মেয়ের দিকে নজর দেওয়ায় আনিসকে খুন করে ৬ টুকরো

মেয়ের দিকে কুনজর দেওয়ার ক্ষোভ থেকে মো. আনিসকে নোড়া (শিল) দিয়ে আঘাতের পর লাশ ছয় টুকরো করে ফেলে দেওয়া হয় খাল ও ভাগাড়ে। গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় আনিস খুনের বিষয়ে এ তথ্য জানিয়েছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নগরের বায়েজিদ বোস্তামি থানার উপপরিদর্শক নিজাম উদ্দিন।

আনিস হত্যার দায় স্বীকার করে গ্রেপ্তার সুফিয়া গতকাল দুপুরে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ১৬৪ ধারার জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানান পুলিশের এই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, চার-পাঁচ বছর ধরে সুফিয়ার সঙ্গে পরকীয়ায় লিপ্ত ছিলেন মো. আনিস (৩৮)। দুজনের পরকীয়ায় বিষয়টি এক সময় জেনে যান সুফিয়ার স্বামী নুর আলম। ক্ষোভ থেকে নুর আলম সুফিয়াকে ছেড়ে আরেকটি বিয়ে করে অন্য জায়গায় সংসার পাতেন। সুফিয়ার তিন মেয়ে এক ছেলে। কিছুদিন আগে বড় মেয়ের বিয়ে ঠিক হয়। এর মধ্যে আনিসের কুনজর পড়ে সুফিয়ার মেয়ের ওপর। এদিকে সুফিয়ার সঙ্গে বিশেষ মুহূর্তের একটি ভিডিও ছিল আনিসের কাছে। ওই ভিডিও সুফিয়াকে দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে আসছিলেন আনিস। ভিডিও দেখিয়ে মেয়ের সঙ্গেও অনৈতিক সম্পর্কে জড়ানোর কুপ্রস্তাব দিলে ক্ষোভে ফেটে পড়েন সুফিয়া। বিষয়টি ভাইকে জানালে তিনি (ভাই) বলেন, ‘আনিস তোমার সংসার ভেঙেছে। এখন তাকে দুনিয়া থেকে না সরালে তোমার (সুফিয়া) শান্তি হবে না।’ পরিকল্পনা মাফিক গত ২০ জানুয়ারি বাসায় ডেকে নিয়ে আনিসকে হত্যা করে লাশ ছয় টুকরো করে খালে এবং ভাগাড়ে ফেলে দেওয়া হয়।

খুন করার পর সুফিয়া নিজেই দা দিয়ে আনিসের লাশের ছয় টুকরো করেছেন বলে পুলিশের কাছে স্বীকার করেন। নারী হয়ে কীভাবে এ কাজ করতে পারলেন? পুলিশের এমন প্রশ্নের উত্তরে সুফিয়া আক্তার বলেন, ‘আমার স্বামী, ভাই, পেশায় কসাই। কীভাবে কাটতে হয় তা আমার জানা ছিল।’ আলামত হিসেবে হত্যায় ব্যবহৃত দা পুলিশ উদ্ধার করেছে বলে জানান তদন্তকারী কর্মকর্তা।

এর আগে গত শুক্রবার নগরের বায়েজিদ বোস্তামি থানা এলাকার একাধিক স্থান থেকে আনিসের লাশের টুকরোগুলো উদ্ধার করে পুলিশ। এর আগের দিন একই থানা এলাকা থেকে আনিসের দুটি হাত ও দুই পা উদ্ধার করে পুলিশ। শুক্রবার আনিসের মাথাসহ শরীরের চারটি অংশ উদ্ধার করা হয়।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, নিহত মো. আনিসের (৩৮) গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার চিকদাইর এলাকায়। তার বাবার নাম হায়দার আলী। সুফিয়া আক্তার গত ২০ জানুয়ারি বিকেল ৩টার দিকে বাসায় ডেকে নিয়ে প্রথমে আনিসের মাথায় মসলা বাটার নোড়া (শিল) দিয়ে আঘাত করেন। এরপর ভাইসহ দুজনের সহায়তায় আনিসের শরীর চাপাতি দিয়ে কেটে ছয় টুকরো করেন। সুফিয়ার গ্রামের বাড়ি রাউজান চিকদাইর এলাকায়। তার বাবার নাম আন্তু মিয়া।

গ্রেপ্তার তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদের সূত্রে চট্টগ্রাম নগর পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) আমিরুল ইসলাম আনিস হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা তুলে ধরেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে জানান, আনিস পেশায় ছিলেন কসাই। গত ২২ জানুয়ারি বিকেল ৩টায় নগরের অক্সিজেন শহীদনগর পাঠানপাড়া এলাকায় অবস্থিত তার বাসায় আনিসকে ডেকে আনেন সুফিয়া। এরপর প্রথমে আনিসের মাথায় নোড়া দিয়ে আঘাত করেন। পরে তার ভাই ও আরেক যুবকের সহায়তায় আনিসের গলা কেটে মৃত্যু নিশ্চিত করেন। হত্যার পর আনিসের দুই হাত ও পা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়। পুরো শরীর ছয়টি টুকরো করে পলিথিনে মুড়িয়ে ফেলা হয় আশপাশের খাল ও ভাগাড়ে।

গতকাল দুপুরে ঘটনাস্থল অক্সিজেন শহীদনগর পাঠানপাড়ায় গেলে সেখানকার বাসিন্দা গোলাম দস্তগীর বলেন, ‘সুফিয়ার সঙ্গে পরকীয়ার সম্পর্ক ছিল আনিসের। আনিস তার (সুফিয়া) বাসায় আসা-যাওয়া করতেন।’

স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ আজহার আলী বলেন, গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় পলিথিনে মোড়ানো দুটি হাত কুকুরের টানাটানি করতে দেখে থানায় খবর দেন স্থানীয়রা। পরে পুলিশ এসে দুটি হাত ও দুটি পা উদ্ধার করে।

বায়েজিদ বোস্তামি থানার ওসি জাহিদুল কবীর বলেন, ‘দুটি হাত ও দুটি পা উদ্ধারের পর পরিচয় নিশ্চিত করতে হাতের আঙুলের ছাপ নিলে আনিসের পরিচয় বেরিয়ে আসে। এরপর তার (আনিস) মোবাইল ফোন নম্বরের কললিস্টের সূত্র ধরে সুফিয়া ও তার ভাইসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। শুক্রবার নিহত আনিসের মাথাসহ শরীরের বাকি অংশ উদ্ধার করা হয়।’

এদিকে গতকাল রাতে এক সংবাদ সম্মেলনে নগর পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) আমিরুল ইসলাম বলেন, খুনের ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া নারী বিবাহিত। তার সঙ্গে আনিসের প্রায় পাঁচ বছর ধরে প্রেমের সম্পর্ক। সম্প্রতি দুজনের বিরোধ সৃষ্টি হয়। এর জেরে আনিসকে খুন করা হয়েছে।’

স্বজনদের দাবি সুফিয়ার সঙ্গে আনিসের কিছু ছবি রয়েছে। এসব ছবি দিয় সুফিয়াকে ব্ল্যাকমেইল করে আসছিলেন আনিস। একপর্যায়ে সুফিয়ার মেয়ের দিকেও কুনজর দেন আনিস। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে আনিসকে খুন করা হয়েছে।