা হচ্ছে আওয়ামী লীগ আমাদের ভোট দিলে ঠিক আছে, কিন্তু জাতীয় পার্টিকে দেওয়া যাবে না। তাহলে জাতীয় পার্টির কী অপরাধ। জামায়াত, বিএনপি, এনসিপি সবাই আওয়ামী লীগের ভোট চাইছে। তাদের কোনো অপরাধ নেই। কিন্তু জাতীয় পার্টি চাইলে দোসর হয়ে যাচ্ছে।’

এদিকে, বিএনপি ভিন্ন একটি কৌশল নিয়ে আওয়ামী লীগের ভোট পাওয়া ও ভোটারদের কেন্দ্রে আসার অনুরোধ করছে। সেই কৌশলের পুরোভাগে গণভোটের ব্যাপার রয়েছে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ পরাজিত করতে হলে আওয়ামী লীগের ভোটার যত বেশি আসবে তত সম্ভাবনা দেখা দেবে না ভোট জেতার। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে আওয়ামী লীগ ভোটারদের বোঝাচ্ছে বিএনপি।

বিএনপির শীর্ষ পর্যায় মনে করে, গণভোটে না যেতে উৎসাহ দিয়ে ভোটার টানা গেলে ধানের শীষ প্রতীকে ভোটও নিশ্চিত করা যাবে।

আওয়ামী লীগের ভোট টানতে জামায়াতের কৌশল হলো ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি তাদের সামনে তুলে ধরা। জামায়াত আওয়ামী লীগের ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ভোট চাওয়ার পাশাপাশি স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে, গত দেড় বছরে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা অত্যাচারিত হয়েছে বিএনপির দ্বারা। জামায়াত বলছে, তাদের কোনো নেতাকর্মী আওয়ামী লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছে নজির নেই, বাড়ি পুড়িয়েছে, ব্যবসা-বাণিজ্য দখল করার ইতিহাস নেই। ক্ষেত্রবিশেষে অনেক এলাকায় জামায়াত নিরাপত্তা দিয়েছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের। ভবিষ্যতে জামায়াত ক্ষমতায় এলে সে সুযোগ আরও বেড়ে যাবে। বিএনপি ক্ষমতায় আসলে অত্যাচার-নির্যাতনের মাত্রা আরও বেড়ে যাবে।

আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ে কথা বলে জানা গেছে, জামায়াতের ভোট নেওয়ার যে কৌশল গ্রহণ করে মাঠে নেমেছে সেটি আওয়ামী লীগের একটি অংশের ভোটাররা বিশ্বাসও করতে শুরু করেছে। দলটির অনেকেই মনে করে বিএনপি সত্যিকার অর্থে অত্যাচার-নির্যাতন বাড়িয়ে দেবে।

আওয়ামী লীগের তৃণমূলের একটি অংশ ভোটকেন্দ্রে গেলে জামায়াতের দিকে ঝুঁকে যাওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জামায়াতের এ কৌশল জানতে পেরেছে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়। তাই বিএনপি সিরিয়াস হয়ে উঠেছে আওয়ামী লীগের ভোট পেতে। ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে ঘটনাগুলো ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টার পাশাপাশি ভোটের মাঠে আওয়ামী লীগের শাসনামলের সমালোচনা যত কম করে পারা যায় সেই চেষ্টা করে যাচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে বলতে হয়েছে বিনা অপরাধী আওয়ামী লীগের পাশে বিএনপি থাকবে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ক্ষমতায় যাওয়া ও বুর্জোয়া রাজনীতিতে এটাই স্বাভাবিক। এগুলো সুবিধাবাদী রাজনীতি। বিএনপি-জামায়াত চেষ্টা করবে আওয়ামী লীগের ভোট ভাগাভাগি করার। এখানে কোয়ালিটি ম্যাটার করে না। কোয়ান্টিটি ম্যাটার করে। নিরেট আদর্শবাদী দল হলে এভাবে উঠে পড়ে লাগত না আওয়ামী লীগের ভোট পেতে। এ ধরনের রাজনীতি আদর্শবাদী রাজনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এ ধরনের ক্ষমতাকাঠামো ও রাজনীতি যতদিন থাকবে সুবিধাবাদী রাজনীতিও থাকবে।