এবার চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ইস্যুতে মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে দুই পক্ষ। আন্দোলনকারী শ্রমিক কর্মচারীরা এবার অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের ডাক দিয়েছেন। এদিকে শ্রমিকদের ধর্মঘট মোকাবিলা করতে বন্দরের ১৬টি বিভাগের ৩০০ শ্রমিক কর্মচারীর সঙ্গে মিটিং করার ঘোষণা দিয়েছেন বন্দর চেয়ারম্যান। একইসঙ্গে শ্রমিকদের উপস্থিতি নিশ্চিতের জন্য দপ্তর প্রধানদের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। অপরদিকে এই সভা প্রতিহতেরও ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। এদিকে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা তদন্তের উদ্যোগ নেওয়ায় আন্দোলনকারী ও বন্দর কর্তৃপক্ষ সাংঘর্ষিক অবস্থানে পৌঁছেছে বলে বন্দর ব্যবহারকারীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
গত বৃহস্পতিবার দুপুরে নৌ উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে শ্রমিক-কর্মচারীদের মিটিংয়ের পর পর দুই দিনের (শুক্র ও শনিবার) জন্য অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি স্থগিতের ঘোষণা করেছিল আন্দোলনকারীরা। কিন্তু দুপুরে মিটিংয়ের পর রাতেই আবার আন্দোলনকারী ১৫ শ্রমিক কর্মচারীর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করে তাদের সম্পদের খোঁজ নিতে দুর্নীতি দমন কমিশনের কাছে চিঠি দেয় বন্দর কর্তৃপক্ষ। আর এই এক চিঠিতেই হিসাব পাল্টে যায়। আন্দোলনকারীরা যেখানে দুই দিনের কর্মবিরতি দিয়ে একটি সমঝোতার জায়গায় আসার আভাস দিয়েছিল সেখানে এই চিঠি দিয়ে তাদের এক ধরনের হুমকি দেওয়া হয়। এতে দুই দিনের কর্মবিরতি শেষ হওয়ার আগেই গতকাল শনিবার সকালে সংবাদ সম্মেলন করে অনির্দিষ্টকালের জন্য চট্টগ্রাম বন্দরে ধর্মঘটের ডাক দেয়। আর এবার শুধু চট্টগ্রাম বন্দরের জেটি কিংবা বন্দর ভবনের প্রশাসনিক কাজ নয়, এবার চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরেও জাহাজের কোনো কার্যক্রম হবে না। সাধারণত বহির্নোঙরে মাদারভেসেল (বড় জাহাজ) থেকে ছোট জাহাজে (লাইটার জাহাজ) পণ্য খালাস কার্যক্রম হয়ে থাকে। আসন্ন রমজানের সব ভোগ্যপণ্য বাল্ক কার্গোতে এসে থাকে। তখন মাদার ভেসেল থেকে লাইটার জাহাজে করে দেশের বিভিন্ন স্থানে পণ্য নিয়ে যাওয়া হয়। আজ রবিবার থেকে এই কাজটিও বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছেন শ্রমিক-কর্মচারীরা। একইসঙ্গে গত সপ্তাহের বুধ ও বৃহস্পতিবারের মতো কোনো জাহাজও চলাচল করতে পারবে না। অর্থাৎ এক কথায় কার্যত বন্ধ থাকবে দেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম।
এনসিটি বিদেশি কোম্পানিকে দেওয়া যাবে না : আন্দোলনকারী শ্রমিক নেতা ইব্রাহিম খোকন বলেন, ‘আমাদের চার দফা দাবি সরকারকে মানতে হবে। এই চার দফার মধ্যে সবার আগে চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি কনটেইনার টার্মিনালকে পরিচালনার জন্য কোনো বিদেশি কোম্পানিকে ইজারা দেওয়া যাবে না। সরকারকে এই অবস্থান থেকে সরে আসতেই হবে। এর বাইরে অন্য তিনটি দাবি হলো, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামানকে অপসারণ করতে হবে, আমাদের বিরুদ্ধে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারবে না, আমাদের যেসব নেতা কর্মী যে পদে ছিলেন তাদের স্বপদে বহাল রাখতে হবে।’ এদিকে গতকাল সকালে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনকারী অন্যতম নেতা হুমায়ুন কবির বলেন, সরকার আমাদের উদারতাকে দুর্বলতা মনে করেছে। দেশবাসীর বৃহত্তর স্বার্থে আমরা দুই দিনের জন্য কর্মসূচি স্থগিত করেছিলাম। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে আমরা সাপোর্ট পাইনি উল্টো আমাদের হয়রানির চেষ্টা করা হচ্ছে।
৩০০ শ্রমিক-কর্মচারীকে উপস্থিতি মিটিংয়ের ডাক দিয়েছেন বন্দর চেয়ারম্যান : চট্টগ্রাম বন্দরে প্রায় সাত হাজার শ্রমিক কর্মচারী কাজ করছেন। গত শনিবার থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে প্রথমে সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত আট ঘণ্টা করে কর্মবিরতির ডাক দিলেও মঙ্গলবার ২৪ ঘণ্টা এবং বুধবার থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতি ছিল। বৃহস্পতিবার কর্মবিরতি থাকার পর নৌ উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকের পর ঢাকায় গিয়ে প্রধান উপদেষ্টা ও সংশ্লিষ্ট কমিটির (এনসিটি চুক্তি ইস্যু) সঙ্গে আশ্বাস পেয়ে শুক্র ও শনিবার দুই দিনের জন্য স্থগিত করা হয়েছিল। এখন আবারও রবিবার থেকে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের ডাক দেওয়ার পর বন্দরের পক্ষ থেকে সাধারণ শ্রমিক-কর্মচারীদের সঙ্গে মিটিং আহ্বান করা হয়েছে। সচিব স্বাক্ষরিত সেই চিঠিতে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যার রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান সকাল ৯টা ৩০ মিনিটে বন্দর অডিটরিয়ামে এক জরুরি সভায় মিলিত হবেন। উক্ত সভায় ২০০ কর্মকর্তা-কর্মচারীর উপস্থিতি নিশ্চিত করার জন্য বিভাগীয় প্রধানদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এরমধ্যে পরিবহন বিভাগ থেকে ৫০ জন, নিরাপত্তা বিভাগের ২০ জন, যান্ত্রিক বিভাগের ৪০ জন, বিদ্যুৎ বিভাগের ২০ জন, প্রকৌশল বিভাগের ২০ জন, অর্থ ও হিসাব বিভাগের ১৫ জন, নিরীক্ষা বিভাগের ৫ জন, সচিব বিভাগের ৫ জন, নৌ-বিভাগের ১৫ জন, নৌ-প্রকৌশল বিভাগের ৫ জন, কম্পিউটাার বিভাগের ৫ জন, চিকিৎসা বিভাগের ১০ জন, হাইড্রোগ্রাফি বিভাগের ৫ জন, পরিকল্পনা বিভাগের ৫ জন, ভা-ার বিভাগের ৫ জন এবং প্রশাসন বিভাগের ৫ জন শ্রমিক-কর্মচারীর উপস্থিতি নিশ্চিত করার জন্য বলা হয়েছে। এ ছাড়া চিফ ওয়েলফেয়ার অফিসারকে বিভিন্ন ক্যাটাগরির ১০০ জন নিবন্ধিত সাধারণ শ্রমিকের উপস্থিতি নিশ্চিতের জন্য বলা হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরে যেখানে প্রায় ৭ হাজার শ্রমিক কর্মচারী রয়েছে। সেখানে তাদের মধ্যে নির্ধারিত কিছু শ্রমিক কর্মচারীদের ডেকে জরুরি মিটিং হতে দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন আন্দোলনকারীদের নেতা ইব্রাহিম খোকন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কোনো শ্রমিক-কর্মচারী চেয়ারম্যানের ডাকে মিটিংয়ে আসবে না। মিটিংই হবে না।’
প্রধান উপদেষ্টার কাছে খোলা চিঠি বন্দর ব্যবহারকারীদের : বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশন-এর সভাপতি ফজলে শামীম এহসান, বিজিএমইএর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সেলিম রহমান, বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, বিটিএমএর সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল স্বাক্ষরিত খোলা চিঠিতে বলা হয়, দেশের ৯৯ শতাংশ কনটেনার ও ৭৮ শতাংশ সমুদ্রপথের বাণিজ্য চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর নির্ভরশীল। রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হলে তৈরি পোশাক খাত সব রপ্তানি খাত অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হবে। আসন্ন রমজানে নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য ও শিল্পের কাঁচামাল জাহাজ থেকে খালাস করতে না পারলে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হতে পারে এবং দ্রব্যমূল্য সাধারণের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে। বন্দরে জাহাজজট ও কার্যক্রম স্থগিতের ফলে প্রতিদিন আমদানিকারকদের বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ডেমারেজ চার্জ পরিশোধ করতে হবে। বিশেষ করে এনসিটি ইজারাসংক্রান্ত ইস্যুতে কর্মচারী ও বন্দর কর্তৃপক্ষ একটি সাংঘর্ষিক অবস্থানে পৌঁছেছে। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা ও তদন্তের উদ্যোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিষয়টি দ্রুত সুরাহার দাবি জানানো হয়।
এদিকে বিজিএমইএ নেতা নাসির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, বন্দর ও শ্রমিক কর্মচারীদের আন্দোলনের চাপে আমরা ব্যবসায়ীরা পিষ্ট হয়ে যাচ্ছি। আমাদের রপ্তানিপণ্য যেমন জাহাজীকরণ করতে পারছি না তেমনিভাবে আমদানিপণ্যও খালাস করতে পারছি না। এতে বিশাল আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছি।
একই মন্তব্য করেন বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট খায়রুল আলম সুজন। তিনি বলেন, ‘দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য তলানিতে পৌঁছেছে। এই মুহূর্তে রপ্তানি পণ্যগুলো পাঠাতে পারলেও কিছুটা ক্ষতি পুষিয়ে আনা যেত। গত এক সপ্তাহ জুুুড়ে যে অচলাবস্থা চলছে দুই পক্ষের মুখোমুখি অবস্থানের কারণে তা আরও দীর্ঘায়িত হবে।’ এদিকে বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোস অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদার বলেন, আমাদের ডিপোগুলোতে জাহাজীকরণের জন্য অপেক্ষায় রয়েছে ১৩ হাজার ৭০০ একক কনটেনার।
চুক্তির অবস্থানে অনড় সরকার : নৌ উপদেষ্টা গত বৃহস্পতিবার বন্দর ভবনের সামনে উপস্থিত সংবাদকর্মীদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে সঙ্গে চুক্তি হবেই। চুক্তি না হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তবে এতটুকু বলা যায় দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে কোনো চুক্তি হবে না।
অপরদিকে আন্দোলনকারী দাবি, চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি কনটেনার টার্মিনাল কোনোভাবেই বিদেশিদের দেওয়া যাবে না। তাদের যুক্তি একটি রেডিমেড টার্মিনালকে আমরা কেন বিদেশিদের হাতে তুলে দেব? এর আগে বে-টার্মিনালের দুটি টার্মিনাল, লালদিয়া টার্মিনাল বিদেশিদের দেওয়ার বিষয়ে সরকারের চুক্তি হলেও আমরা আন্দোলন করিনি। এই রেডিমেড টার্মিনাল কোনো বিদেশি কোম্পানিকে দেওয়া যাবে না। এই টার্মিনাল দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের ৪০ শতাংশ পণ্য হ্যান্ডলিং হয়ে থাকে।
উল্লেখ্য, এনসিটি টার্মিনাল নিয়ে উচ্চ আদালত থেকে বিদেশি অপারেটরের সঙ্গে চুক্তির প্রক্রিয়ার বৈধতা প্রশ্নে করা দায়ের করা রিট গত ২৯ জানুয়ারি খারিজ করে দিয়েছে হাইকোর্ট। বিচারপতি জাফর আহমেদের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেয়। রিটের বিষয়ে দেড় মাসেরও বেশি সময় আগে হাইকোর্টেও দ্বৈত বেঞ্চসংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিভক্ত রায় দিয়েছিল। ২৯ জানুয়ারির রায়ের মাধ্যমে হাইকোর্টে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতে রিট ও রুল খারিজের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে। এতে বিদেশিদের (ডিপি ওয়ার্ল্ড) বরাদ্দ দিতে কোনো আইনগত সমস্যা নেই। আর এরপর থেকেই আন্দোলনের ঘোষণা দেওয়া বন্দরের জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল এবং যা পরবর্তীতে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদে রূপ নেয়।