নারী কর্মীদের ওপর হামলায় বেকায়দায় জামায়াত

নারী কর্মীদের ওপর হামলা ও হুমকির ঘটনায় বেকায়দায় পড়েছে জামায়াতে ইসলামী। নারীদের বাড়ি বাড়ি পাঠিয়ে ভোটের মাঠে ভালো অবস্থান তৈরির চেষ্টা করছে দলটি। কিন্তু এর মধ্যে হিজাব খুলে নেওয়াসহ নানা হুমকি-ধমকি ও হামলার মুখোমুখি হন দলটির নারী কর্মীরা। এতে নড়েচড়ে বসেছেন দলের আমিরসহ কেন্দ্রীয় নেতারা। নারী কর্মীদের ওপর হামলায় কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েও কোনো কাজ হচ্ছে না। বরং এ নিয়ে প্রশাসনের অসহযোগিতার অভিযোগই সামনে আসছে বারবার।

এ সব ঘটনা জাতির সামনে তুলে ধরে জোরালো প্রতিবাদ জানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন জামায়াত নেতারা। বিভিন্ন সমাবেশে নারীদের ওপর হামলাকারীদের বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। এ সব ঘটনার প্রতিবাদে প্রথমবারের মতো ঢাকায় নারীদের নিয়ে সমাবেশের ঘোষণা দিয়েছে জামায়াত। এর আগে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে নারী সমাবেশ করলেও এবারই প্রথম রাজধানীতে সমাবেশের ঘোষণা দিল দলটি। আগামী ৩১ জানুয়ারি রাজধানীতে স্মরণকালের বৃহত্তম নারী সমাবেশ করতে যাচ্ছে জামায়াত।

এখনো সমাবেশের স্থানের অনুমতি মেলেনি। দলটির নেতারা বলছেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ুঅনুমতি পাওয়া যায়নি। জামায়াতের বিকল্প প্রস্তাব মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতেও নিরাপত্তাজনিত কারণে সমাবেশের অনুমতি না পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। সেক্ষেত্রে মতিঝিলের একটি স্কুল মাঠ অথবা বিকল্প কোনো স্থানে সমাবেশ করতে পারে দলটি। নেতাদের ভাষ্য, সমাবেশের স্থান ঠিক করার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন তারা।

এখনো সমাবেশের সিডিউল ঠিক করা না হলেও জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকতে পারেন বলে জানিয়েছে দলীয় একটি সূত্র। নির্বাচনকে সামনে রেখে এরই মধ্যে জামায়াত আমিরের সারা দেশে নির্বাচনী সফরসূচি চূড়ান্ত করা হয়েছে। সূচি অনুযায়ী ওইদিন (৩১ জানুয়ারি) দুপুর পর্যন্ত তিনি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম, নিমসার ও দাউদকান্দিতে জনসভায় ভাষণ দেবেন। বিকেলে ঢাকা-১১ এবং সন্ধ্যায় ঢাকা-১০ আসনে সমাবেশ করার কথা রয়েছে।

গতকাল বুধবার রাজধানীর মিরপুরের মনিপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে নারী সমাবেশ করেছে জামায়াতে ইসলামী। সেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানের স্ত্রী ও সাবেক সংসদ সদস্য ডা. আমেনা বেগম।

জামায়াত নেতারা জানিয়েছেন, ৩১ জানুয়ারির নারী সমাবেশে সারা দেশে থেকে সর্বোচ্চসংখ্যক নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে কাজ করছেন দলটির নেতাকর্মীরা। তাছাড়া নারী অধিকার কর্মী ও বিভিন্ন শ্রেণি পেশার নারীদের এক মঞ্চে নিয়ে প্রতিবাদ করার পরিকল্পনা করছে দলটি। এতে নারীদের ওপর সহিংস আচরণের প্রতিবাদের পাশাপাশি তাদের রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিতের পক্ষে জোরালো অবস্থান প্রকাশ করা হবে।

তারা বলছেন, কিছু রাজনৈতিক নেতা ও নেত্রী প্রকাশ্যে নারীদের বিরুদ্ধে ঘৃণামূলক বক্তব্য দিচ্ছেন। যেমনÑ ‘অমুক সংগঠনের মেয়েরা বাসায় গেলে ধরিয়ে দিন’। কেউ আবার প্রকাশ্যে নারীদের কাপড় খুলে নেওয়ার মতো হুমকিও দিচ্ছে। এর মাধ্যমে নারীদের ভয় দেখানো হচ্ছে, তারা যাতে ভোট দিতে না যায়। তারা যাতে নির্বাচনী কাজে অংশ না নেয়।

