দেড় দশকে দেশের বিদ্যুৎ খাতে পরিকল্পিত ও ভয়াবহ আর্থিক বিপর্যয় নেমে এসেছে। প্রতিযোগিতাহীন ও অস্বচ্ছ চুক্তির মাধ্যমে এই খাতে লুটপাটের এক বিশাল ক্ষেত্র তৈরি করা হয়েছে। শুধু ভারতের আদানি পাওয়ারের সঙ্গে অসম চুক্তিতে বছরে ক্ষতি প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। দেশের বেসরকারি খাতের অন্যান্য বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণেও বিপুল আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। এতে প্রতিবছর লোকসান বেড়ে দাঁড়িয়েছে অন্তত ৪৫ হাজার কোটি টাকা।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০-এর অধীনে সম্পাদিত চুক্তিগুলো পর্যালোচনা জাতীয় কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। কমিটি গত ২০ জানুয়ারি মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়। গতকাল রবিবার ঢাকার বিদ্যুৎ ভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনের মূল বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়।
২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর গঠিত অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে কমিটিতে ছিলেন বুয়েটের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগের অধ্যাপক আবদুল হাসিব চৌধুরী, কেপিএমজি বাংলাদেশের সাবেক সিওও আলী আশরাফ, বিশ্বব্যাংকের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন এবং ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের ফ্যাকাল্টি অব ল অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্সের অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খান।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ২০০৯ সালে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) বার্ষিক লোকসান ছিল মাত্র ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এই লোকসান অবিশ্বাস্যভাবে বেড়ে এখন ৪৫ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। বিগত সরকারের আমলে বিশেষ বিধানের আওতায় যেসব চুক্তি করা হয়, তাতে জাতীয় স্বার্থের চেয়ে কিছু গোষ্ঠীর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
পর্যালোচনা কমিটির মতে, জাতীয় স্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে একটি বিশেষ স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর লাভ নিশ্চিত করাই ছিল এসব চুক্তির মূল লক্ষ্য। বর্তমান এই সংকট থেকে বের হতে হলে পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম অন্তত ৮৬ শতাংশ বাড়ানো প্রয়োজন।
আদানির সঙ্গে বিতর্কিত চুক্তি : ভারতের আদানি পাওয়ারের সঙ্গে সই হওয়া ২৫ বছর মেয়াদি চুক্তিটি বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের দুর্নীতির সবচেয়ে বড় প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত করেছে কমিটি। এই চুক্তির মাধ্যমে প্রতিবছর বাংলাদেশ প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার বা ১২ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করছে।
পর্যালোচনা কমিটির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ভারত থেকে আমদানি করা অন্যান্য বিদ্যুতের চেয়ে আদানির বিদ্যুতের দাম প্রায় দ্বিগুণ। ভারতের গ্রিড থেকে যেখানে ৪ দশমিক ৪৬ সেন্টে বিদ্যুৎ পাওয়া যেত, সেখানে আদানিকে শুরুতে ৮ দশমিক ৬১ সেন্ট এবং পরে ১৪ দশমিক ৮৭ সেন্ট পর্যন্ত পরিশোধ করতে হয়েছে।
কমিটির দাবি, এই চুক্তিতে বিদ্যুতের দাম স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি ধরা হয়েছে, যার ফলে ২৫ বছরে বাংলাদেশের অতিরিক্ত লোকসান হবে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার বা ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা।
