শুধু রোগীদের চিকিৎসা দিলে হবে না, রোগের উৎসগুলো বন্ধ করতে হবে। সেই লক্ষ্যে রোগপ্রতিরোধ ও স্বাস্থ্যের উন্নয়নের বিষয়টি গুরুত্ব পাবে বিএনপির ইশতেহারে। সবার জন্য সহজে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে যা যা করণীয়, সবই করতে চায় দলটি। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের আদলে একটি স্বাস্থ্য মডেল তৈরি পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
দেশে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ মোট জিডিপির ১ শতাংশের নিচেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। এটিকে বিএনপি পর্যায়ক্রমে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশমতো ৫ শতাংশে নিতে চায়। প্রাণঘাতী ও অন্য বিভিন্ন জটিল রোগের চিকিৎসা শুধু ঢাকা বা বিভাগীয় শহরকেন্দ্রিক নয়; বিকেন্দ্রীকরণ করে নিয়ে যেতে চায় জেলা-উপজেলায়; এমনকি ইউনিয়ন ও গ্রামপর্যায়ে। যাতে কিডনি, হার্ট, ফুসফুস, স্ট্রোক, ক্যানসারের চিকিৎসার জন্য মানুষকে ঢাকামুখী হতে না হয়।
বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানান, স্বাস্থ্য খাতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ক্যাটাগরিতে ভাগ করে কার্যক্রম চালাবে দলটি। জোরদার করবে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা। এজন্য পর্যায়ক্রমে লক্ষাধিক জনবল নিয়োগের পরিকল্পনাও রয়েছে। এতে নারীদের প্রাধান্য দেওয়া হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে অন্তত ৮০-৮৫ হাজার নারী জনবল নিয়োগ দেওয়া হবে। তাদের এমনভাবে প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে তোলা হবে, যাতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষকে সচেতন করতে পারেন। মানুষকে রোগপ্রতিরোধের বিষয়ে বোঝাতে পারেন। কোন খাবার স্বাস্থ্যের জন্য ভালো, কোন খাবার কখন খেতে হবে, কখন ঘুমানো উচিত, কখন কোন অসুস্থতায় ডাক্তারের কাছে যেতে হবে, কখন টিকা নিতে হবে বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষকে এসব জানাবেন স্বাস্থ্যকর্মীরা।
স্বাস্থ্য খাতের পরিসর অনেক বড়। এ খাতে অধিক গুরুত্ব দিয়ে রেফারেল সিস্টেম চালু, জরুরি অ্যাম্বুলেন্স সেবার নিশ্চয়তা, চিকিৎসকসহ সব স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীকে ন্যায্য অধিকার ও সুরক্ষা, ইলেকট্রনিক স্বাস্থ্য রেকর্ড ব্যবস্থা চালু করতে চায় বিএনপি। পুষ্টি ও নারীস্বাস্থ্য সবসময় উপেক্ষিত থাকলেও এ বিষয়টিতে গুরুত্ব দেবে তারা। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় রয়েছে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। স্বাস্থ্যশিক্ষা ও গবেষণা জোরদার করে আন্তর্জাতিক চাহিদা পূরণে সক্ষম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এবং স্বাস্থ্য পর্যটন উপযোগী একটি আন্তর্জাতিক মানের স্বাস্থ্য পরিকাঠামো নির্মাণের লক্ষ্যও রয়েছে বিএনপির পরিকল্পনায়।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, দেশে সেন্ট্রাল অ্যাম্বুলেন্স সিস্টেম নেই। মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সে রকম ব্যবস্থা নেই। মেডিকেল বর্জ্য মানুষের জন্য খুবই ক্ষতিকর। বিএনপি ক্ষমতায় এলে সেন্ট্রাল অ্যাম্বুলেন্স সিস্টেম ও মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা করবে।
বিএনপি রোগীদের চিকিৎসার সঙ্গে রোগের উৎসগুলো বন্ধে গুরুত্ব দেবে জানিয়ে জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের পরিচালক ডা. শাহ মুহাম্মদ আমান বলেন, ‘দলের চেয়ারম্যান দেশের সব মানুষকে সঙ্গে নিয়ে স্বাস্থ্য খাতে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে চান। তিনি চান বিনাচিকিৎসায় যেন কারও মৃত্যু না হয়। সবাই যেন খুব সহজে স্বাস্থ্যসেবা পান। আমরা চিকিৎসার পাশাপাশি রোগপ্রতিরোধের ওপর জোর দিতে চাই। যেসব রোগ প্রতিরোধযোগ্য আমরা যদি সেগুলো প্রতিরোধ করতে পারি, তাহলে দুর্ভোগ এবং অর্থের অপচয় রোধ হবে। সেজন্য নানা ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে। যেমন সবার জন্য বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিতের ব্যবস্থা করা হবে। যাতে পানিবাহিত রোগ প্রতিরোধ করা যায় বা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। সারা দেশে বৃক্ষরোপণ করা। বৃক্ষরোপণ করলে কী হবে? বায়ুদূষণ কমে আসবে। মানুষ বিশুদ্ধ অক্সিজেন পাবে। বিশুদ্ধ অক্সিজেন নিশ্চিত করা গেলে দূষণজনিত রোগ কমে যাবে। শুধু বৃক্ষরোপণ নয়; দূষণজনিত রোগপ্রতিরোধে যেসব ব্যবস্থা নেওয়া দরকার, সবই করা হবে।’
দেশে গর্ভবতী মা ও শিশুরা পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা পান না। মা ও শিশুর স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানোর জন্য যতটুকু আছে, সেটি আরও সহজলভ্য করার উদ্যোগ নেবে বিএনপি। সারা দেশের আইসিইউ সেবার জন্য দক্ষ জনবল তৈরি করা হবে। ডায়ালাইসিস সমস্যা সমাধানে জেলায় জেলায় ডায়ালাইসিস সেন্টার করা হবে। স্বাস্থ্যবীমা নিয়েও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে। বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হবে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে।