ভোট প্রদানে ইসলামের নির্দেশনা

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এতে আছে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের যাবতীয় বিষের সুষ্ঠু ও সুন্দর সমাধান। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ভোট একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম, যার দ্বারা নেতৃত্ব নির্বাচন ও রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নির্ধারিত হয়। ইসলামে ভোটের বিষয়ে সুস্পষ্ট ও সুষ্ঠু সমাধান রয়েছে। ইসলামের দৃষ্টিতে ভোট কেবল একটি নাগরিক অধিকার নয়, বরং ভোট একটি গুরুত্বপূর্ণ আমানত। পবিত্র কোরআনে আমানত রক্ষার জন্য জোর দেওয়া হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিয়েছেন আমানতসমূহ তার হকদার ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দাও।’ (সুরা নিসা ৫৮) ভোটের আমানত রক্ষায় ইসলামের নির্দেশনা বিস্তারিত উল্লেখ করা হলো।

ইসলামে ভোটের অবস্থান : মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) জাওয়াহিরুল ফিকহ (২/২৯৩)-এ নিজের গবেষণা তুলে ধরে বলেছেন, ভোটের মধ্যে মোট তিনটি শরয়ি বিষয় রয়েছে। তা উল্লেখ করা হলো।

এক. সাক্ষ্য প্রদান : তিনটি বিষয়ের মধ্যে শাহাদত বা সাক্ষ্যের বিষয়টি মৌলিক। অর্থাৎ সুনির্দিষ্ট কোনো প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার অর্থ হলো, তার ব্যাপারে এ সাক্ষ্য প্রদান করা যে, লোকটি ভালো ও যোগ্য। এখন যদি যথাযথ জায়গায় সিল দিয়ে এ সাক্ষ্য প্রদান করা হয়, তবে সে হবে সত্য সাক্ষী, অন্যথায় হবে মিথ্যা সাক্ষী। আর মিথ্যা সাক্ষ্য যে কত বড় কবিরা গুনাহ ও হারাম কাজ তা কি কারও অজানা রয়েছে? একটি বর্ণনায় হজরত আবু বকর (রা.) বলেন, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) একদা এক জায়গায় হেলান দিয়ে বসা অবস্থায় তিন তিনবার সাহাবিদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, আমি কি তোমাদেরকে কবিরা গুনাহগুলোর মধ্যে বড় কবিরা গুনাহের কথা বলব? সাহাবিরা হ্যাঁ সূচক উত্তর দেওয়ার পর তিনি বললেন, আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করা, পিতা-মাতার অবাধ্যতা (এ দুটি কথা বলার পর তিনি সোজা হয়ে বসলেন) এবং বললেন, শুনে নাও! মিথ্যা সাক্ষ্য অনেক বড় কবিরা গুনাহ। (সহিহ বুখারি ২৬৫৪)

মিথ্যা ও অবাস্তব সাক্ষ্যের ক্ষতি ও খেসারত বলে শেষ করার মতো নয়। হকদার অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া, অযোগ্য ও অপদার্থের উত্থান হয় এতে।  তাই সৎ ও যোগ্যপ্রার্থী দেখে অবশ্যই ভোট দিতে হবে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা সাক্ষ্য গোপন করো না, যে তা গোপন করবে তার অন্তর পাপী।’ (সুরা বাকারা ২৮৩)  অপর আয়াতে বর্ণিত হয়েছে, ‘তোমরা আল্লাহর জন্য সাক্ষ্য প্রদান করো।’ (সুরা তালাক ২)

দুই. সুপারিশ : পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি কোনো ভালো সুপারিশ করে, তার তাতে অংশ থাকে, আর যে ব্যক্তি কোনো মন্দ সুপারিশ করে, তারও তাতে অংশ থাকে। মহান আল্লাহ সব বিষয়ে নজর রাখেন।’ (সুরা নিসা ৮৫) অর্থাৎ আমাদের ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত ব্যক্তি পাঁচ বছর যে মন্দ কাজ করবে, তার দায় আমাদের ওপরও বর্তাবে। যদি ভালো কাজ করে সেটার সওয়াব যেমন পাব, মন্দ কাজ করলে এর গুনার ভাগ পাব।

তিন. প্রতিনিধিত্ব : ভোটার প্রার্থীকে নিজের প্রতিনিধি নিযুক্ত করন। যেহেতু এটি জাতীয় বিষয়, তাই কোনো অযোগ্যকে উকিল বানালে পুরো জাতির অধিকার খর্ব করার পাপ ভোটারের আমলনামায় লেখা হবে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই যাকে তুমি নিয়োগ দেবে সে হবে শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত।’ (সুরা কাসাস ২৬) রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যখন আমানত নষ্ট হয়ে যাবে তখন কেয়ামতের অপেক্ষা করবে। এক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসুল! আমানত কীভাবে নষ্ট হয়ে যাবে? তিনি বলেন, যখন কোনো দায়িত্ব অযোগ্য ব্যক্তির ওপর ন্যস্ত করা হবে, তখনই কেয়ামতের অপেক্ষা করবে।’ (সহিহ বুখারি ৬৪৯৬)

ভোট বর্জন সঠিক নয় : অনেক মানুষকে দেখা যায়, যারা ভোটকে তেমন গুরুত্ব না দিয়ে ভোট বর্জন করে। ভোট বর্জনের ফলে অনেক সময় সমাজের জালেম ও মন্দ শ্রেণি দায়িত্বে চলে আসে, যা ভালো লোকদের ওপর জুলুমের নামান্তর। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর যারা জুলুম করেছে, তোমরা তাদের প্রতি ঝুঁকে পড়ো না। অন্যথায় আগুন তোমাদের স্পর্শ করবে।’ (সুরা হুদ ১১৩)

ভোট কেনাবেচা হারাম : টাকা-পয়সা বা দুনিয়ার অন্য যেকোনো জিনিসের বিনিময়ে ভোট কেনাবেচা করা হারাম। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, হজরত আবদুল্লাহ ইবন আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতা উভয়ের ওপর অভিশাপ।’ (আবু দাউদ ৩৫৮০)

উপরোক্ত আলোচনা পড়ে প্রশ্ন আসতে পারে যে, তাহলে তো বর্তমান সমাজে অধিকাংশ আসনের লোকদের ভোট দেওয়াই সম্ভব হবে না। কারণ, এমন লোক তো পাওয়া যাবে না, যার পক্ষে সাক্ষ্য প্রদান করা যায় এবং এ কারণে অনেকে ভোট দেওয়া থেকে বিরতও থাকেন। এমনকি বহু লোক ভোটার হতেও আগ্রহী হন না। সাধারণ বিবেচনায় এ চিন্তা যুক্তিযুক্ত মনে হলেও এক্ষেত্রে কিন্তু মুদ্রার ভিন্ন পিঠও রয়েছে। তা হচ্ছে, মন্দের ভালো বা তুলনামূলক কম ক্ষতিকে বেছে নেওয়া এবং অধিক ক্ষতি থেকে বাঁচার চেষ্টা করা। বর্তমানে ভোটকে এ দৃষ্টিকোণ থেকেই বিবেচনায় আনতে হবে এবং ভোটের মাধ্যমে অধিক ক্ষতি থেকে বাঁচার চেষ্টা করতে হবে। কোনো আসনে একজন লোককেও যদি সাক্ষ্য ও ভোট দেওয়ার উপযুক্ত মনে না হয়, তবে তাদের মধ্যে যিনি নীতি-নৈতিকতা, চিন্তাচেতনা ও কাজ-কর্মে অন্য প্রার্থীর তুলনায় কম খারাপ, তাকেই ভোট দেওয়া উচিত।

লেখক : মুহাদ্দিস, জামিয়া কাশেফুল উলূম মাদ্রাসা মধুপুর, টাঙ্গাইল