এক বিচারপতির হাতেই ২৯৬ ফাঁসির আসামি

প্যাংস অব ডেথ, বাংলায় যার অর্থ মৃত্যুযন্ত্রণা; ভেঙে বললে মৃত্যুর অপেক্ষায় থাকার সময়ের তীব্র মানসিক যন্ত্রণা। মৃত্যুদন্ডের সাজা মাথায় নিয়ে যে আসামিরা নির্জন কারা প্রকোষ্ঠে (কনডেম সেল) থাকেন, তাদের যন্ত্রণা বোঝাতে এ শব্দবন্ধ যথার্থ বলে মনে করেন আইন ও বিচার-বিশ্লেষকরা। ফৌজদারি আইন ও বিচারব্যবস্থায় সবচেয়ে স্পর্শকাতর মামলা হিসেবে বিবেচনা করা হয় ফাঁসির আসামির মামলাকে। ‘প্যাংস অব ডেথ’পর্যায়ে থাকা আসামিদের মামলার দ্রুত নিষ্পত্তিতে রাষ্ট্রের আন্তরিকতা কতটুকু সে প্রশ্ন ওঠে প্রায়ই।

বাস্তবতা বলছে, অধস্তন আদালতে ফাঁসির রায় হয়ে গেলে এর চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য অপেক্ষা করতে হয় দীর্ঘ সময়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব মামলার নিষ্পত্তিতে দুই যুগ পর্যন্ত গড়ানোর নজিরও রয়েছে। অনেকে বলেন, অপরাধীর শাস্তি হওয়ারই কথা এবং আসামির প্রতি অনুকম্পা প্রদর্শনের সুযোগ নেই। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইন, বাংলাদেশের সংবিধান ও অন্যান্য বিধানে বিচারে দীর্ঘসূত্রতার বা আসামিকে শারীরিক ও মানসিক কষ্ট দেওয়ার সুযোগ নেই।

কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত (ডিসেম্বরে অধস্তন আদালতে অবকাশকালীন ছুটির কারণে নিয়মিত বিচার কার্যক্রম বন্ধ ছিল) দেশের ৬৮টি কেন্দ্রীয় ও জেলা কারাগারের ফাঁসির সেলগুলোতে ২ হাজার ৭০৫ জন মৃত্যুদ-প্রাপ্ত আসামি বন্দি ছিলেন এবং সংখ্যাটি কারা ইতিহাসে সর্বোচ্চ। তাদের মধ্যে নারী বন্দি ছিলেন ৯০ জন। আসামিদের মধ্যে হাইকোর্টে বিচারের নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ছিলেন ২ হাজার ৩৭০ জন। তাদের মধ্যে বিচারের নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ৬ থেকে ১৫ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে কনডেম সেলে রয়েছেন ৯৩৯ জন।

হাইকোর্টে মামলা নিষ্পত্তিতে ৬৬টি দ্বৈত ও একক বেঞ্চের মধ্যে মৃত্যুদ-প্রাপ্ত আসামিদের মামলা (ডেথ রেফারেন্স বা মৃত্যুদ- অনুমোদন) নিষ্পত্তির জন্য রয়েছে চারটি বেঞ্চ বা আদালত, যেখানে একেকটি বেঞ্চে দুজন করে (দ্বৈত বেঞ্চ) বিচারক দায়িত্ব পালন করছেন। হাইকোর্টে একেকটি বেঞ্চ প্রায় ৫৯২ জন ফাঁসির আসামির মামলা সামলাচ্ছে। আর একেক বিচারকের হাতে রয়েছে প্রায় ২৯৬ জন ফাঁসির আসামির ভবিষ্যৎ। 

অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ৩৩৫ জন ফাঁসির আসামির মামলা বিচারাধীন। ৬ থেকে ১৫ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে বিচারের নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছেন ৮৮ জন আসামি। বর্তমানে আপিল বিভাগে প্রধান বিচারপতিসহ ছয়জন বিচারক দায়িত্বে রয়েছেন। মাত্র ছয়জন বিচারক সামলাচ্ছেন তিনশোর বেশি ফাঁসির আসামির মামলা। হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগে শত শত স্পর্শকাতর মামলা পরিচালনায় বেঞ্চ ও বিচারকের এ সংখ্যাকে অপ্রতুল বলছেন ফৌজদারি আইনবিশেষজ্ঞ ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা। প্রসঙ্গত, ২০২৫ সালের বেশিরভাগ সময় হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স মামলার পরিচালনায় সাতটি দ্বৈত বেঞ্চ ছিল।

উচ্চ আদালতে নিয়মিত ফাঁসির আসামিদের মামলা পরিচালনাকারী জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিরা আসামিপক্ষের মামলার নথি ও সামাজিক অবস্থান বিশ্লেষণে বলেন, ফাঁসির সাজাপ্রাপ্ত বেশিরভাগ আসামি এবং তাদের পরিবার স্বল্পশিক্ষিত ও দরিদ্র শ্রেণির। অনেকের আইনজীবী নিয়োগের সামর্থ্যও থাকে না। কারও ক্ষেত্রে পরিবারও খোঁজ নেয় না। বছরের পর বছর মামলা টানতে গিয়ে তারা নিঃস্ব হয়ে যান।

‘ফাঁসি দিলেই ন্যায়বিচার আর খালাস দিলে ন্যায়বিচার ব্যাহত’ এমন ধারণা সঠিক নয় উল্লেখ করে ফৌজদারি আইনবিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সমাজে শৃঙ্খলা আনতে অপরাধীর সাজা নিশ্চিত করা দরকার। কিন্তু এটা কোনো নীতি হতে পারে না যে, খুন হলেই ফাঁসি দিতে হবে। মামলার মেরিট বিবেচনায় ফাঁসি হতেও পারে আবার নাও হতে পারে। কারণ একটা মামলা কখনোই আরেকটা মামলার মতো নয়। একজন কৃষকের ফাঁসি আর সুইডেন আসলামের ফাঁসি কি এক হলো? সুইডেন আসলামরা প্রায়ই আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘কনডেম সেলে যে থাকে, সেই বোঝে এই যন্ত্রণা কী! রাখডাক না রেখেই বলছি, ‘স্পিডি ট্রায়াল অ্যান্ড ডিসপোজাল অব ডেথ রেফারেন্স’র বাইরে কোনো কথা নেই। তার জন্য বেঞ্চ আরও বাড়ানো প্রয়োজন। পেপারবুক যদি আসামিপক্ষ নিজের খরচে করতে চায়, তাহলে অনুমতি দেওয়া উচিত। তাতে কিছু মামলার সুরাহা তো হবে!’

অপরাধ ও সমাজবিজ্ঞানীরা বহু দিন ধরে বলে আসছেন, জনসংখ্যার আধিক্য, প্রযুক্তির সহজলভ্য, সামাজিক অবক্ষয়, রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, বিচারে দীর্ঘসূত্রতাসহ নানা কারণে একশ্রেণির মানুষের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা, হিংস্রতা ও নৃশংসতা বাড়ছে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ব্যাপক হারে দৃষ্টান্তমূলক ফাঁসির রায়ও হচ্ছে অধস্তন আদালতে। তারপরও মামলাজট, বিচারক ও বেঞ্চ স্বল্পতা, পেপারবুক (অধস্তন আদালতে মামলার রায়সহ যাবতীয় নথির অনুলিপি) প্রস্তুতে বিলম্বের কারণে হাইকোর্টে ফাঁসির মামলার শুনানি ও নিষ্পত্তিতে প্রত্যাশিত গতি নেই। মামলার এত চাপ যে, হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্সের মামলায় কমপক্ষে পাঁচ বছর বা তার বেশি সময় লাগে শুনানি শুরু করতে। আর আপিল বিভাগে মামলা শেষ হতে ১০ বছর বা তার বেশি সময় লাগে। সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা জানান, হাইকোর্টে বর্তমানে ২০১৮ ও ২০১৯ সালে মৃত্যুদ-প্রাপ্ত আসামিদের মামলার শুনানি চলছে।  

