ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে চায়ের আড্ডায় তরুণ ভোটারদের প্রত্যাশা, মতামত ও আগামীর বাংলাদেশ নিয়ে তাদের চিন্তা-ভাবনার কথা শুনেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কন্যা জাইমা রহমান। এ সময় তিনি তার নিজের মতামত তুলে ধরেন।
এই আড্ডায় উঠে আসে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গড়তে সবার অংশগ্রহণ, জুলাই যোদ্ধা, শিক্ষার্থীদের জন্য পার্টটাইম কাজের সুযোগ, যানজট, সাইবার বুলিং, গ্যাস ও পানি সমস্যা সমাধানসহ বিভিন্ন বিষয়। গতকাল সোমবার বিকেলে রাজধানীর বনানী ডিওএইচএস খেলার মাঠে এই আড্ডা অনুষ্ঠিত হয়।
দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ৫৫ শিক্ষার্থী এতে অংশগ্রহণ করেন। এতে ৬টি গোলটেবিলে বসেন অংশগ্রহণকারীরা। জাইমা রহমান প্রতিটি টেবিলে গিয়ে বসে কথা বলেন ও তাদের কথা শোনেন। বিকেল সোয়া ৩ টার দিকে শুরু হয়ে এই আড্ডা চলে প্রায় দুই ঘণ্টা।
তরুণ-তরুণীদের ভাবনা, প্রত্যাশা ও স্বপ্নের কথা শোনার জন্য ব্যতিক্রমধর্মী ‘চায়ের আড্ডা’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বিএনপি নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কন্টেন্ট জেনারেশন টিম।
আড্ডায় একজন নারী শিক্ষার্থী বলেন, অনলাইন ও পাবলিক স্পেসে আমাদের অনেক হেনস্তার শিকার হতে হয়। নারীদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যদি বাড়তি নজর দেওয়া যায়, তাহলে ভালো হবে।
জাইমা রহমান বলেন, নারীদের নিরাপত্তা আমাদের এক নম্বর প্রায়োরিটি। আমাদের দেশের প্রায় ৫১ শতাংশ নারী। তাদের নিরাপত্তা, কথা বলার অধিকার যদি না থাকে তাহলে... তাদের বাকস্বাধীনতা, ভিন্নমতাবলম্বন ও সমাজের উন্নয়নে অংশগ্রহণ নিয়ে আমাদের কাজ করতে হবে।
তিনি শিক্ষার্থীদের কাছে ঢাকা শহর সম্পর্কে জানতে চাইলে একজন শিক্ষার্থী বলেন, ক্যান্টনমেন্টের ভেতর যানবাহন সব সুন্দরভাবে চলে। কিন্তু বাইরে বের হওয়ার পর সব এলোমেলো হয়ে যায়। তো ট্রাফিক ব্যবস্থা যখন ভালো হবে, রাস্তায় শৃঙ্খলা আসবে তখন মনে হবে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। এটা আমাদের চাওয়া। তখন জাইমা রহমান বলেন, সড়ক ব্যবস্থাপনায় এটা (বিশৃঙ্খলা) দীর্ঘ সময় ধরে চলে এসেছে।
আরেকজন শিক্ষার্থী বলেন, আমরা একটু নির্মল ঢাকা দেখতে চাই। যানজট মুক্ত ঢাকা দেখতে চাই। যেখানে প্রাণভরে শ্বাস নিতে পারব।
জাইমা রহমান বলেন, এখন শীতের সময়। এসি কম চলছে। কিন্তু গরমের সময় সবগুলো এসি যখন চলবে তখন বাতাসের অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে যাবে। গাছপালা অনেক কমে গেছে। খালগুলোও খনন করা হয়নি। খাল-বিলগুলো সংস্কার করা, পার্কগুলো সংস্কারসহ শহর পরিষ্কার রাখতে হবে সবার জন্য। একই সঙ্গে দূষণ রোধ করার জন্যও। শহরে ফ্লাইওভার করা হয়েছে, কিন্তু নিচ দিয়ে যে মানুষ পার হবে ও রকম ব্যবস্থা নেই। রাত হলে, মনে হয় অনেক ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা হয়ে ওঠে।
শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘অফিস ও স্কুল-কলেজের সময় একইসময়ে হওয়ায় যানজট প্রকট আকার ধারণ করে। এটা অবশ্যই সমাধান করা জরুরি। স্কুল ও অফিস সময় একসঙ্গে রাখা যাবে না। স্কুল একটু দেরিতে শুরু করা যেতে পারে।’
জবাবে জাইমা বলেন, ‘আমার মা ছুটির দিন হলেও সকাল ৭টার সময় ওঠার তাড়া দিতেন। দেখুন, মানুষের সবসময় গাড়িতে চড়ছে, বাসে চড়ছে। যদি ১০/১২ মিনিট হেঁটেও যেতে পারে, ওটাতেই তো ভালো। আমার কাছে আজব লাগছে যে, আমার অনেক আত্মীয়স্বজন ঢাকায়, তার বাসায় আমি ১০/১৫ মিনিটে হেঁটে যাব, ওটাতে মানুষ ঘাবড়িয়ে যাচ্ছে। যদি রাস্তা-ঘাট, স্ট্রিট লাইটিং ঠিক করা হয়, সেফটির দিক থেকে, তাহলে তো আপনি যেকোনো জায়গায় হেঁটে যেতে পারেন।’
জাইমা রহমান জানতে চান বেসরকারি ও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে কোলাবরেশন হয় কি না? তখন স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী বলেন, এটা তো হয়ই না। বরং অনেক দূরত্ব রয়েছে। এখানে পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়কে দুইটি আলাদা দুনিয়া হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নেগলেক্ট করা হয়। মনে করা হয়, যে দেশের পলিসি মেকিংয়ে তারা কিছুই পারবে না। এমনকি জুলাই আন্দোলনে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার পরও!
জাইমা রহমান বলেন, এটা হয়তো নতুন প্রজন্মকে দিয়েই পরিবর্তন করা সম্ভব হবে। আমরা সবাইকেই সমান ভাবি।
জাইমা রহমানের কাছে শিক্ষার্থীরা জানতে চান তিনি কেমন বাংলাদেশ দেখতে চান? তখন তিনি বলেন, এটা খুবই কঠিন প্রশ্ন। ছোট বেলা আমি দেশ থেকে চলে গিয়েছিলাম। ১৭ বছর পর এসেছি। কিন্তু দেশের খোঁজ রাখতাম। প্রধানত আপনাদের মতো উৎসাহী-মেধাবী তরুণ যারা আছেন, এটা আমি নতুন ভাবে দেখছি। খবরের কাগজ বা টিভিতে খুব বেশি আপনাদের হাইলাইটস করা হয় না। কিন্তু আপনাদের মধ্যে এত আইডিয়া আছে, অনেক কিছু করার ইচ্ছে আছে, সেটা দেখে খুব ভালো লাগছে। আমি চাচ্ছি বাংলাদেশ যেন সবার জন্য হয়। বিভিন্ন ধরনের মানুষ তাদের মত, আদর্শ তুলে ধরবে, সেই স্বাধীনতা যেন থাকে। বাংলাদেশে সব সময় বিভিন্ন ধরনের মানুষ, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও আইডিয়ার মানুষ বাস করেন, ওইটা যেন আমরা হারিয়ে না ফেলি। এই ধরনের বাংলাদেশই আমি দেখতে চাচ্ছি।
আড্ডায় জাইমা বলেন কম, কিন্তু শিক্ষার্থীদের কাছে থেকে শোনেন বেশি। আলোচনায় বিড়াল ও প্রাণীদের বিষয়টিও উঠে আসে।
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণ নিয়ে তাদের চিন্তা-ভাবনা ও আকাক্সক্ষার কথা শোনেন এবং নিজের দৃষ্টিভঙ্গি ও অভিজ্ঞতা প্রকাশ করেন। আলোচনায় তিনি উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে কথা বলেন ও শোনেন।
অনুষ্ঠানের শেষ অংশে কোনো নির্দিষ্ট স্থানে না বসে এবং বক্তব্য না দিয়ে উপস্থিত তরুণদের সঙ্গে হেঁটে-হেঁটে কথা বলেন। একই সঙ্গে তাদের সঙ্গে চা, চটপটি, জিলাপি ও ঝালমুড়ি উপভোগ করেন জাইমা। আড্ডায় অংশ নেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, স্ট্যামফোর্ড, নর্থ সাউথ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।