যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের নতুন করে শুরু হওয়া উত্তেজনা বেড়েই চলেছে। দেশটিতে সবশেষ গণবিক্ষোভের পর থেকেই দুই দেশের শীর্ষ নেতারা কথার লড়াইয়ে মেতে উঠেছেন; যেখানে হুমকি আর পাল্টা হুমকিতে একে অপরের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দিয়ে যাচ্ছেন তারা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, দেশটির নৌবাহিনীর রণতরীর একটি বিশাল বহর পারস্য উপসাগরের দিকে যাচ্ছে। ট্রাম্পের এমন ঘোষণা দেওয়ার পর কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল ইরান। গত শুক্রবার দেশটির এক জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা বলেন, যেকোনো ধরনের হামলাকে নিজেদের ওপর ‘সর্বাত্মক যুদ্ধ’ হিসেবে দেখবে ইরান। তেমনটা ঘটলে সবচেয়ে কঠিন জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে ইরান। এদিকে, তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেছেন, ইরানের ওপর হামলার সুযোগ খুঁজছে ইসরায়েল। তিনি এই আশঙ্কার কথা তেহরানের নেতৃত্বকেও জানিয়ে দিয়েছেন। অন্যদিকে, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলার শঙ্কায় মধ্যপ্রাচ্যে ফ্লাইট বাতিল শুরু করেছে একাধিক আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা। লুফথানসা, কেএলএম রয়্যাল ডাচ এয়ারলাইনস ও এয়ার ফ্রান্স মধ্যপ্রাচ্যে বিমান চলাচল স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছে। এর ফলে ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবে বিমান চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পরিচয় না প্রকাশ করার শর্তে ওই কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, আমরা আশা করছি ওয়াশিংটনের এই সামরিক শক্তি বৃদ্ধি সত্যিকার সংঘর্ষের উদ্দেশ্যে নয়। তবে আমাদের সামরিক বাহিনী সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত আছে। এই কারণেই ইরানে সবকিছু উচ্চ সতর্কাবস্থায় আছে। তিনি আরও বলেন, এবার আমরা যেকোনো হামলাকে সীমিত, সীমাহীন, সার্জিক্যাল, কাইনেটিক, তারা এগুলোকে যাই বলুক, আমাদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ হিসেবে গণ্য করব আর এর নিষ্পত্তি করতে সম্ভাব্য কঠোরতম উপায়ে প্রতিক্রিয়া জানাব। ওই ইরানি কর্মকর্তা বলেছেন, যদি কেউ ইরানের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা লঙ্ঘন করে আমরা জবাব দেব। তবে ইরানের জবাব কী ধরনের হবে তা সুনির্দিষ্টভাবে জানাতে অস্বীকার করেন তিনি। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক সামরিক হুমকির মুখে থাকা একটি দেশের এটি প্রতিরোধ করতে তাদের আয়ত্তের মধ্যে থাকা সবকিছুর ব্যবহার নিশ্চিত করবে। অতীতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী তীব্র উত্তেজনার সময় প্রায়ই মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত বাহিনী পাঠিয়েছে। তবে এসব পদক্ষেপের অধিকাংশই প্রতিরক্ষামূলক ছিল। কিন্তু গত বছরের জুনে ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোয় হামলার আগে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ওই অঞ্চলে বড় ধরনের শক্তি বৃদ্ধি করেছিল।
এদিকে, ইসরায়েল আবারও ইরানে হামলার সুযোগ খুঁজছে বলে জানিয়েছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। গত বছরের ৩০ নভেম্বর তেহরানে ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি প্রথম এই সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন বলে জানান। তিনি বলেন, ইসরায়েল যদি এমন কোনো পদক্ষেপ নেয়, তবে তা পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে আরও নষ্ট করবে। গত শুক্রবার এক সাক্ষাৎকারে ফিদান বলেন, আমি আশা করি, তারা অন্য কোনো পথ খুঁজে পাবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো ইসরায়েল বিশেষভাবে ইরানের ওপর হামলা চালানোর সুযোগ খুঁজছে। ফিদান সম্প্রতি তেহরান সফরকালে ইরানি কর্মকর্তাদের সরাসরি তার উদ্বেগের কথা জানান। তিনি বলেন, আমি বন্ধু হিসেবে তাদের সবকিছু বলেছি। আর আপনারা জানেন, বন্ধুরা সব সময় তিতা সত্য কথা বলে। এর আগে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। তিনি জানান, তুরস্ক ইরানে যেকোনো বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরোধী এবং তারা প্রতিবেশী দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে গুরুত্ব দেয়।
অন্যদিকে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র টানাপড়েনের জন্য মধ্যপ্রাচ্যে একাধিক এয়ারলাইনসের ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। ফিন্যান্সিয়াল টাইমস জানায়, এয়ার ফ্রান্স এরই মধ্যে ২৩ ও ২৪ জানুয়ারির দুবাইগামী ফ্লাইট বাতিল করেছে। অনির্দিষ্টকালের জন্য দুবাই, রিয়াদ, দাম্মাম ও তেল আবিবে ফ্লাইট স্থগিত রেখেছে কেএলএম রয়্যাল ডাচ এয়ারলাইনস। এয়ারলাইনসটি জানিয়েছে, ইরান, ইরাক ও ইসরায়েলসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের একাধিক দেশের আকাশসীমা এড়িয়ে চলছে তাদের বিমান। হামলার আশঙ্কায় ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ ও এয়ার কানাডা ইসরায়েলে ফ্লাইট বন্ধ করেছে।