দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে ইউসিবির ১০৬ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর ভাই আনিসুজ্জামান চৌধুরী ও ব্যবসায়ী মো. জুনায়েদ সফিকসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে পাঁচটি মামলা করে দুদক। অভিযোগের অনুসন্ধানকালে আসামি আনিসুজ্জামান চৌধুরীর মালিকানাধীন জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ মেডিকেল সার্ভিসেস লিমিটেড ও নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করা হয়। কিন্তু মামলার তদন্ত পর্যায়ে সেই অবরুদ্ধের আদেশ উচ্চ আদালতের মাধ্যমে স্থগিত করিয়ে ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলনের পথে হাঁটছেন আনিসুজ্জামান। বিষয়টি অবহিত করতে ব্যাংক থেকে দুদকের প্রধান কার্যালয়ে চিঠি পাঠানো হয়। পরে সংশ্লিষ্ট হিসাবগুলোর অবরুদ্ধ স্থগিত না করতে আদালতে আবেদন করে দুদক। আদালত ও দুদক সূত্রে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
দুদকের তথ্যমতে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জন, ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও বিদেশে ১০ হাজার কোটি টাকা পাচার করেছেন। দুদকের অনুসন্ধান ও তদন্ত পর্যায়ে তার দেশে-বিদেশে থাকা সব সম্পদ জব্দের আদেশ জারি করে আদালত। সাইফুজ্জামান চৌধুরী সিন্ডিকেটের সদস্য তার ভাই আনিসুজ্জামান চৌধুরী ও পার্টনার মো. জুনায়েদ সফিকের বিরুদ্ধে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের ১০৬ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে পাঁচটি মামলা করে দুদক। মামলার আগে অনুসন্ধান পর্যায়ে আদালতের আদেশে আনিসুজ্জামান ও জুনায়েদের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়।
জানা গেছে, মামলার তদন্ত চলাকালে আনিসুজ্জামান চৌধুরী ব্যাংকে জব্দ থাকা অর্থ ছাড় করাতে চেষ্টা-তদবির করে আদালত থেকে এ-সংক্রান্ত একটি আদেশ নেন। ওই আদেশ পেয়ে তিনি ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলনের আবেদন করেন। এরপরই মেঘনা ব্যাংকের হেড অব এএমএলডি মো. নাজিম উদ্দিন পারভেজ জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ মেডিকেল সার্ভিসেস লিমিটেড ও নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের ব্যাংক হিসাব অবমুক্তকরণের বিষয়টি অবহিত করতে দুদকের প্রধান কার্যালয়ে চিঠি পাঠান। এতে বলা হয়, ঢাকা মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতের আদেশ অনুযায়ী আমাদের ব্যাংকে রক্ষিত হিসাবসমূহ স্থগিত (ফ্রিজ) করেছিলাম। পরে ওই আদেশের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের দেওয়া দুটি পৃথক অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ আমরা পেয়েছি। এই স্থগিতাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড এবং জাপান বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ মেডিকেল সার্ভিসেস লিমিটেডের হিসাবে জারিকৃত স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করছি।
জানা গেছে, বিষয়টি জানার পর আনিসুজ্জামান ও জুনায়েদের ব্যাংক হিসাব জব্দের আদেশ প্রত্যাহার না করতে আদালতে আবেদন করে দুদক। এতে বলা হয়, ভিশন ট্রেডিং, রিলায়েবল ট্রেডিং, ইমিনেন্ট ট্রেডার্স, ক্রিসেন্ট ট্রেডার্স এবং মডেল ট্রেডিংয়ের বিরুদ্ধে ব্যাংকের ১০৬ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে পাঁচটি মামলা করা হয়েছে। মামলার আসামি আনিসুজ্জামান চৌধুরী ও জুনায়েদ সফিক সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর সিন্ডিকেটের সদস্য। তারা জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল লিমিটেডের শেয়ার ক্রয়-বিক্রয়সহ সাইফুজ্জামান চৌধুরীর কৃত অপরাধের সঙ্গে যুক্ত থাকায় বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের হিসাবসমূহ অবরুদ্ধ করা হয়। বিএফআইইর অবরুদ্ধের মেয়াদ শেষ হলে দুদকের অনুসন্ধান চলমান থাকায় হিসাবসমূহ অবরুদ্ধের আদেশ বিজ্ঞ আদালত থেকে গ্রহণ করা হয়। বর্তমানে মামলার তদন্ত চলমান বিধায় হিসাবসমূহের অবরুদ্ধের আদেশ বাতিল করা হলে মামলার তদন্ত বাধাগ্রস্ত হবে এবং রাষ্ট্রের অপুরণীয় ক্ষতি হবে।
দুদকের একজন কর্মকর্তা বলেন, সাইফুজ্জামান চৌধুরী ইউসিবি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে থাকাকালে অন্যদের সঙ্গে যোগসাজশ করে ঋণের নামে হাজার-হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন। তার দেশে-বিদেশে সম্পদ জব্দের আদেশ দিয়েছে আদালত। তার আপন ছোট ভাই আনিসুজ্জামান চৌধুরী নাভানা ফার্মাসিটিউক্যালস লিমিটেড এবং ইউসিবি ব্যাংকের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আনিসুজ্জামান চৌধুরী, ব্যবসায়ী জুনায়েদ সফিক ও তারানা আহম্মদ ছিলেন সাইফুজ্জামানের হিসাব পরিচালনার সিগনেটরি। তারা পরস্পর যোগসাজশ করে সাইফুজ্জামান চৌধুরীর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আরামিট গ্রুপের কর্মচারীদের নামে করা ভুয়া ও অস্তিত্বহীন পাঁচটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নামে ইউসিবি ব্যাংকের ১০৬ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন। এ ঘটনায় গত বছরের জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে পাঁচটি মামলা করে দুদক। এর মধ্যে রিলায়েবল ট্রেডিংয়ের নামে ১৫ কোটি এবং মডেল ট্রেডিংয়ের নামে ২১ কোটি টাকাসহ ৩৬ কোটি আত্মসাতের মামলায় আনিসুজ্জামান চৌধুরীকে আসামি করা হয়। মামলা চলমান থাকাকালে তার জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ মেডিকেল সার্ভিসেস লিমিটেড ও নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের নামীয় ব্যাংক হিসাবের অবরুদ্ধের আদেশ বাতিল হলে তদন্ত কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হবে।