দাঁড়িপাল্লা ও মোমবাতিতে ধানের শীষের মাথাব্যথা

উত্তর চট্টগ্রামের সাতটি আসনের মধ্যে অন্তত পাঁচটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের জমজমাট প্রচারণা এবং অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগে ছড়িয়ে পড়ছে নির্বাচনী উত্তাপ। এ আসনগুলোতে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীরা নানা কারণে ভালো অবস্থানে থাকলেও ভোটের মাঠের নানা সমীকরণে তাদের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন ‘দাঁড়িপাল্লা’ এবং ‘মোমবাতি’ প্রতীকের প্রার্থীরা। এর মধ্যে দুটি আসনে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের দ্বিমুখী ভোটযুদ্ধ এবং তিনটি আসনে বিএনপি, জামায়াত ও সুন্নী জোটের প্রার্থীদের মধ্যে ত্রিমুখী লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। অবশ্য অন্য দুটিতে জয়ের বিষয়ে অনেকটা নির্ভার বিএনপি মনোনীত প্রার্থীরা।

চট্টগ্রামের মোট ১৬টি সংসদীয় আসনের মধ্যে চট্টগ্রাম-১ থেকে চট্টগ্রাম-৭ পর্যন্ত সাতটি আসনই উত্তর চট্টগ্রামে। অতীতের বিভিন্ন নির্বাচনের ফলাফল পর্যালোচনায় দেখা যায়, সব আসনেই বিএনপি মনোনীত প্রার্থীরা এক বা একাধিকবার জয়লাভ করেছেন। এবারের নির্বাচনে বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে থাকা জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের জয়ের কোনো রেকর্ড নেই। অন্যদিকে এবারই প্রথম সুন্নীপন্থি তিনটি দল ঐক্যবদ্ধ হয়ে ‘বৃহত্তর সুন্নী জোট’ নামে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে।

আওয়ামী লীগবিহীন এবারের নির্বাচনে উত্তর চট্টগ্রামের সব আসনে জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী বিএনপি নেতারা। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও বৃহত্তর সুন্নী জোটের নেতারা বলছেন, দেশের জনগণ পরিবর্তন চায়, পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে নিরাপদ বাংলাদেশ দেখতে চায়। তাই আগামী নির্বাচনে নিজেদের প্রার্থীদের পক্ষে রায় প্রত্যাশা করছেন তারা।

একাধিক দল-উপদলে বিভক্ত চট্টগ্রাম-১ (মিরসরাই) আসনের বিএনপি নেতাকর্মীরা। এ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন এমএ জিন্নাহ। ১৯৯৬ সালে খালেদা জিয়াও এ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিজয়ী হন। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে সেখানে দলীয় অন্তর্কোন্দলের কারণে বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে কয়েক দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। পড়েছে একাধিক লাশ। এবারের নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী নুরুল আমিন নিজেদের কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে ব্যাপক প্রচারণায় থাকলেও পাশে পাচ্ছেন না দলের পরিচিত অনেক নেতাকর্মীকে। দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য অবস্থান না নিলেও এলাকার প্রভাবশালী অনেক নেতা ধানের শীষের নির্বাচনী কার্যক্রম থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছেন। বিএনপির এ অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার সুযোগ কাজে লাগাচ্ছেন জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী অ্যাডভোকেট ছাইফুর রহমান। নিজের অবস্থান শক্ত করতে তিনি দাঁড়িপাল্লা নিয়ে রাত-দিন ঘুরছেন বিভিন্ন এলাকায়। সঙ্গে পাচ্ছেন দলের নিবেদিতপ্রাণ কর্মীদের। এ আসনের বিভিন্ন দলের মনোনীত আরও পাঁচ প্রার্থী থাকলেও ভোটের মাঠে সাড়া জাগাতে পারেননি তারা। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের দুই প্রার্থীর মধ্যে ভালো লড়াইয়ের আভাস মিলছে স্থানীয়দের আলাপ-আলোচনায়।

চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনে পে-ুলামের দড়ির মতো দুলতে দুলতে শেষ পর্যন্ত উচ্চ আদালতের রায়ে শর্তসাপেক্ষে টিকে আছে বিএনপি প্রার্থী সারোয়ার আলমগীরের মনোনয়ন। তার মনোনয়ন বাতিলের জন্য শেষ পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে গেছেন জামায়াত মনোনীত প্রার্থী অধ্যক্ষ নুরুল আমীন। দুই প্রার্থীই এখন নির্বাচনী মাঠে রাত-দিন সময় দিচ্ছেন। পাশাপাশি বৃহত্তর সুন্নী জোটের সমর্থনে সেখানে প্রার্থী হয়েছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির চেয়ারম্যান সৈয়দ সাইফুদ্দিন আহমেদ। ধানের শীষ, দাঁড়িপাল্লা আর একতারা এ তিন প্রতীকের প্রচার জমে উঠেছে ভোটের মাঠ। আসনটিতে বাকি পাঁচ প্রার্থীও নিজেদের মতো করে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন।

তিনবারের সংসদ সদস্য মোস্তফা কামাল পাশাকে আবারও চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ) আসনে প্রার্থী করেছে বিএনপি। সেখানে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আমির আলাউদ্দিন সিকদার। সমানতালে নির্বাচনী প্রচার চলছে ধানের শীষ আর দাঁড়িপাল্লার। শেষ পর্যন্ত সন্দ্বীপে ভোটের পাল্লা কোনদিকে ঝুঁকবে, তা দেখা যাবে ১২ ফেব্রুয়ারি।