প্রতিবেদনে বলা হয়, আদানির বিদ্যুৎ প্রকল্পের স্থান নির্ধারণ এবং কয়লা আমদানির প্রক্রিয়াটিও ছিল চরম রহস্যজনক ও যুক্তিহীন। প্রকল্পটি ভারতের ঝাড়খ- রাজ্যের গোড্ডায় স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে স্থানীয় কয়লা ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও তা করা হয়নি। ভারতের আইন অনুযায়ী স্থানীয় কয়লা উৎপাদিত বিদ্যুৎ রপ্তানি করা যায় না জেনেও সেখানে কেন্দ্রটি করা হয়। এর ফলে অস্ট্রেলিয়া থেকে জাহাজযোগে কয়লা আমদানি করে, তা আবার ভারতীয় রেলপথে শত শত কিলোমিটার পরিবহন করে গোড্ডায় নিতে হচ্ছে। এই দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল প্রক্রিয়ার পুরো খরচই বহন করছে বাংলাদেশ। এ ছাড়া ভারতের অভ্যন্তরীণ বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের খরচ এবং আদানির ওপর ধার্য করা ভারতীয় করও বাংলাদেশকে পরিশোধ করতে হচ্ছে।
আদানির দাম অনুমোদন করা হয় এস আলমের এসএস পাওয়ার প্ল্যান্টের সঙ্গে তুলনা করে। অথচ ওই কেন্দ্রটির চুক্তিও প্রশ্নবিদ্ধ। চুক্তি অনুযায়ী, ভারতের অভ্যন্তরীণ যেকোনো রাজনৈতিক কারণে আদানির কোনো ক্ষতি হলে, সে দায়ও বাংলাদেশ সরকারকে বহন করতে হবে।
কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের কর্মকর্তা বা রাজনীতিবিদ এমন অসম চুক্তিতে সই করতে পারেন না বলে পর্যালোচনা কমিটি মন্তব্য করেছে।
এ বিষয়ে আদানি পাওয়ার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘পর্যালোচনা কমিটির প্রতিবেদন বিষয়ে আমাদের সঙ্গে এখনো কোনো ধরনের যোগাযোগ করা হয়নি এবং প্রতিবেদনটি আমাদের কাছে সরবরাহও করা হয়নি। ফলে প্রতিবেদনটি সম্পর্কে নির্দিষ্ট কোনো মন্তব্য করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। এ বিষয়ে কখনো বাংলাদেশের কোনো কর্তৃপক্ষ আমাদের কাছ থেকে কোনো ধরনের মতামত বা তথ্য জানতে যোগাযোগ করেনি।’
এতে বলা হয়, আদানি পাওয়ার বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার এবং দেশের বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১০ শতাংশ পূরণ করছে। নিরবচ্ছিন্ন, উচ্চমানের এবং তুলনামূলকভাবে প্রতিযোগিতামূলক বাজার দামে (আমদানি করা সমজাতীয় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মধ্যে) বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে আদানি। বিপুল অঙ্কের বকেয়া থাকা সত্ত্বেও বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রতিশ্রুতি অব্যাহত রাখা হয়েছে, যখন অন্য অনেক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়েছে কিংবা বন্ধ করে দিয়েছে।
বকেয়া অর্থ পরিশোধে বিলম্বের কারণে কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে উল্লেখ করে আদানি তাদের পাওনা দ্রুত পরিশোধের জন্য বাংলাদেশ সরকারের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে।
দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট ও শক্ত প্রমাণ : কমিটি জানিয়েছে, আদানির সঙ্গে চুক্তির পেছনে দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট বা ‘কংক্রিট’ প্রমাণ পাওয়া গেছে। হুইসেল ব্লোয়ারদের মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের নির্দিষ্ট তারিখ, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের নথিপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে।
কমিটির অনুসন্ধানে দেখা গেছে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কার্যালয় থেকে সরাসরি নির্দেশে এসব চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে। শেখ হাসিনা এবং তৎকালীন জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের সরাসরি সংশ্লিষ্টতার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। যদিও প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টের তথ্য পাওয়া যায়নি, তবে চুক্তির সঙ্গে জড়িত অনেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার অ্যাকাউন্টে কয়েক মিলিয়ন ডলারের লেনদেনের তথ্য মিলেছে। আন্তর্জাতিক মানদ- অনুযায়ী এই তথ্যগুলোর মাধ্যমে আইনি লড়াইয়ে জেতার জন্য যথেষ্ট বলে কমিটি মনে করছে।
অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খান বলেন, ‘কমিটি মনে করে, আদানির চুক্তিতে সাংঘাতিক অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য পাওয়া গেছে। ওই তথ্যের কথা আদানিকে জানিয়ে দিয়ে তাদের উত্তর চাওয়া উচিত। এরপর দ্রুত সময়ের মধ্যে সিঙ্গাপুরে চুক্তি-সংক্রান্ত সালিশি মামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার। বিলম্ব করলে আমাদের মামলা আইনি কারণে দুর্বল হয়ে যাবে। প্রাথমিকভাবে লন্ডনের বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এত ভালো তথ্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ের দুর্নীতি মামলায় বিরল।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, চুক্তির সঙ্গে জড়িত ছিলেন এমন সাত-আটজনের অবৈধ লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। এতে প্রায় কয়েক মিলিয়ন ডলারের লেনদেন হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ট্রাভেল ডকুমেন্টসহ অনেক তথ্য-প্রমাণ দুর্নীতি দমন কমিশনকে দেওয়া হয়েছে। দুদক তারা ইতিমধ্যেই কাজ শুরু করেছে। তারা প্রমাণ পেলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
কমিটির প্রধান মঈনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘বল এখন বিদ্যুৎ বিভাগের কোর্টে। মামলার বিষয়ে তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তবে যেহেতু অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে সময় নেই। আমরা চাইব পরবর্তী সরকার যেন এ বিষয়ে উদ্যোগী হয়।’
ক্যাপাসিটি পেমেন্ট ও সিস্টেম লস : গত ১৪ বছরে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা চার গুণ বাড়লেও বেসরকারি খাতের বিদ্যুৎ উৎপাদক বা আইপিপিদের বিল বেড়েছে ১১ গুণ । এর মধ্যে ক্যাপাসিটি পেমেন্ট বা বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রেখে টাকা দেওয়ার হার বেড়েছে ২০ গুণ। বর্তমানে জাতীয় গ্রিডের প্রায় ৭ হাজার ৭০০ থেকে ৯ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সম্পূর্ণ অব্যবহৃত বা ব্যবহারযোগ্য নয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জ্বালানি সংকট বা অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে এই সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এই ‘অব্যবহৃত’ সক্ষমতার জন্য পিডিবিকে বছরে শূন্য দশমিক ৯ থেকে ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার দ- দিতে হচ্ছে। অর্থাৎ বিদ্যুৎ উৎপাদন হোক বা না হোক, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী এই বিশাল অঙ্কের অর্থ সরকার নির্দিষ্ট কিছু কোম্পানিকে দিয়ে যাচ্ছে।
অন্যান্য বিতর্কিত প্রকল্প ও গোষ্ঠীস্বার্থ : শুধু আদানি নয়, সামিট, এসএস পাওয়ার এবং রিলায়েন্সের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোও এই লুটপাটে অংশীদার ছিল পর্যালোচনা কমিটির তদন্তে উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সামিট মেঘনাঘাট প্রকল্পে গ্যাসের স্বল্পতা জানা সত্ত্বেও বড় বড় কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে, যার ইউনিট খরচ অন্যান্য কেন্দ্রের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। এসএস পাওয়ার (বাঁশখালী) কেন্দ্রটি সমমানের কয়লাভিত্তিক প্রকল্পের মধ্যে সবচেয়ে ব্যয়বহুল। এ ছাড়া রিলায়েন্সের ক্ষেত্রে ভারতের একটি অচল বা পরিত্যক্ত বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশে নিয়ে আসার প্রক্রিয়াটিও ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। এই চুক্তিগুলো প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের পরিবর্তে বিশেষ বিধান আইনের অধীনে ‘নেগোসিয়েশন’-এর মাধ্যমে করা হয়েছিল।
