জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে গোপালগঞ্জের তিনটি সংসদীয় আসনে প্রতীক বরাদ্দের পর থেকে দিন-রাত মাঠে কাজ করেছেন প্রার্থী ও তাদের কর্মী-সমর্থকরা। উঠান বৈঠক, মতবিনিময় সভা, গণসংযোগ, সৌজন্য সাক্ষাৎ ও মাইকিংয়ে মুখর ছিল পুরো জেলা। লক্ষ্য ছিল একটাই ভোটারদের মন জয় করা।
এবারের নির্বাচন গোপালগঞ্জবাসীর জন্য ব্যতিক্রমী। দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের (বর্তমান কার্যক্রম নিষিদ্ধ) শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এ জেলায় দলটি এবার নির্বাচনে অংশ নেয়নি। ফলে ভোটের মাঠে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সরব উপস্থিতি দেখা গেছে। জেলার তিনটি আসনে ৩০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এবার কোনো নারী প্রার্থী নেই।
তিনটি আসনের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত গোপালগঞ্জ-৩। টুঙ্গিপাড়া ও কোটালীপাড়া উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসন থেকে বারবার নির্বাচিত হয়ে সরকারপ্রধান হয়েছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগবিহীন এবারের নির্বাচনে আসনটি নিজেদের করে নিতে মরিয়া বিএনপিসহ অন্যান্য দল। স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও দাপটের সঙ্গে প্রচার চালিয়েছেন। এ আসনে আটজন প্রার্থী এর মধ্যে ছয়জন দলীয় ও দুজন স্বতন্ত্র।
এ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি এসএম জিলানী। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ঘোড়া প্রতীকে নির্বাচন করছেন হিন্দু মহাজোটের মহাসচিব গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক।
টুঙ্গিপাড়ার বাসিন্দা মো. রাকিব হোসেন বলেন, ‘এতদিন ব্যানার-বিলবোর্ড আর মাইকিংয়ে পুরো এলাকা মুখর ছিল। প্রার্থীরা বাড়ি বাড়ি এসে ভোট চেয়েছেন। তবে ভোটারদের মধ্যে নানা হিসাব-নিকাশ চলছে। এখানকার মানুষ এতদিন নৌকা মার্কায় ভোট দিয়েছে। এবার সবাই ভোটকেন্দ্রে যাবেন কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে।’
কোটালীপাড়ার বাসিন্দা মোকলেছ আলী জানান, পুরো উপজেলা জুড়েই নির্বাচনমুখী পরিবেশ ছিল। তবে অনেক সাধারণ মানুষের মনে নির্বাচন নিয়ে দ্বিধা রয়ে গেছে। ফলে ভোটারদের কেন্দ্রমুখী করা বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
নারী শ্রমিক হাসনা বেগম বলেন, ‘ভোট দিলেও কাজ করে খেতে হবে, না দিলেও তাই। যাকে ভোট দিতাম, সে নির্বাচনে নেই কারে ভোট দেব?’
গোপালগঞ্জ-৩ আসনের তরুণ ভোটার নাহিদ মোল্লা বলেন, ‘প্রচার শেষ হলেও তরুণদের মধ্যে ভোট নিয়ে আগ্রহ আছে। যাকে সবসময় পাশে পাওয়া যাবে, তাকেই ভোট দেব।’
বিএনপি প্রার্থী এসএম জিলানী বলেন, ‘আমি টুঙ্গিপাড়ার সন্তান। দীর্ঘদিন ধরে মানুষের পাশে আছি। আগের নির্বাচনে মানুষ আমাকে ভোট দেওয়ার সুযোগ পায়নি। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দল থেকে এবার নির্বাচন করছি। ভোটাররা আমাকে এলাকার ছেলে হিসেবে গ্রহণ করেছেন। বিপুল ভোটে জয়ী হব বলে আশা করছি।’
এদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী গোবিন্দ প্রামাণিক ভোটারদের ব্যাপক সমর্থন পেয়েছেন দাবি করে বলেন, ‘ভোটারদের মধ্যে একটা উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। তবে কিছু মানুষের মধ্যে মামলার ভীতি রয়েছে। তাই নির্বাচনের দিন এ বিষয়ে ছাড় দিলে ভোটার উপস্থিতি বাড়বে।’
গোপালগঞ্জ-২ আসনে ১৩ প্রার্থীর মধ্যে ছয়জন স্বতন্ত্র। এ আসনে বিএনপি প্রার্থী কেএম বাবর ও খেলাফত মজলিস প্রার্থী মাওলানা শুয়াইব ইব্রাহিম প্রচারে এগিয়ে থাকলেও, ভোটের আলোচনায় স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এমএইচ খান মঞ্জু ও কামরুজ্জামান ভূঁইয়াকেও এগিয়ে রাখছেন অনেকে। এ ছাড়া হিন্দু ভোটারদের কাছে টানছেন আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী অ্যাডভোকেট উৎপল বিশ্বাস।
নতুন ভোটার রেশমা আক্তার বলেন, ‘এবার প্রথম ভোট দিতে যাচ্ছি। সৎ ও যোগ্য প্রার্থীকে ভোট দিতে চাই।’
চায়ের দোকানি ইসমাইল শেখ বলেন, ‘বাপ-দাদার সময় থেকে আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়ে এসেছি। এবার দল নেই। ভোটকেন্দ্রে যাব কি না ভাবছি, কাকে ভোট দেব সেটাও ঠিক করিনি।’
