হজরত উক্কাশা ইবনে মিহসান (রা.) ছিলেন ইসলামের সূচনালগ্নের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তার উপনাম আবু মিহসান। পিতা মিহসান ইবনে হুরসান। জাহেলিয়াতের যুগে তিনি কোরাইশের বনি আবদে শামস গোত্রের সঙ্গে মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ ছিলেন। নবুয়তের আলো ছড়িয়ে পড়ার প্রারম্ভেই মহান আল্লাহ তাকে ইমানের সৌভাগ্যে ভূষিত করেন। হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আহ্বানে সাড়া দিয়ে তিনি মক্কায় ইসলামের পথে অবিচল থাকেন এবং পরে অন্যান্য সাহাবির সঙ্গে সবকিছু ত্যাগ করে মদিনায় হিজরত করেন।
বদর যুদ্ধে বীরত্ব : বদর যুদ্ধে হজরত উক্কাশা (রা.) তার অতুলনীয় সাহস ও দৃঢ়তার পরিচয় দেন। যুদ্ধের একপর্যায়ে তার তরবারিটি ভেঙে গেলে তিনি নিরস্ত্র হয়ে পড়েন। এ সময় হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে একটি শুকনো খেজুরের ছড়ি প্রদান করেন। সেই ছড়ি নিয়েই তিনি আবার শত্রুর দিকে ধেয়ে যান এবং যুদ্ধের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এটাই তার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দেওয়া সেই কাঠের লাঠিই উক্কাশার হাতে উজ্জ্বল ও ধারালো লোহার তরবারির মতো হয়ে যায়।
অন্যান্য যুদ্ধে অবদান : বদরের পর ওহুদ, খন্দকসহ ইসলামের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ অভিযানে তিনি অংশগ্রহণ করেন। প্রতিটি যুদ্ধেই তার বীরত্ব, ত্যাগ ও দৃঢ়তা সহযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করেছে। হিজরি সপ্তম সনের রবিউল আউয়াল মাসে বনি আসাদ গোত্রের শক্তি দমন করার দায়িত্ব তার ওপর অর্পিত হয়। মদিনা থেকে ‘গামার’ কূপসংলগ্ন এলাকায় তাদের বসতি ছিল। হজরত উক্কাশা (রা.) মাত্র ৪০ জন সাহাবির একটি দল নিয়ে দ্রুত সেখানে পৌঁছান। কিন্তু তার আগমনের সংবাদ শুনেই শত্রুরা ভয়ে এলাকা ত্যাগ করে পালিয়ে যায়। কাউকে না পেয়ে তিনি তাদের ফেলে যাওয়া প্রায় দুই শত উট ও কিছু ছাগল-ভেড়া নিয়ে মদিনায় প্রত্যাবর্তন করেন।
শাহাদাতের মর্যাদা লাভ : হিজরি ১২ সনে ইসলামের প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) মিথ্যা নবীর দাবিদার তুলাইহা আসাদির বিদ্রোহ দমনের জন্য হজরত খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.)-কে সেনাপতি নিযুক্ত করেন। সেই অভিযানে বাহিনীর অগ্রভাগে ছিলেন উক্কাশা ইবনে মিহসান ও সাবিত ইবনে আরকাম (রা.)। তারা দুজনেই ছিলেন সাহসিকতার প্রতীক। সেনাবাহিনীর সামনে অগ্রসর হওয়ার সময় হঠাৎ শত্রুপক্ষের সঙ্গে তাদের মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটে। তুলাইহা নিজে উক্কাশার ওপর আক্রমণ চালায়, আর তার ভাই সালামা ঝাঁপিয়ে পড়ে সাবিতের ওপর। তুমুল লড়াইয়ে সাবিত (রা.) শাহাদাত বরণ করেন। তুলাইহা গুরুতর আহত হয়ে সালামাকে সাহায্যের জন্য ডাকতে থাকে। সাবিতকে হত্যা করে সালামা এগিয়ে এসে ভাইয়ের সঙ্গে মিলিত হয় এবং দুজনে একযোগে আক্রমণ চালিয়ে উক্কাশা (রা.)-কে শাহাদাতের মহান মর্যাদায় ভূষিত করে।
মুসলিম বাহিনী যখন এই দুই শহীদের দেহের কাছে পৌঁছে, তখন চারদিকে নেমে আসে গভীর শোকের ছায়া। উক্কাশা (রা.)-এর শরীর অসংখ্য আঘাতে ক্ষতবিক্ষত ছিল। সেনাপতি হজরত খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.) ঘোড়া থেকে নেমে বাহিনীকে সাময়িক বিরতির নির্দেশ দেন। পরে সেই রক্তমাখা পোশাকসহ মরুভূমির বালিতে দুই শহীদকে দাফন করা হয়।
জান্নাতের প্রতিশ্রুতি : মর্যাদা, সাহসিকতা ও চারিত্রিক গুণাবলির বিচারে উক্কাশা ইবনে মিহসান (রা.) ছিলেন সাহাবিদের কাতারে এক বিশেষ ও উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব। তার জীবনের আরেকটি স্মরণীয় ঘটনা তাকে চিরকাল মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ে অমর করে রেখেছে।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) একদিন বললেন, আমার উম্মতের মধ্য থেকে ৭০ হাজার লোক হিসাব ছাড়াই জান্নাতে প্রবেশ করবে। তাদের চেহারা পূর্ণিমার চাঁদের ন্যায় উজ্জ্বল থাকবে। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, তখন উক্কাশা (রা.) দাঁড়িয়ে বললেন, ‘আপনি আল্লাহর কাছে দোয়া করুন, তিনি যেন আমাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করে নেন।’ রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘তুমি তাদেরই একজন।’ এরপর আরেক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বলল, ‘হে আল্লাহর নবী! আপনি আল্লাহর কাছে দোয়া করুন, যেন আমাকেও তাদের অন্তর্ভুক্ত করে দেন।’ নবীজি (সা.) বললেন, ‘এই সুযোগ লাভে উক্কাশা তোমার অগ্রগামী হয়ে গেছে।’ (সহিহ বুখারি ৬৫৪২)
হাদিসের বর্ণনায় পাওয়া যায়, সাহাবায়ে কেরামের বিষয়ে হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমার সাহাবিরা নক্ষত্রতুল্য, তাদের যে কাউকে অনুসরণ করলেই তোমরা সুপথ প্রাপ্ত হবে। সাহাবায়ে কেরাম হজরত রাসুল (সা.)-কে সরাসরি দেখেছেন, রাসুল (সা.)-এর শিক্ষাকে তারা নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করেছেন। নবীজি (সা.)-এর জীবনী জানার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের এটাও জানতে হবে যে, সাহাবায়ে কেরাম নবীজি (সা.)-এর শিক্ষাকে কীভাবে নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করেছেন। মহান আল্লাহ আমাদের তা জেনে যথাযথভাবে আমল করার তৌফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ি, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা