দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বরিশালের ছয়টি আসনে ভোটের চূড়ান্ত সমীকরণ এখন অনেকটাই স্পষ্ট। মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বলছে, যেসব আসনুেক দীর্ঘদিন ধরে চরমোনাইপন্থিদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে বিবেচনা করা হতো, সেখানেই এবার সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়েছে বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলন। বিপরীতে বিএনপি তাদের পুরনো ভোটব্যাংক, সংগঠন ও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক মেরূকরণকে কাজে লাগিয়ে একাধিক আসনে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, অতীতের মতো আবেগনির্ভর ভোট যদি বাস্তব ভোটে রূপ না নেয় এবং মাঠপর্যায়ে ভোট রক্ষা নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে চরমোনাইভিত্তিক রাজনীতির জন্য এই নির্বাচন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। কারণ এবারের নির্বাচনে শুধু জনপ্রিয়তা নয়, ভোট ধরে রাখাই সবচেয়ে বড় বাস্তবতা। মাঠের হিসাব বলছে বিএনপি এগিয়ে, আর ইসলামী আন্দোলনের জন্য এই নির্বাচন হয়ে উঠেছে বড় রাজনৈতিক সক্ষমতার পরীক্ষা। এই পরীক্ষার চূড়ান্ত ফল জানা যাবে ভোটের দিন।
নির্বাচনী প্রচারে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ চাঁদাবাজি, দখলদারি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নিয়েছে। গত শনিবার বিকেলে বরিশাল শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে হাতপাখা প্রতীকের নির্বাচনী জনসভায় দলের সিনিয়র নায়েবে আমির ও বরিশাল-৫ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী মুফতি ফয়জুল করীম বলেছেন, বরিশাল চাঁদাবাজদের কবলে জর্জরিত এবং সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীন। এই অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হলে সৎ ও ন্যায়ভিত্তিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তিনি নির্বাচিত হলে কোনো ধরনের চাঁদাবাজি, দখলদারি ও দুর্নীতির সঙ্গে আপস না করার ঘোষণা দেন।
এদিকে বরিশাল-১ আগৈলঝাড়া ও গৌরনদী আসনে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মাঠে থাকলেও মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠেছে বিএনপির ধানের শীষের প্রার্থী জহির উদ্দিন স্বপন ও বিএনপি নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী আবদুস সোবাহানের মধ্যে। ভোট বিভাজনের এই বাস্তবতায় হাতপাখা এখানে প্রভাব বিস্তারে ব্যর্থ হচ্ছে।
বরিশাল-২ উজিরপুর ও বানারীপাড়া আসনে বিএনপির প্রভাবশালী নেতা সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টুর বিপরীতে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী লড়লেও জামায়াতের প্রার্থী উপস্থিত থাকায় ইসলামী ভোট ভাগ হয়ে যাচ্ছে। এতে হাতপাখা আরও চাপে পড়েছে।
বরিশাল-৩ (বাবুগঞ্জ-মুলাদী) আসনে ভিন্ন এক চিত্র। জামায়াত সমর্থিত এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ভূঁইয়া (ফুয়াদ) এবং হাতপাখার প্রার্থী মাওলানা মুহা. সিরাজুল ইসলাম মাঠে থাকলেও ভোটারদের নজর বেশি জাতীয় পার্টির প্রার্থী গোলাম কিবরিয়া টিপুর দিকে। কারাগারে থেকেই নির্বাচন করায় তার কন্যা হাবিবা কিবরিয়া পুরো প্রচার সামলাচ্ছেন, যা ভোটারদের মধ্যে কৌতূহল ও সহানুভূতির আবহ তৈরি করেছে। তাছাড়া বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী জয়নাল আবেদীন ফারুকের শক্ত অনুসারী গোষ্ঠী থাকায় আসনটি জাতীয় পার্টি ও বিএনপির মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে রূপ নিচ্ছে।
বরিশাল-৪ (হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জ) আসনে বিএনপির প্রার্থী স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক রাজিব আহসান। তার বিপরীতে জামায়াতের জেলা আমির অধ্যাপক মাওলানা মোহাম্মদ আবদুল জব্বার দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে এবং চরমোনাই পীরের ভাই সৈয়দ ইসাহাক হাতপাখা প্রতীক নিয়ে মাঠে সরব। ত্রিমুখী লড়াইয়ে নারী ভোটারদের ঝোঁকই জয়-পরাজয় নির্ধারণ করবে বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনীতিবিদরা।
সবচেয়ে আলোচিত চিত্র দেখা যাচ্ছে, বরিশাল সদর ৫ ও বরিশাল-৬ বাকেরগঞ্জ আসনে। এই দুই আসনকে ইসলামী আন্দোলনের জন্য মর্যাদার আসন হিসেবে বিবেচনা করা হলেও বাস্তব ভোটের অঙ্ক বলছে ভিন্ন কথা। বরিশাল সদর আসন বিএনপির শক্ত দুর্গ। স্বাধীনতার পর অনুষ্ঠিত অধিকাংশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি এই আসনে জয়ী হয়েছে। শহরভিত্তিক ভোটাররা আদর্শের চেয়ে সংগঠন, পরিচিত নেতৃত্ব ও অতীত অভিজ্ঞতার ওপর বেশি নির্ভর করে। জামায়েত ইসলামীর সমর্থনের কথা বলা হলেও মাঠে তার দৃশ্যমান প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। তাদের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে মূলত বহুমুখী ভোট বিভাজন, প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব এবং নির্বাচনী মাঠে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টার কারণে। পাশাপাশি প্রভাবশালী রাজনৈতিক বলয়ের নিয়ন্ত্রণে থাকা কিছু এলাকা এখনো মুক্ত না হওয়ায় হাতপাখার পক্ষে সমান মাঠ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে উঠছে।
বরিশাল-৬ বাকেরগঞ্জ আসনেও পরিস্থিতি হাতপাখার অনুকূলে নেই। জাতীয় পার্টির স্থানীয় নেতা-কর্মীদের একটি বড় অংশ বিএনপিতে যোগ দেওয়ায় ধানের শীষের প্রার্থী আবুল হোসেন এখানে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন। সংগঠিত ভোট ব্যবস্থাপনা ও স্থানীয় নেতৃত্বের ঘাটতির কারণে ইসলামী আন্দোলন এই আসনে চাপে রয়েছে।