শিশুর জন্মের পর থেকে প্রথম পাঁচ বছর তার মানসিক ও শারীরিক বিকাশের প্রধান চালিকাশক্তি হলো খেলাধুলা। সৃজনশীল খেলা শিশুর সামাজিক গুণাবলি ও দলগত সংহতি বৃদ্ধি করে । বিশেষ করে পাজেল, ড্রয়িং বুক বা ক্লে-ডো, শিশুর মেধা ও শারীরিক সক্ষমতাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। শিশুর নানাবিধ সৃজনশীল খেলনা নিয়ে লিখেছেন জান্নাত আক্তার নিপু
শৈশব মানেই আনন্দ আর অবারিত খেলার জগৎ। কিন্তু আধুনিক নগরায়ণ আর প্রযুক্তির আগ্রাসনে শিশুদের সেই স্বাভাবিক খেলার জগৎ সংকুচিত হয়ে আসছে। বর্তমানের শিশুরা স্মার্টফোন বা ট্যাবলেটের স্ক্রিনে যতটা সময় কাটায়, তার অর্ধেক সময়ও সৃজনশীল কোনো কাজে ব্যয় করে না। অথচ মনোবিজ্ঞানীদের মতে, শিশুর জন্মের পর থেকে তার মস্তিষ্ক ও শরীরের যে দ্রুত বৃদ্ধি ঘটে, তার প্রধান চালিকাশক্তি হলো খেলাধুলা। বিশেষ করে সৃজনশীল খেলনা যেমন পাজেল, ড্রয়িং বুক বা ক্লে-ডো, শিশুর মেধা ও শারীরিক সক্ষমতাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।
বর্ণিল পাজেল
ছোট্ট টুকরোয় মস্তিষ্কের বিশাল ব্যায়াম
পাজেল বা ধাঁধা মেলানো কেবল একটি সময় কাটানোর মাধ্যম নয়, শিশুর মস্তিষ্কের জন্য শক্তিশালী জিমনেসিয়াম। যখন শিশু এলোমেলো ছোট টুকরোগুলোকে সাজিয়ে পূর্ণাঙ্গ ছবি কিংবা অবয়ব তৈরি করার চেষ্টা করে, তখন তার মস্তিষ্কে কয়েকটি প্রক্রিয়া একসঙ্গে কাজ করে।
সমস্যা সমাধানের দক্ষতা : প্রতিটি পাজেল একটি ছোট চ্যালেঞ্জ। শিশু যখন দেখে একটি টুকরো মিলছে না, তখন সে বিকল্প চিন্তা করতে শেখে। এই ‘ট্রায়াল অ্যান্ড এরর’ পদ্ধতি তাকে ভবিষ্যতে বড় সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।
দৃষ্টিশক্তির সূক্ষ্মতা : কোন আকৃতির পাশে কোন রঙটি বসবে, তা বুঝতে গিয়ে শিশুর চোখের ও মস্তিষ্কের সমন্বয় বাড়ে।
ধৈর্য ও একাগ্রতা : আজকের অস্থির সময়ে পাজেল শিশুকে দীর্ঘ সময় এক জায়গায় বসে মনোযোগ ধরে রাখতে শেখায়। ছোট ছোট টুকরোর পাজেল মেলানোর পর শিশুর চোখে-মুখে যে তৃপ্তি দেখা যায়, তা তার আত্মবিশ্বাসকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়।
বৈচিত্র্যময় ড্রয়িং বুক
কল্পনার ক্যানভাসে স্বপ্নের প্রতিফলন কাগজ আর পেন্সিল পেলেই শিশুরা আঁকিবুঁকি শুরু করে। অভিভাবকরা অনেক সময় এটিকে সাধারণ কাজ মনে করলেও, ড্রয়িং বুক শিশুর মানসিক বিকাশের বড় সোপান।
আবেগ প্রকাশ : অনেক শিশু তার মনের অব্যক্ত কথা বলতে পারে না। কিন্তু ছবির মাধ্যমে সে তার ভয়, আনন্দ বা বিস্ময় প্রকাশ করে। মনোবিজ্ঞানীরা শিশুদের আঁকা ছবি দেখে তাদের মানসিক অবস্থা বুঝতে পারেন।
রঙের ধারণা ও নান্দনিকতা : ড্রয়িং বুকের পাতায় যখন শিশু নীল আকাশ বা সবুজ ঘাস রঙ করে, তখন সে প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হতে শেখে। রঙের মিশ্রণ নতুন কিছু সৃষ্টি করতে উৎসাহিত করে।
সূক্ষ্ম চালিকাশক্তি : পেনসিল বা রঙতুলি ধরার মাধ্যমে আঙুলের পেশিগুলোর ব্যায়াম হয়। এটি কেবল ছবি আঁকায় নয়, বরং পরবর্তী জীবনে লেখা সুন্দর এবং সূক্ষ্ম কাজ নিখুঁতভাবে করতে সাহায্য করে।
ডো বা ক্লে
ডো বা নরম কাদা মাটি দিয়ে কোনো কিছু তৈরি করা শিশুদের অন্যতম প্রিয় কাজ। এটি তাদের ইন্দ্রিয়গত বিকাশে অসাধারণ ভূমিকা রাখে।