বিএনপি প্রার্থী কেএম বাবর বলেন, ‘এ আসনে প্রার্থীদের মধ্যে একমাত্র আমিই এলাকায় অবস্থান করছি। মানুষ আমাকে সবসময় কাছে পাবে। ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। নির্বাচিত হব বলে আশাবাদী।’
গোপালগঞ্জ-১ আসনেও ছিল সরব প্রচার। বিএনপি প্রার্থী সেলিমুজ্জামান মোল্লার পাশাপাশি স্বতন্ত্র প্রার্থী আশরাফুল আলম, গণ অধিকার পরিষদের কাবির মিয়া ও জামায়াতে ইসলামীর আব্দুল হামিদ মাঠে সক্রিয় ছিলেন। নয়জন প্রার্থী এ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। কেউ ভোট দিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেছেন, কেউ এখনো সিদ্ধান্তহীন। দীর্ঘদিন নৌকা প্রতীকে অভ্যস্ত ভোটারদের বড় অংশ এবার কাকে সমর্থন করবেন, তা নিয়ে দ্বিধায় রয়েছেন। তবে তরুণ ভোটারদের মধ্যে পরিবর্তনের প্রত্যাশা লক্ষ করা গেছে।
এ আসনের ভোটার শরীফ মিয়া জানান, ভোটকেন্দ্রে যাবেন, তবে সুষ্ঠু নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি তার।
গোপালগঞ্জ-১ আসনের তরুণ ভোটার ইসমাইল মোল্লা বলেন, ‘এ আসনে বেশ কয়েকজন জনপ্রিয় প্রার্থী রয়েছেন। তাদের মধ্যে বিএনপির সেলিমুজ্জামান মোল্লা, সাবেক দুবারের উপজেলা চেয়ারম্যান গণ অধিকার পরিষদের কাবির মিয়া এবং আরেক উপজেলা চেয়ারম্যান আশরাফুল আলম অন্যতম। সবাই নির্বিঘেœ ভোট দিতে পারলে এ তিনজনের মধ্যেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে।’
গোপালগঞ্জ-১ আসনে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে নির্বাচন করছেন আব্দুল হামিদ। তিনি বলেন, ‘বিগত সময়ে মানুষ আওয়ামী লীগ ও বিএনপির চরিত্র সম্পর্কে জেনে গেছে। তাই তারা দুর্নীতি ও চাঁদাবাজিমুক্ত গোপালগঞ্জ গড়তে জামায়াতে ইসলামীকে ভোট দেবে।’
অন্যদিকে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী সেলিমুজ্জামান মোল্লা বলেন, ‘গোপালগঞ্জ-১ আসনের মানুষ বরাবরই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষ। তারা স্বাধীনতাবিরোধী কোনো পক্ষকে ভোট দেবে না। তারা অবশ্যই স্বাধীনতার পক্ষের দল বিএনপিকে ভোট দেবে।’
গোপালগঞ্জের প্রবীণ সাংবাদিক ও জেলা ‘সুশাসনের জন্য নাগরিক’ (সুজন)-এর সভাপতি রবীন্দ্রনাথ অধিকারী বলেন, ‘অতীতের তুলনায় এবার গোপালগঞ্জে ভিন্ন নিরিখে নির্বাচন হচ্ছে। এ জেলার তিনটি আসনে এমপি ছিলেন শেখ হাসিনা, শেখ সেলিম ও ফারুক খান। তাদের একটি বড় সমর্থকগোষ্ঠী রয়েছে। নৌকার সমর্থকদের একটি অংশ কোনোভাবেই ভোটকেন্দ্রে যাবে না। তবে ব্যাপক প্রচারের কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো থাকলে অধিকাংশ সাধারণ মানুষ ভোটকেন্দ্রে যাবে। ভোটারদের কেন্দ্রমুখী করতে বড় ভূমিকা রাখবেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। জেলায় ১১ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন। তাদের কারণে ভোটার উপস্থিতি কিছুটা বাড়তে পারে, তবে তা আগের তুলনায় কম হবে। আগে জাতীয় নির্বাচনে এ জেলায় প্রায় প্রতিটি আসনে ৯৫ থেকে ৯৮ শতাংশ ভোট কাস্টিং দেখানো হয়েছে। এবার তা অর্ধেকে নামতে পারে।
এদিকে গোপালগঞ্জের ৩৯৭টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৩৮৫টিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এজন্য ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিতে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন, সিসি ক্যামেরা স্থাপন ও ম্যাজিস্ট্রেট নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। জেলায় বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ৪০০ পুলিশ সদস্য, ৫০০ সেনাসদস্য ও ৮ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন রয়েছে।
জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মো. আরিফ-উজ-জামান জানিয়েছেন, ভোটাররা নির্বিঘেœ ভোট দিতে পারেন সে লক্ষ্যে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। তিনি সবাইকে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।
সব মিলিয়ে আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনে শেষ মুহূর্তের প্রচার শেষে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যেই ভোট হতে যাচ্ছে। ভোটের দিন কতটা কেন্দ্রমুখী হন ভোটাররা এবং কার হাতে যায় জেলার তিনটি আসনের দায়িত্ব সেটিই এখন দেখার বিষয়।