দেশের শিল্পাঞ্চলে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে টানা চার দিনের ছুটির প্রস্তাব উৎপাদন এবং রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন শিল্পমালিকরা। এ জন্য শুধু ভোটের দিন সাধারণ ছুটি ঘোষণা অথবা ১০ ও ১১ ফেব্রুয়ারি ছুটি সাপ্তাহিক বা বার্ষিক ছুটির সঙ্গে সমন্বয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন তারা। আর শ্রমিক নেতারা বলছেন, সরকার শুধু মালিকদের সুবিধা দেখলে হবে না, শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকারের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। শ্রম আইন বিশেষজ্ঞ ও শ্রমিক নেতারা বলছেন, সরকারের ঘোষিত সাধারণ ছুটি সব খাত ও অঞ্চলের শ্রমিকদের জন্য প্রযোজ্য ও বাধ্যতামূলক। শিল্পাঞ্চলের শ্রমিক কিংবা শিল্পাঞ্চলের বাইরে শ্রমিক সাধারণ ছুটির ক্ষেত্রে এমন কোনো ধারা নেই। এই পরিস্থিতিতে আগামী ২৯ জানুয়ারি সরকার, শ্রমিক ও মালিক প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদ (টিসিসি) সভা হওয়ার কথা রয়েছে।
গত রবিবার আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে আগামী ১১ ও ১২ ফেব্রুয়ারি দুই দিন নির্বাহী আদেশে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরকারি ছুটি ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি শিল্পাঞ্চলের শ্রমিক ও কর্মচারীদের জন্য আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি বিশেষ ছুটি দেওয়া হয়েছে। ফলে শিল্পাঞ্চলে টানা তিন দিন ছুটি নির্বাচনী ছুটি থাকছে।
বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের (বিইএফ) সভাপতি ফজলে শামীম এহসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকারের সাধারণ ছুটির আওতায় তৈরি পোশাকশিল্প পড়ে না। অর্থাৎ আইনে শিল্পাঞ্চলের কথা বলা হয়েছে। তেজগাঁও, সাভার, নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকদের জন্য এ ছুটি কার্যকর হবে। এখন আমাদের বিষয়ে অনেকে অপপ্রচার করছেন, আমরা শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা করছি না। এটা সঠিক নয়। এর সমাধানে আমরা মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছি। আগামী ২৯ জানুয়ারি টিসিসি সভা (সরকার, শ্রমিক ও মালিক প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদ) হবে। সেখানে বিষয়টি চূড়ান্ত হবে। তবে, আমরা শ্রমিকদের ছুটির জন্য আগ্রহী। কারণ শ্রমিকদের কারখানায় আটকিয়ে রাখার কোনো ইচ্ছা আমাদের নেই। আমরা চাই, যে সময় ছুটি থাকবে, পরবর্তী সময়ে বা ছুটির আগে সমন্বয় করে নিতে। আমাদের শ্রমিক ভাই-বোনরা জাতীয় নির্বাচনে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করুক, এটা তাদের অধিকার।
সাধারণ ছুটি বাতিল বা সমন্বয়ের বিষয়ে শ্রম আইন বিশেষজ্ঞ মো. সেলিম আহসান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকার যখন প্রজ্ঞাপন দিয়ে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে সব খাতের জন্য তা বাধ্যতামূলক ও শ্রমিকদের এই ছুটি পাওয়ার অধিকার।
ছুটির সমন্বয়ের দাবি জানিয়ে শ্রম ও কর্মসংস্থান সচিবের কাছে পৃথক চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) ও বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল বিনিয়োগকারী সমিতি (বিইপিজিআইএ)। বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের দিন সাধারণ ছুটি এবং ১৩ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটি রয়েছে। এর আগে ১০ ও ১১ ফেব্রুয়ারিও সাধারণ ছুটি ঘোষণা করায় দীর্ঘ ছুটির মুখে পড়বে শিল্প খাত।
