পুণ্যভূমি হিসেবে খ্যাত বারো আউলিয়ার শহর চট্টগ্রামে আসছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচনী প্রচারণার তৃতীয় দিন আজ রবিবার চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক পলোগ্রাউন্ড মাঠে নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দেবেন তিনি। ইতিমধ্যে জনসভার সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপি।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির চেয়ারপারসন হিসেবে ২০১২ সালের ৯ জানুয়ারি চট্টগ্রামের পলোগ্রাউন্ড ময়দানের মহাসমাবেশে সর্বশেষ বক্তব্য রেখেছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। মায়ের উত্তরসূরি হিসেবে চৌদ্দ বছর পর একই স্থানে দলীয় সমাবেশে বক্তব্য রাখবেন বিএনপির নতুন চেয়ারম্যান তারেক রহমান। চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলার ব্যবস্থাপনায় আজ সকাল ১০টায় এ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। সমাবেশের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত এখন ঐতিহাসিক পলোগ্রাউন্ড ময়দান।
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালে চট্টগ্রামে সার্কিট হাউজে বিপথগামী সেনা সদস্যদের হাতে নিহত হন। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া চট্টগ্রামে এলে সার্কিট হাউজে রাত্রিযাপন করতেন। কিন্তু বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান সার্কিট হাউজে না থেকে হোটেলে উঠেছেন রাত্রিযাপনের জন্য। সমাবেশে যোগ দিতে শনিবার রাতেই চট্টগ্রাম পৌঁছেছেন তারেক রহমান।
চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান দেশ রূপান্তরকে জানান, দলের চেয়ারম্যান চট্টগ্রামের একটি হোটেলে শনিবার রাতযাপন করবেন। রবিবার সকাল সাড়ে ৯টায় তিনি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ইয়ুথ পলিসি টক-এ অংশ নেবেন। সকাল ১১টায় তারেক রহমান পলোগ্রাউন্ড মাঠের সমাবেশে উপস্থিত হবেন এবং সেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখবেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার বিষয়ে দলীয় বক্তব্য তুলে ধরবেন। এর আগেও চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার বিরোধিতা করে বক্তব্য দিয়েছিলেন তিনি।
চট্টগ্রামের জনসভা শেষে বিকেলে ফেনী পাইলট স্কুল খেলার মাঠে বিকেল ৪টায় জনসভা করবেন তারেক রহমান। এরপর কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম হাইস্কুল মাঠ, সুয়াগাজী ডিগবাজি মাঠ, দাউদকান্দি কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠ এবং সর্বশেষ নারায়ণগঞ্জের কাচপুর বালুর মাঠে জনসভা শেষে ঢাকায় ফিরবেন তিনি।
গত বৃহস্পতিবার নির্বাচনী প্রচারণার প্রথম দিন সিলেটে আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে জনসভা করেন তিনি। দ্বিতীয় দিন শুক্রবার রাজধানীর ভাষানটেকে নিজ নির্বাচনী এলাকা ঢাকা-১৭ আসনে নির্বাচনী সভা করেন তারেক রহমান।
চট্টগ্রাম নগরীতে সবচেয়ে বেশি ধারণক্ষমতাসম্পন্ন ভেন্যু হিসেবে দেশের অনেক রাজনৈতিক ইতিহাসের সাক্ষী পলোগ্রাউন্ড ময়দানে চৌদ্দ বছর আগে চারদলীয় জোটের সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য রেখেছিলেন বিএনপির তৎকালীন চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। সেদিনের সমাবেশের স্মৃতিচারণ করে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বর্তমান মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিসহ বিভিন্ন দাবিতে সেদিন আমরা এক ঐতিহাসিক সমাবেশ উপহার দিয়েছিলাম। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার এটাই ছিল আক্ষরিক অর্থে চট্টগ্রামে শেষ সমাবেশ। এরপর চট্টগ্রামে আর কোনো সমাবেশে তিনি আসেননি। এরপর ২০১৭ সালে তিনি সড়কপথে চট্টগ্রাম হয়ে রোহিঙ্গাদের দেখতে গিয়েছিলেন। ওই সময় পথে পথে আপামর জনতা রাস্তার দুপাশে দাঁড়িয়ে তাকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। কিন্তু তখন কোনো সমাবেশ হয়নি।
তিনি জানান, প্রায় ২১ বছর আগে সর্বশেষ চট্টগ্রাম এসেছিলেন তারেক রহমান। ২০০৫ সালের ৬ মে লালদীঘি ময়দানে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র পদপ্রার্থী মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিনের সমর্থনে আয়োজিত সমাবেশে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর গত ৯ জানুয়ারি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান তিনি। দলের চেয়ারম্যান হিসেবে এই প্রথম তিনি চট্টগ্রাম সফর করছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে তারেক রহমানের এই সমাবেশ ঘিরে চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিএনপির নির্বাচনী শোডাউনের প্রস্তুতি চলছে। চট্টগ্রাম মহানগর ছাড়াও প্রতিটি উপজেলায় দলীয় মনোনয়নপ্রাপ্ত সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী ও দলের বিভিন্ন ইউনিটের দায়িত্বশীল নেতারা সমাবেশে ব্যাপক জনসমাগমের প্রস্তুতি নিয়েছেন। পাশাপাশি যুবদল, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দলসহ অন্য সহযোগী সংগঠনগুলোও পৃথক পৃথকভাবে প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে।
ইতিমধ্যে সমাবেশের ভেন্যু পলোগ্রাউন্ড মাঠে মঞ্চ তৈরির কাজ সম্পন্ন হয়েছে। শনিবার বিকেলে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বশীল নেতারা সমাবেশস্থল পরিদর্শন করেছেন। মাঠের সার্বিক অবস্থা, মঞ্চ স্থাপন, প্রবেশ ও বহির্গমন পথ, পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থা, নিরাপত্তা প্রস্তুতি এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত বিষয়সমূহ খতিয়ে দেখেন।
মাঠ পরিদর্শনকালে সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক পলোগ্রাউন্ডের এই মহাসমাবেশ শুধু একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়, এটি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে জনগণের শক্তিশালী অভিপ্রায়ের বহিঃপ্রকাশ। এই সমাবেশের মাধ্যমে গণতন্ত্রের পক্ষে জনতার ঐক্য আরও সুদৃঢ় হবে।
তিনি বলেন, মহাসমাবেশকে ঘিরে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা জনদুর্ভোগ যেন সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। পরিচ্ছন্নতা, শৃঙ্খলা ও নাগরিক ভোগান্তি এড়ানো আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার। তিনি মহাসমাবেশটি শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করতে দলীয় নেতাকর্মীসহ চট্টগ্রাম নগরবাসীর সর্বাত্মক সহযোগিতা কামনা করেন।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ভিপি হারুন অর রশীদ, ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক আলহাজ এরশাদ উল্লাহ, সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্কর, চট্টগ্রাম-৯ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী আলহাজ আবু সুফিয়ান, দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আলহাজ ইদ্রিস মিয়া, মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমানসহ বিএনপি নেতাকর্মীরা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।