ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটের কেন্দ্র দখল ও সহিংসতা রোধে সরকার সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। প্রস্তুতির অন্যতম বিষয় হচ্ছে, নির্বাচন চলাকালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের শরীরে ক্যামেরা (বডিওর্ন ক্যামেরা) বসানোর সিদ্ধান্ত। প্রথমবারের মতো ভোটকেন্দ্রে পুলিশ বডিওর্ন ক্যামেরা নিয়ে দায়িত্ব পালন করবে। ২৫ হাজার ৫০০ বডিওর্ন ক্যামেরা বসানো হবে বলে সূত্রে জানা গেছে।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশও (বিজিবি) বডিওর্ন ক্যামেরা ব্যবহারের কথা জানিয়েছে। এসব ক্যামেরাকে সাইবার হামলা থেকে সুরক্ষিত রাখতে স্বতন্ত্র নেটওয়ার্ক (বলয়) তৈরি করেছে পুলিশ সদর দপ্তর। মাসখানেক আগে মাঠপর্যায়ে এসব ক্যামেরার ট্রায়াল শুরু করেছে তারা। পরীক্ষণকালে কিছু অনাকাক্সিক্ষত ঘটনাও ঘটেছে।
সারা দেশে ৪২ হাজার ৭৬১টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১৭ হাজার ৫৫৬টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশ সদর দপ্তর। ঢাকা মহানগরীর ১৩টি সংসদীয় আসনের ২ হাজার ১৩১টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১ হাজার ৬১৪টি ঝুঁকিপূর্ণ। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) রমনা বিভাগে ১৬৭ কেন্দ্রের মধ্যে ১২টি ঝুঁকিপূর্ণ, তেজগাঁও বিভাগের ২৮৬টি কেন্দ্রের মধ্যে ১৫০টির বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। অন্যান্য বিভাগের অবস্থাও প্রায় একই। নিরাপত্তার জন্য অতিঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে তিনজন, ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে দুজন এবং সাধারণ কেন্দ্রে একজন পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। তাদের বডিওর্ন ক্যামেরায় ধারণকৃত দৃশ্য দেখে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, নির্বাচনে ঝুঁকিপূর্ণ ও অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোতে বডিওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে সরকার। এসবের মধ্যে ১৫ হাজার ক্যামেরায় সিমকার্ড সংযুক্ত থাকবে, যাতে ইন্টারনেটের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কোনো ভোটকেন্দ্রে অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি তৈরি হলেই জরুরি বিপদসংকেত (এসওএস) পাঠানোর মাধ্যমে সরাসরি ইন্টারনেটে যুক্ত হয়ে লাইভ স্ট্রিমিং শুরু হবে। সার্বক্ষণিক লাইভ ছবি ও ভিডিও দেখার ব্যবস্থাও রয়েছে।
এবার নির্বাচনে ব্যবহার্য আধুনিক ফিচারের ১৫ হাজার বডিওর্ন ক্যামেরা ভোটগ্রহণের পুরো সময় অনলাইনে লাইভে থাকবে। ক্যামেরাগুলো একসঙ্গে ছয় জায়গায়, যেমন থানার ডক স্টেশন, ডিসি-এসপি কার্যালয়, মেট্রোপলিটন-রেঞ্জ কার্যালয়, পুলিশ সদর দপ্তর, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং সেল এবং প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে বসানো সেলে লাইভে চলবে। বিষয়টি মনিটরিং করবে সদর দপ্তরের টেকনিক্যাল ইউনিট। এ ছাড়া ১০ হাজার ক্যামেরায় শুধু ভিডিও ধারণ করবে পুলিশ। ভোটগ্রহণের সময় ও ভোটের পরে অনলাইনে থাকা বডিওর্ন ক্যামেরা দিয়ে সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। এজন্য পুলিশ সদর দপ্তরের মনিটরিং সেলে রাখা হয়েছে পৃথক ব্যবস্থা। কোনো ভোটকেন্দ্রে সহিংসতা সৃষ্টি হলে সঙ্গে সঙ্গে আলাদা মনিটরে লাইভ সম্প্রচার চলবে। এজন্য স্বতন্ত্র সুরক্ষিত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে সদর দপ্তর। পুলিশের নিজস্ব ডেটা সেন্টারেও সংরক্ষিত থাকবে ভোটের দিনের ধারণকৃত ছবি ও ভিডিও।
হ্যাকিং করে কেউ যাতে অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি তৈরি করতে না পারে, সে বিষয়ে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অনলাইন নেটওয়ার্কে অনুপ্রবেশ রোধে শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে পুলিশ সদর দপ্তর। সন্দেহজনক কোনো চলাচল নেটওয়ার্কে ধরা পড়লে অ্যালার্ট ও অটো ব্লকের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। হ্যাকিংয়ের চেষ্টা করলেই ব্যবস্থা। সাইবার পুলিশ ইউনিটকে সতর্ক রাখা হবে।