চিঠিতে বিকেএমইএ সভাপতি উল্লেখ করেন, রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্পে উৎপাদন ও শিপমেন্টের সময়সীমা রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। নির্বাচনের স্বার্থে ১০ ও ১১ ফেব্রুয়ারি সরকার ছুটি প্রদান করলেও শ্রম আইনের ১০৪ ধারা অনুযায়ী, ওই দুই দিনের কর্মঘণ্টা পরে সাপ্তাহিক ছুটির দিন বা অন্যকোনো সময়ে সমন্বয় করার সুযোগ থাকা প্রয়োজন। শ্রম আইনের ১০৩ ধারার বিধান হতে অব্যাহতি প্রদান করে ১০৪ ধারা অনুযায়ী ওই দুই দিনের ছুটি পরে সাপ্তাহিক ছুটির সঙ্গে সমন্বয় করা যেতে পারে।
একই কথা জানিয়েছেন বিইপিজিআইএ। সংগঠনটি বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেপজা) নির্বাহী চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে বলেছে, ইপিজেডভুক্ত কারখানাগুলো আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ উৎপাদন ও শিপমেন্ট সূচি অনুযায়ী পরিচালিত হয়। যা আগেই চূড়ান্ত করা থাকে। হঠাৎ করে দুই দিনের অতিরিক্ত ছুটি উৎপাদন সূচিতে বড় ধরনের বিঘœ সৃষ্টি করবে। এতে সময়মতো রপ্তানি চালান পাঠানো কঠিন হয়ে পড়বে। ফলে ক্রেতাদের জরিমানা, অর্ডার বাতিল ও বাংলাদেশের প্রতি ক্রেতাদের আস্থা ক্ষুণœ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশের সামগ্রিক রপ্তানি আয় ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ওপর।
এতে আরও বলা হয়, এমন পরিস্থিতিতে পোশাকশিল্প মালিক ও ইপিজেড বিনিয়োগকারীরা শিল্পাঞ্চলের জন্য তিন দিনের পরিবর্তে শুধু ভোটের দিন ১২ ফেব্রুয়ারি এক দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। বিকল্প হিসেবে, ১০ ও ১১ ফেব্রুয়ারির ছুটি যদি অনিবার্য হয়, তাহলে তা সাপ্তাহিক বা বার্ষিক ছুটির সঙ্গে সমন্বয়ের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
কারখানা মালিকরা বলছেন, ফেব্রুয়ারিতে শবে বরাত, শহীদ দিবস ও সাপ্তাহিক ছুটির কারণে কর্মদিবস এমনিতেই সীমিত। এর মধ্যে আরও তিন দিন সাধারণ ছুটি দেওয়া হলে কর্মদিবস কমে ১৯ দিনে নেমে আসবে। যা রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্পের উৎপাদনকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে শ্রমিকদের বোনাস ও ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন পরিশোধের চাপ সামলানো শিল্পমালিকদের জন্য আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
ছুটি প্রসঙ্গে গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক সত্যজিৎ বিশ্বাস বলেন, মালিকরা ছুটি সমন্বয়ের প্রস্তাব দিয়েছে ঠিকই। কিন্তু সরকার যদি সাধারণ ছুটি বহালও রাখে তারা কোনো কোনো শুক্রবার বা বাড়তি কাজ করিয়ে সমন্বয় করে নেন। সাধারণ ছুটি শ্রমিকদের অধিকার। তাই সরকারকে এই ছুটি বহাল রাখতে হবে। সেই সঙ্গে এই ছুটি যেন সমন্বয়ের নামে শ্রমিকদের শোষণ না করে সেদিকে তদারকি করতে হবে।
মালিক ও শ্রমিক পক্ষের পাল্টাপাল্টি দাবির বিষয়ে বেপজার নির্বাহী পরিচালক (জনসংযোগ) আবু সাঈদ মো. আনোয়ার পারভেজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ছুটি সমন্বয়, বাতিলের বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। আরও দুই সপ্তাহ সময় আছে। কয়েক দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা, মন্ত্রণালয়, স্টেকহোল্ডার অ্যাসোসিয়েশন এবং ইপিজেডের ভেতর-বাইরে থাকা কারখানাগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নেবে।