ফাঁসির আসামির মামলার আইনি প্রক্রিয়া : ফৌজদারি আইনের বিধান মতে, অধস্তন আদালতে কোনো আসামির মৃত্যুদ-ের রায় হলে তা কার্যকরে হাইকোর্ট বিভাগের শুনানি ও অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। এজন্য মৃত্যুদ-ের রায়ের পর লাল সালুতে মোড়া রায়সহ যাবতীয় নথি পাঠানো হয় হাইকোর্টে। দ-প্রাপ্ত আসামি আইনজীবীর মাধ্যমে আপিল করার সামর্থ্য না রাখলে জেল আপিলের (কারা কর্তৃপক্ষের আপিলের উদ্যোগ) সুযোগ পান। পেপারবুক প্রস্তুত করা সাপেক্ষে ডেথ রেফারেন্স মামলা শুনানির পর্যায়ে আসে। হাইকোর্টে শুনানির পর সাজা বহাল থাকলে আসামি আপিল বিভাগে আপিল বা জেল আপিল করতে পারেন। আপিল বিভাগে সাজা বহাল থাকলে আসামি রিভিউয়ের (রায় পুনর্বিবেচনা) সুযোগও পান। রিভিউ খারিজ হলে সর্বশেষ সুযোগ হিসেবে রাষ্ট্রপতির কাছে দোষ স্বীকার করে প্রাণভিক্ষার আবেদন করতে পারেন। সেটি নাকচ হলে কারাবিধি অনুযায়ী ফাঁসি কার্যকর করা যায়। 

কারা অধিদপ্তরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের অনুরোধ জানিয়ে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রতি মাসেই অনেক ফাঁসির আসামিকে সেলে পাঠানো হয়। এসব আসামির প্রতি অন্যান্য বন্দির চেয়ে বেশি নজর রাখতে হয়। বিচারের দীর্ঘসূত্রতায় অনেক আসামি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। একজন আসামির মামলার নিষ্পত্তি মানে আমাদের চাপ কিছু কমে যাওয়া; না হলে আমাদের কিছু করার নেই।’

ডেথ রেফারেন্স বাড়ছেই : সুপ্রিম কোর্টের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে বিচারাধীন ৯৬২ ডেথ রেফারেন্স মামলার মধ্যে নিষ্পত্তি হয় ৮৮টি। ২০২২ সালে বিচারাধীন ১ হাজার ৬৮ মামলার মধ্যে নিষ্পত্তি হয় ১৫৮টি। ২০২৩ সালে বিচারাধীন ১ হাজার ১২৪ মামলার মধ্যে নিষ্পত্তি হয় ১০৩টি। ২০২৪ সালে ১ হাজার ২১২ মামলার মধ্যে নিষ্পত্তি হয় ৫৮টি। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২৯টি ডেথ রেফারেন্স মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে হাইকোর্টে। এ সময় পর্যন্ত ১ হাজার ২৪৫টি ডেথ রেফারেন্স মামলা বিচারাধীন ছিল, যা হাইকোর্টে এ যাবৎকালের মধ্যে সর্বোচ্চ।

মামলা পরিচালনায় ডেথ রেফারেন্স বেঞ্চ অপ্রতুল কি না এমন প্রশ্নে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী সম্প্রতি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হাইকোর্টের বেঞ্চ নির্ধারণের এখতিয়ার শুধু প্রধান বিচারপতির। বেঞ্চ বাড়ানো-কমানোর সিদ্ধান্তও প্রধান বিচারপতি দেন। এ বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো তথ্য নেই।’