বডিওর্ন ক্যামেরা অপারেটিংয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনলাইনে থাকা বডিওর্ন ক্যামেরার জন্য ডক স্টেশন, সার্ভার ও ক্লাউডভিত্তিক ডেটা ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ে পূর্ণাঙ্গ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হচ্ছে। এ নেটওয়ার্কের কোনো স্তরে দুর্বলতা থাকলে ভোটের সংবেদনশীল ভিডিও ফাঁস, প্রমাণ নষ্ট কিংবা তথ্য বিকৃতির ঘটনা ঘটতে পারে। হ্যাকাররা সুযোগ পেলে আগে সংঘটিত সহিংসতার ভিডিও ছড়িয়ে দেবে। এসব মাথায় রেখেই বডিওর্ন ক্যামেরার অনলাইন নেটওয়ার্ক সংহত করা হয়েছে। সন্দেহ হলেই সংক্রিয় সিগন্যাল।
সূত্র জানিয়েছে, পুলিশ সদস্যদের ভেতরের অপব্যবহার ঠেকাতেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ভোটের ধারণ করা ভিডিও কোন পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্য দেখতে বা ব্যবহার করবেন সে বিষয়েও সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের কথা বলেছে পুলিশ সদর দপ্তর। ভিডিও যাচাইয়ে মাল্টি-ফ্যাক্টর ভেরিফিকেশন চালু এবং অডিট লগ সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। লগ পরিবর্তনের বা মুছে ফেলার সুযোগ নেই।
পুলিশ সদর দপ্তরের এক ঊধ্বর্তন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সব থানায় ট্রায়ালের জন্য কিছু বডিওর্ন ক্যামেরা পৌঁছে গেছে। ১৫-২০ দিন আগে থেকে থানার মোবাইল পার্টি এবং ট্রাফিক সার্জেন্টরা এসব ক্যামেরা ব্যবহার করছেন। ক্যামেরার একটি ব্যাটারি ছয় ঘণ্টা সাপোর্ট দেবে। প্রত্যেক সদস্যকে একাধিক ব্যাকআপ ব্যাটারি দেওয়া হয়েছে। একটি ক্যামেরা ২৪-৪৮ ঘণ্টা লাইভে রেখে দেখা হয়েছে। ছোটখাটো যেসব সমস্যা ধরা পড়েছে, সেসব কাটিয়ে তোলা হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের সংখ্যা নির্ধারণ করে ক্যামেরা দেওয়া হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বডিওর্ন ক্যামেরা ব্যবহারের সুবিধার্থে দেশের প্রতিটি থানায় ডক স্টেশন করা হয়েছে। ওই স্টেশন থেকে থানাধীন ভোটকেন্দ্রে ব্যবহৃত ক্যামেরা মনিটরিং করা হবে। একজন উপপরিদর্শক (এসআই) স্টেশনে বসে মাঠের কার্যক্রম মনিটরিং করবেন। এ ছাড়া পুলিশ কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজি, উপপুলিশ কমিশনার ও পুলিশ সুপারের দপ্তরে পৃথক ডক স্টেশন থাকবে। সারা দেশে ৭২০টি ডক স্টেশন প্ল্যাটফর্ম বসানো হচ্ছে।
ভোটকেন্দ্রের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবে নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ভোটগ্রহণকালে পুলিশ সদর দপ্তরের কমান্ড সেন্টার বডিওর্ন ক্যামেরা দিয়ে সরাসরি ভোটকেন্দ্রের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে। ভোটকেন্দ্রের ভেতরের-বাইরের যেকোনো ঘটনার ফুটেজ গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে ক্যামেরার মেমোরি কার্ড সংরক্ষিত থাকবে।
বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা শরীফুল ইসলাম বলেন, ‘সীমান্তবর্তী এলাকায় নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকালে কেন্দ্রে বিজিবি সদস্যরাও বডিওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করবে। নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় তিন শতাধিক ক্যামেরা ব্যবহৃত হবে।’
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (প্রশাসন) মো. সারওয়ার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্বাচনে রাজধানীর বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে দুই হাজারের বেশি বডিওর্ন ক্যামেরা ব্যবহৃত হবে। ডিএমপির প্রতিটি থানায় একটি করে ডক স্টেশন বসানো হয়েছে। ডক স্টেশনগুলোতে সংশ্লিষ্ট থানার সব বডিওর্ন ক্যামেরার তদারকি করবেন একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা। এজন্য প্রায় আড়াই হাজার সদস্যকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘পুলিশের স্বতন্ত্র নেটওয়ার্কের কারণে সাইবার হামলার কোনো আশঙ্কা নেই। তারপরও ডিএমপির আইটি বিভাগের কর্মকর্তাদের প্রস্তুত রাখা হয়েছে। হামলা হলেই ব্যবস্থা।’