বিএনপির প্রাথমিক মনোনয়ন তালিকায় বাদ পড়লেও এবারের নির্বাচনে নানা সমীকরণ শেষে চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকু-) আসনে মনোনয়ন পেয়েছেন দলের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা আসলাম চৌধুরী। ঋণখেলাপির অভিযোগ থাকায় ফটিকছড়ির দলীয় প্রার্থীর মতো তার মনোনয়নও শেষ পর্যন্ত উচ্চ আদালতের রায়ে শর্তসাপেক্ষে বৈধতা পেয়েছে। উত্তর চট্টগ্রামের আসনগুলোর মধ্যে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী হিসেবে তার ভোটের মাঠ অনেকটা মসৃণ বলেই মনে করছেন এলাকার লোকজন। আসনটিতে জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন দলের আরও আটজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন। চট্টগ্রাম বিএনপিতে প্রভাবশালী নেতা হিসেবে পরিচিত দলের চট্টগ্রাম বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসন থেকে। জামায়াতের কোনো প্রার্থী নেই এ আসনে। মীর হেলালের পাঁচ প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী মাঠে থাকলেও প্রচার-প্রচারণায় অনেক দূর পিছিয়ে রয়েছেন তারা। এখানে ধানের শীষের নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়া খুব একটা কঠিন হবে না বলেই মনে করছেন স্থানীয় ভোটাররা।

জুলাই আন্দোলনে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে রাউজান (চট্টগ্রাম-৬) এলাকার নাম। এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন নিয়েও ঘটেছে নানা নাটকীয়তা। প্রাথমিকভাবে দলের পক্ষ থেকে গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীকে মনোনয়ন দেওয়া হলেও পরে গোলাম আকবর খোন্দকারকেও একই আসনে মনোনয়ন দেয় বিএনপি। দুইজনই দলীয় প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন কমিশনে মনোনয়নপত্র দাখিল করে বৈধ প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এসে গোলাম আকবর খোন্দকারকে বাদ দিয়ে গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীকে সেখানে দলের প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত চিঠি দেয় বিএনপি। আগেও এ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। আসনটিতে মোট চারজন প্রার্থী থাকলেও বিএনপির সঙ্গে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় উঠে এসেছে ‘মোমবাতি’ প্রতীকের সুন্নী জোটের প্রার্থী মাওলানা ইলিয়াছ নূরী। বিভিন্ন স্থানে মোমবাতির গণসংযোগে বাধা দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে সেখানে। এ আসনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে শাহজাহান মঞ্জু এবং মাতাল প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন নাছির উদ্দিন তালুকদার।

পিতার উত্তরসূরি হিসেবে চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) আসনে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী। আসনটিতে আটজন প্রার্থী থাকলেও ধানের শীষের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. এটিএম রেজাউল করিম এবং সুন্নী জোট সমর্থিত মোমবাতি প্রতীকের প্রার্থী মুহাম্মদ ইকবাল হাছান। তিন প্রার্থীর প্রচারণায় জমে উঠেছে সেখানে নির্বাচনী লড়াই।

এবারের নির্বাচনে উত্তর চট্টগ্রামের সব আসনে ধানের শীষের প্রার্থীরা জয়ী হবেন বলে আশাবাদী বিএনপি নেতারা। চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আবু আহমেদ হাসনাত দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশের মানুষের ভোটের অধিকারের জন্য ১৬ বছর আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে বিএনপি। এ ক্ষেত্রে উত্তর চট্টগ্রামের প্রত্যেকটি উপজেলায় বিএনপি নেতাকর্মীদের ত্যাগ ও অবদান অনস্বীকার্য। স্বৈরাচারের নানা জুলুম-নির্যাতন, মামলার শিকার হয়েও কেউ পিছু হটেনি। স্বৈরাচারমুক্ত নতুন বাংলাদেশে দেশের মানুষ অবশ্যই বিএনপির সেই ত্যাগের প্রতিদান দেবে। তাছাড়া দেশের গণমানুষের আপসহীন নেত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার রাজকীয় বিদায় ও দীর্ঘ নির্বাসন শেষে তারেক রহমানের ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন এ দেশে বিএনপির রাজনীতিকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। আগামী নির্বাচনে এর ইতিবাচক ফল সবাই দেখতে পাবে।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আমির মুহাম্মদ আলাউদ্দিন সিকদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশের পরিবর্তিত পরিবেশে মানুষ ভোট দেওয়ার জন্য মুখিয়ে আছে। অতীতে তারা বিভিন্ন দল ও ব্যক্তিকে ভোট দিয়ে পরীক্ষা করেছে। এবারের নির্বাচনে তারা নতুন করে প্রতিনিধি নির্বাচিত করার সুযোগ পাচ্ছে। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দখলবাজিসহ যেসব কারণে সাধারণ মানুষ ক্ষমতার পরিবর্তন চেয়েছে, এবার সেই পরিবর্তন আনার সুযোগ হাতে এসেছে।

তাই সামন্ততান্ত্রিক রাজনীতির বাইরে এসে এবার মানুষ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ‘১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যে’র প্রার্থীদের পক্ষে রায় দেবেন বলে আমরা আশা করি।

বৃহত্তর সুন্নী জোটভুক্ত দল ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান এম ইব্রাহিম আখতারী দেশ রূপান্তরকে বলেন, মানুষ একটি নিরাপদ দেশ চায়। এ ক্ষেত্রে সুফিবাদী মতাদর্শে বিশ্বাসী বৃহত্তর সুন্নী জোটের প্রার্থীরা এবারের নির্বাচনের মাঠে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। উত্তর চট্টগ্রামের অন্তত তিনটি আসনে জোটের প্রার্থীরা মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকবে বলে জানিয়ে তিনি বলেন, সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে উত্তর চট্টগ্রামের শান্তিপ্রিয় মানুষ অবশ্যই সুন্নী জোটের প্রার্থীদের পক্ষে রায় দেবে।