স্লোগান ‘সংস্কৃতিবিরোধী আস্ফালন রুখে দেবে কবিতা’ স্লোগান নিয়ে দুদিনব্যাপী জাতীয় কবিতা উৎসবের আয়োজন করেছে জাতীয় কবিতা পরিষদ। ঐতিহাসিকভাবেই সংগঠনটি ভাষার মাসের প্রথম দুদিন জুড়ে এ উৎসবের আয়োজন করে। তবে এবারই প্রথম উৎসবটি করেছে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। গতকাল রবিবার সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে জাতীয় কবির সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে ৩৮তম জাতীয় কবিতা উৎসবের সূচনা হয়। জাতীয় কবির সমাধির সামনে থেকে শোভাযাত্রা করে কবিরা টিএসসি প্রদক্ষিণ করে তারা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে যান। আবহমানকালের বাঙালি সংস্কৃতি চর্চাকেন্দ্র, মাজার, বাউলদের আখড়া ও গণমাধ্যমের ওপর সাম্প্রদায়িক হামলার প্রতিবাদে কবিরা মুখে লাল কাপড় বেঁধে শোভাযাত্রায় অংশ নিয়েছেন সংগঠনের কর্মীরা। হাতে ছিল বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও লালন সাঁইয়ের রক্তাক্ত প্রতিকৃতি, জাতীয় কবি কাজী নজরুলের কারাবন্দি ছবিসহ প্ল্যাকার্ড। কবিরা সন্ত্রাস ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়ে প্রতিক্রিয়াশীল অন্ধকারের শক্তির বিরুদ্ধে আলোর ডাক দেন।
উদ্বোধন অনুষ্ঠানে জাতীয় সংগীত ও পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। এরপর ভাষার গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ এবং এবারের উৎসব সংগীত ‘এ সংগীত নৃত্য কবিতা/এ সম্প্রীতি সাম্যের বারতা’ পরিবেশন করেন।
সভাপতির বক্তব্যে কবিতা পরিষদের সভাপতি কবি মোহন রায়হান বলেন, ১৯৮৭ সালে সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের সড়ক মোহনায়, রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে যাত্রা শুরু করেছিল জাতীয় কবিতা পরিষদ ও জাতীয় কবিতা উৎসবের। পরে এ উৎসব স্থানান্তরিত হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারসংলগ্ন হাকিম চত্বরে। সেখানে দীর্ঘদিনের সেই আয়োজনে এবার অনুমতি না পাওয়ায় শহীদ মিনারে এ আয়োজন। তিনি বলেন, সেই বদলে যাওয়া সময়কে আজ নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে অন্ধকারের অশুভ শক্তি। যারা আলোর সাম্পানে ভাসমান হাজার বছরের বাংলা সংস্কৃতিকে মেনে নিতে পারে না, আজ তাদেরই আস্ফালন চারদিকে।
উৎসবের উদ্বোধন করেন জুলাই গণআন্দোলনে শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধর বাবা মীর মুস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, কবিরা কবিতায় মানুষের মনের কথা বলেন। মানবতার দাবিই সবচেয়ে বড়। এই দাবিকে সামনে রেখে মানুষকে মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। সবাই মিলে একটি মানবিক দেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে আবু সাঈদ, ওয়াসিম, মুগ্ধের মতো আর কাউকে প্রাণ দিতে না হয়। তিনি বলেন, শহীদরা দেশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনের জন্য জীবন দিয়েছেন। তাদের সেই স্বপ্নপূরণ করতে সবাইকে আত্মনিয়োগ করতে হবে। কবিরা এই কাজে লেখনীর মাধ্যমে জনগণকে অনুপ্রাণিত করতে পারেন।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী বলেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। অতীত থেকে শিক্ষা না নিলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সঠিক পথ পাওয়া যায় না। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের রাজনৈতিক চেতনা থাকলেও প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল একটি সাংস্কৃতিক ঘটনা। সে কারণে তারা সব মত, আদর্শ, জাতি, গোষ্ঠীর অংশগ্রহণে বহুত্ববাদী সাংস্কৃতিক পরিসর সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন। ভবিষ্যতে যে সরকারই আসুক, তারা সংকীর্ণ বিভাজন ত্যাগ করে এই অন্তর্ভুক্তিমূলক সংস্কৃতিচর্চার ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখবেন বলে আশা প্রকাশ করেন সংস্কৃতি উপদেষ্টা।
কবিতা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন বলেন, জাতি যখনই কোনো সংকটের সামনে পড়েছে, তখন কবিরা সোচ্চার হয়েছেন। জাতীয় কবিতা পরিষদ কোনো রাজনৈতিক শক্তি নয়, কিন্তু সংকটে, সংগ্রামে কবিতা পরিষদ জাতির মুক্তির জন্য মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। সামনে একটি জাতীয় নির্বাচন আসছে। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে কবিরা জনগণকে গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক, মুক্ত সমাজ গঠনের শক্তির পক্ষে রায় দিতে আহ্বান জানাচ্ছে।
উৎসবের প্রথম দিনের নিয়মিত কর্মসূচিতে ছিল আলাদা চার পর্বে কবিতা পাঠ। প্রথম পর্বে পরিষদের উপদেষ্টা কবি মতিন বৈরাগীর সভাপতিত্বে আমন্ত্রিত কবিদের কবিতা পাঠ অনুষ্ঠিত হয়। এরপর কবি অনামিকা হক লিলি, কবি শাহীন চৌধুরী ও জাতীয় প্রেস ক্লাব সভাপতি কবি হাসান হাফিজের সভাপতিত্বে দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ পর্বের নিবন্ধিত কবিদের কবিতা পাঠ হয়েছে। সন্ধ্যায় আমন্ত্রিত আবৃত্তিশিল্পীদের আবৃত্তি পরিবেশনা ও রাত সাড়ে ৭টা থেকে আমন্ত্রিত শিল্পীদের পরিবেশনায় সংগীত এবং নৃত্যানুষ্ঠান হয়েছে। সোমবার দ্বিতীয় দিনের অধিবেশনে সকাল ১০টায় থাকবে থাকবে তারুণ্যের গান। এরপর পৃথক তিনটি অধিবেশনে নিবন্ধিত কবিদের কবিতা পাঠ ও ‘৭১ থেকে ২৪ : গণআন্দোলনে কবিতার ভূমিকা’ শীর্ষক সেমিনার। আলোচনা করবেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম ও কবি সাখাওয়াত টিপু। সন্ধ্যায় থাকবে আমন্ত্রিত কবিদের কবিতা পাঠ, আমন্ত্রিত আবৃত্তিশিল্পীদের আবৃত্তি এবং রাতে কবিতার গান ও নৃত্য।