ভবিষ্যৎ পথচিত্র : বিদ্যুৎ খাতের এই রক্তক্ষরণ বন্ধে কমিটি বেশ কিছু কঠোর পদক্ষেপের সুপারিশ করেছে। প্রথমত, যেসব চুক্তিতে দুর্নীতির প্রমাণ মিলবে, সেগুলো অবিলম্বে বাতিল করার প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, উচ্চব্যয়ী ও অসম বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তিগুলো আবার আলোচনার মাধ্যমে সংশোধন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ব্যবহারের তুলনায় অতিরিক্ত ক্যাপাসিটি পেমেন্ট এবং বৈদেশিক মুদ্রার হারের সঙ্গে সমন্বয় করা চুক্তিগুলো অগ্রাধিকার দেওয়ার সুপারিশ করেছে কমিটি। এ ছাড়া ভবিষ্যতে যেকোনো বিদ্যুৎ প্রকল্পের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রকে বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একটি স্বাধীন জ্বালানি তদন্ত প্রতিষ্ঠান গঠনের মাধ্যমে এই খাতের দীর্ঘমেয়াদি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার কথাও বলেছে তদন্ত কমিটি।
জনমত তৈরির আহ্বান : আদানির মতো বড় ও অসম চুক্তিগুলো চ্যালেঞ্জ করলে বা বাতিল করলে সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিতে পারে। শুধু আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দিলে দেশে বড় ধরনের লোডশেডিং হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পর্যালোচনা কমিটি এ বিষয়ে জনমত তৈরির ওপর জোর দিয়েছে।
কমিটির মতে, দীর্ঘমেয়াদি সুফল পেতে এবং ২৫ বছরের জন্য এই ‘অভিশপ্ত’ চুক্তিগুলো থেকে মুক্তি পেতে হলে জনগণকে সাময়িক কষ্ট সহ্য করার মানসিক প্রস্তুতি নিতে হবে। নতুবা উচ্চমূল্যের বিদ্যুতের চাপে দেশের শিল্পায়ন ও সামগ্রিক অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
কমিটির সদস্য বলছেন, বিদ্যুৎ খাতের এই সংকট শুধু কারিগরি নয়, বরং এটি একটি গভীর রাজনৈতিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের ফল। পিডিবি আজ একটি কার্যকর ক্রেতা হওয়ার বদলে শুধু অর্থ পরিশোধের মধ্যস্থতাকারীতে পরিণত হয়েছে। কমিটির সুপারিশ করা সংস্কারগুলো বাস্তবায়িত না হলে দেশের সাধারণ মানুষ এবং শিল্পোদ্যোক্তারা দীর্ঘকাল এই লুটপাটের বোঝা বয়ে বেড়াতে বাধ্য হবে। পরবর্তী সরকারের জন্য এই প্রতিবেদনটি একটি দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
দেউলিয়ার পথে পিডিবি : ২০১৫ সালে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) বছরে লোকসান ছিল প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি; ২০২৫ সালে তা বেড়ে ৫০ হাজার কোটি ছাড়িয়েছে।
প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ১২ টাকা ৩৫ পয়সা দরে কিনে পিডিবি তা বিক্রি করে ৬ টাকা ৬৩ পয়সায়। এতে প্রতিষ্ঠানটির বিপুল লোকসান গুনতে হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, লোকসান ঠেকাতে গেলে বিদ্যুতের পাইকারি দাম ৮৬ শতাংশ বাড়াতে হবে। আর ৮৬ শতাংশ দাম বাড়ালে ভারত-চীন-ভিয়েতনাম ও শ্রীলঙ্কার চেয়ে বেশি হয়ে যাবে। ওইসব দেশের শিল্পের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না বাংলাদেশের শিল্প।
অস্বাভাবিক দামে বিদ্যুৎ কেনা : পর্যালোচনা কমিটির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ফার্নেস তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোয় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনা হচ্ছে। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুতে ৪৫ শতাংশ এবং সৌরবিদ্যুৎ কেনা হচ্ছে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ বেশি দামে।
গ্যাসভিত্তিক পুরনো বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় নতুন গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যয় বেশি হচ্ছে। বিশেষ করে, মেঘনাঘাট এলাকায় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোয় বেশি ব্যয় হচ্ছে কিন্তু ব্যবহার হচ্ছে কম।