জামায়াত নেতাদের অভিযোগ, লালমনিরহাটে জামায়াতের নারী কর্মীদের হিজাব নিয়ে টানাহেঁচড়া করে এবং হিজাব খুলে নেয় বিএনপি কর্মীরা। তাছাড়া ঢাকা, যশোর, চুয়াডাঙ্গা, কুমিল্লা, টাঙ্গাইল, মেহেরপুর, কেরানীগঞ্জ, ভোলার লালমোহন ও চরফ্যাশনে নারী কর্মীদের ওপর পৃথক হামলার ঘটনা ঘটে। এতে অনেকেই শারীরিক লাঞ্ছনার শিকার এবং আহত হন।

নির্বাচন কমিশনার আব্দুল রহমানেল মাছউদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্বাচনকেন্দ্রিক হামলার কোনো অভিযোগ এলে আমরা তদন্ত করি। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেই। গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলে ইসি নিজ উদ্যোগে ব্যবস্থা নেয়। এখনো অনেক অভিযোগ আসছে সেগুলো যাচাই-বাছাই চলছে।’

নারী অধিকার কর্মী প্রকৌশলী মারদিয়া মমতাজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সারা দেশে নারী কর্মীদের ওপর যে হামলা হচ্ছে, এর বেশ কয়েকটি ধরন আছে। এসব হামলা গোপনে করা হচ্ছে না। কোনো ছোটখাটো নেতাকর্মী পর্যায় থেকে করা হচ্ছে না। অ্যাডভোকেট পাপিয়া প্রকাশ্যেই ঘোষণা দিয়েছেন যে, জামায়াতের মহিলা কর্মী দেখলে ট্রিপল নাইনে কল দিতে। মঙ্গলবারও চুয়াডাঙ্গায় বিএনপির একজন প্রার্থী প্রকাশ্যেই নারীদের কাপড় খুলে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।’

তিনি বলেন, ‘হামলাগুলো অনেক দলের লোকজন করছে না। শুধু একটি দলের পক্ষ থেকেই হামলা করা হচ্ছে। হামলার লক্ষ্যবস্তু শুধু নারীই না, পুরুষরাও আক্রান্ত হচ্ছেন। দুই দিনের ব্যবধানে এনসিপির নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং আরিফুল ইসলাম আদীবের ওপর হামলা করা হয়েছে। এগুলো যেমন নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন তেমন ফৌজদারি অপরাধও। কিন্তু এরপরও প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।’

নারীদের ওপর হামলার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, ‘কিছু লোক আমাদের মায়েদের ইজ্জতে হাত দিয়েছে। তাদের বলব, মায়েদের ইজ্জত দিতে শিখুন। মনে রাখবেন, আমাদের ইজ্জতের চেয়েও আমাদের মায়েদের ইজ্জতের মূল্য বেশি। কোথাও মায়েদের ইজ্জতের হানি হলে সঙ্গে সঙ্গে ছুটে যাবেন। একজন মায়ের গায়ে হাত দেওয়া, পুরো জাতির মায়ের ওপর আঘাত, যা আমরা কোনোভাবেই বরদাশত করব না। যারা এখনই মা-বোনদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ, তাদের হাতে বাংলাদশেরে কোনো নারীই নিরাপদ নয়।’

গতকাল ঢাকা-৪ আসনের কদমতলীতে জনসংযোগকালে জামায়াতের নারী কর্মীর ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে। হামলাকারীরা জামায়াতের রুকন ও নারীনেত্রী কাজী মারিয়া ইসলাম বেবির মাথায় রামদা দিয়ে কোপ দিলে তিনি গুরুতর আহত হন বলে দাবি করেছে জামায়াত। তাদের দাবি, বেবির মাথায় ৪টি সেলাই পড়ে। তাছাড়া ঢাকা-৪ আসনের বিএনপির প্রার্থী তানভীর আহমেদ রবিনের চাচাতো ভাই ও স্থানীয় যুবদল নেতা রমজানের নেতৃত্বে জামায়াতের মহিলা কর্মীদের পথরোধ করে গণসংযোগে বাধা দেওয়া এবং  অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয় বলেও অভিযোগ করেছে দলটি।

জামায়াত বলছে, দলটির নারীরা যাতে নির্বাচনী কাজ না করতে পারে, সে জন্য হুমকি দিয়েছেন বিএনপি নেত্রী অ্যাডভোকেট সৈয়দা আশিফা আশরাফি পাপিয়া। সম্প্রতি পাপিয়া বলেন, ‘মা-বোনদের উদ্দেশে বলছি, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের আগে জামায়াতে ইসলামের ছাত্রী সংস্থার কর্মীরা কেউ বাসায় গেলে ৯৯৯-এ কল দিয়ে ধরিয়ে দেবেন, যাতে বয়ান দেওয়ার আর সুযোগ না পায়।’