ত্রিমাত্রিক চিন্তাভাবনা : পাজেল বা ড্রয়িং হলো দ্বিমাত্রিক, কিন্তু ডো দিয়ে যখন শিশু একটি গাড়ি বা ফুল তৈরি করে, তখন সে ত্রিমাত্রিক বা ৩ডি বস্তু সম্পর্কে ধারণা পায়। এটি তার জ্যামিতিক জ্ঞান বৃদ্ধিতে সহায়ক।
মানসিক প্রশান্তি : নরম কাদা বা ডো হাতের তালুতে চেপে ধরা বা মোচড়ানো শিশুদের স্ট্রেস কমাতে সাহায্য করে। এটি এক ধরনের ‘থেরাপি’ হিসেবে কাজ করে, যা শিশুকে শান্ত রাখে।
হাতের শক্তি বৃদ্ধি : ডো দিয়ে বিভিন্ন আকৃতি বানাতে গেলে হাতের পেশিতে চাপের প্রয়োজন হয়। এতে শিশুর হাতের শক্তি ও নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি পায়।
শিক্ষামূলক ও অন্যান্য খেলনার প্রভাব
পাজেল, ড্রয়িং বুক এবং ডোর বাইরেও বাজারে অনেক বিজ্ঞানসম্মত খেলনা রয়েছে।
লেগো বা বিল্ডিং ব্লক : খেলনা শিশুদের ইঞ্জিনিয়ারিং মাইন্ডসেট তৈরি করে। একটি স্থাপনা তৈরি করতে গিয়ে শিশু ভারসাম্য এবং স্থাপত্যশৈলী সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পায়।
মিউজিক্যাল খেলনা : সুর ও তালের সঙ্গে পরিচয় শিশুর শ্রবণশক্তি এবং সৃজনশীলতাকে শানিত করে।
অক্ষর ও সংখ্যা কার্ড : খেলার ছলে বর্ণমালা বা গণিত শেখা শিশুদের পড়াশোনার প্রতি ভীতি দূর করে।
শারীরিক বিকাশ ও মোটর স্কিল
মানসিক বিকাশের পাশাপাশি শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও খেলনার ভূমিকা অনস্বীকার্য। বল ছোড়া, সাইকেল চালানো বা স্কিপিং রোপ শিশুর শরীরের হাড় ও পেশি মজবুত করে। খেলাধুলার ফলে শিশুর রক্ত সঞ্চালন বাড়ে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়। যারা ছোটবেলা থেকে শারীরিক খেলাধুলায় অভ্যস্ত, তারা বড় হয়েও চটপটে ও আত্মবিশ্বাসী হয়।
সৃজনশীল খেলনার সবচেয়ে ইতিবাচক দিক
সৃজনশীল খেলা সামাজিক গুণাবলি ও দলগত সংহতি বৃদ্ধি। যখন একদল শিশু একত্রে বসে পাজেল মেলায় বা ড্রয়িং খাতায় রঙ করে, তখন তাদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার মনোভাব তৈরি হয়। পাজেল মেলাতে গিয়ে একজন বন্ধু যখন অন্যজনকে সঠিক টুকরোটি খুঁজে পেতে সাহায্য করে, তখন তাদের মধ্যে সহমর্মিতা ও বন্ধুত্বের ভিত্তি তৈরি হয়। এই যৌথ প্রচেষ্টার মাধ্যমে তারা বুঝতে শেখে যে, বড় কোনো লক্ষ্য অর্জনে মিলেমিশে কাজ করা কতটা জরুরি।
প্রযুক্তির ভিড়ে অভিভাবকের করণীয়
শিশু মনস্তত্ববিদদের মতে, শিশুর হাতে স্মার্টফোন তুলে দেওয়া মানে তার কল্পনাশক্তির মৃত্যু ঘটানো। ভিডিও গেম বা কার্টুন শিশুকে কেবল ‘প্যাসিভ’ দর্শক বানিয়ে রাখে, যেখানে সে নিজে কিছু করার সুযোগ পায় না। বিপরীতে সৃজনশীল খেলনা শিশুকে ‘অ্যাক্টিভ’ অংশগ্রহণকারী বানায়।
অভিভাবকদের উচিত : শিশুকে প্রতিদিন অন্তত এক ঘণ্টা সৃজনশীল খেলনা নিয়ে খেলতে দেওয়া। খেলনা বাছাই করার সময় বয়স এবং রুচির দিকে নজর রাখা। খেলনা কেবল কিনে দিয়ে দায়িত্ব শেষ না করে, শিশুর সঙ্গে বসে পাজেল মেলানো বা ছবি আঁকা। এতে মা-বাবার সঙ্গে শিশুর বন্ধন দৃঢ় হয়।
শিশুর শৈশব হলো গাছের বীজের মতো। এ সময়ে তাকে যেমন পরিবেশ ও উপকরণ দেওয়া হবে, ভবিষ্যতে সে তেমনই এক মহিরুহে পরিণত হবে। পাজেল, ড্রয়িং বুক আর ডো এগুলো কেবল প্লাস্টিক বা কাগজের টুকরো নয়; এগুলো হলো শিশুর মেধা বিকাশের একেকটি সিঁড়ি। তাই আগামী প্রজন্মের মেধা, ধৈর্য এবং শারীরিক সক্ষমতা নিশ্চিতে সৃজনশীল খেলনা হোক প্রতিটি শিশুর নিত্যদিনের সঙ্গী।