মাতৃভাষা স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ দান

মহান আল্লাহ প্রত্যেক সৃষ্টিজীবের জন্য যোগাযোগের ভিন্ন ভিন্ন মাধ্যম নির্ধারণ করে দিয়েছেন। আর মানুষের জন্য কথা বলার নেয়ামত আল্লাহর শ্রেষ্ঠ দান। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন, ‘তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে ভাব প্রকাশ করতে শিখিয়েছেন।’ (সুরা আর-রহমান ৩-৪) জন্মের পর মায়ের কোল থেকেই শিশু যে ভাষায় কথা বলতে শেখে, তাই মাতৃভাষা। এটি স্রষ্টার পক্ষ থেকে পাওয়া এক জন্মগত অধিকার।

মাতৃভাষার সংজ্ঞা ও উৎপত্তি : মাতৃভাষা হলো জন্মের পর মা বা পরিবার থেকে শেখা প্রথম ভাষা, যা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তির সঙ্গে জড়িত। বাংলা ভাষা প্রায় ১০০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে গৌড়ী প্রাকৃত থেকে উদ্ভূত হয়েছে এবং প্রাচীন, মধ্যযুগীয় ও আধুনিক পর্যায়ে বিবর্তিত হয়েছে। ইসলামি দৃষ্টিকোণে, স্রষ্টা নবীদের স্বজাতির ভাষায় প্রেরণ করেছেন, যা মাতৃভাষার গুরুত্ব নির্দেশ করে।

আত্মপরিচয় ও জাতীয় অস্তিত্ব : মাতৃভাষা একজন মানুষের শিকড়। বিশে^র যে প্রান্তেই মানুষ থাকুক না কেন, নিজের ভাষায় কথা বলার সময় সে এক আত্মিক প্রশান্তি অনুভব করে। একটি শিশুর মেধা ও মনন বিকাশে মাতৃভাষার ভূমিকা অপরিসীম। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, শিশু তার মাতৃভাষায় সবচেয়ে দ্রুত কোনো বিষয় উপলব্ধি করতে পারে। ইউনেস্কোর এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাথমিক শিক্ষা মাতৃভাষায় প্রদান করলে শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতা বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়।

বৈচিত্র্যের সৌন্দর্য : পৃথিবীতে বর্তমানে প্রায় ৭,০০০-এর বেশি ভাষা প্রচলিত রয়েছে। এই ভাষাগত বৈচিত্র্য স্রষ্টার মহিমা ঘোষণা করে। পবিত্র কোরআনের ভাষ্য, ‘তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য তারই নিদর্শনের অন্তর্ভুক্ত।’ (সুরা রুম ২২) স্রষ্টা প্রতিটি জাতির কাছে তাদের নিজস্ব ভাষায় পথপ্রদর্শক ও বার্তা পাঠিয়েছেন, যেন তারা তা সহজে বুঝতে পারে।

মাতৃভাষার লড়াই ও বাংলাদেশ : মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় বাঙালি জাতির আত্মত্যাগ ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সালাম, বরকত, রফিক, জব্বাররা রাজপথে রক্ত দিয়ে প্রমাণ করেছেন, মায়ের ভাষা কোনো রাজনৈতিক আপসের বিষয় নয়। বাঙালির এই বীরত্বগাথা আজ সারা বিশ্বে স্বীকৃত। ১৯৯৯ সালে  ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং ২০০০ সালে প্রথমবার বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালিত হয়।

সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব : মাতৃভাষা একটি সমাজের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং ইতিহাসকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেয়। যখন একটি ভাষা হারিয়ে যায়, তখন সেই জাতির শত বছরের জ্ঞান ও সংস্কৃতি বিলুপ্ত হয়ে যায়। তাই মাতৃভাষা রক্ষা করা কেবল আবেগ নয়, এটি একটি নৈতিক দায়িত্ব। স্রষ্টা আমাদের যে ভাষায় কথা বলার শক্তি দিয়েছেন, তার চর্চা ও উন্নয়ন সাধন করা কৃতজ্ঞতারই অংশ।

মাতৃভাষা স্রষ্টার দেওয়া এক অমূল্য সম্পদ। এটি মায়ের মমতা আর মাটির টানকে এক সুতোয় গেঁথে রাখে। মায়ের ভাষায় কথা বলতে পারা যেমন অধিকার, তেমনি এই ভাষাকে সম্মান করা এবং এর শুদ্ধ চর্চা করা আমাদের ইমানি ও নাগরিক দায়িত্ব। মাতৃভাষার মাধ্যমেই আমরা স্রষ্টাকে ডাকি এবং পৃথিবীর বুকে নিজেদের স্বকীয়তা বজায় রাখি।

লেখক : শিক্ষক ও ইসলামবিষয়ক গবেষক