ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সারা দেশের মতো চট্টগ্রামের ১৬ আসনেও এখন অপেক্ষা ভোট উৎসবের। রাজনৈতিক দলের মনোনীত আর স্বতন্ত্র মিলে চট্টগ্রামের ১১৫ প্রার্থীই নিজেদের মতো করে প্রস্তুতি নিয়েছে ভোটের লড়াইয়ের। এদের মধ্যে কোন ১৬ জন শেষ হাসি হাসবেন তা নির্ধারিত হবে জনতার রায়ে।
প্রতীক বরাদ্দের পর থেকে চট্টগ্রামের ১৬ আসনে নির্বাচন কমিশনের নির্দিষ্ট করে দেওয়া সময় পর্যন্ত প্রত্যেক আসনের প্রার্থী ও তাদের কর্মী-সমর্থকরা নিজেদের পক্ষে ভোট টানতে চালিয়েছেন ক্লান্তিহীন প্রচারণা। নির্বাচনের প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দল বিএনপি ও জামায়াতের পাশাপাশি এবার বৃহত্তর সুন্নী জোট মনোনীত বেশ ক’জন প্রার্থী চট্টগ্রামের বিভিন্ন আসনের প্রচারণায় সাধারণ ভোটারদের দৃষ্টি কেড়েছেন। ভোটের মাঠের প্রচারণায় বিভিন্ন প্রার্থী বক্তৃতার মারপ্যাঁচে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার চেষ্টা করেছেন। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামে বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটলেও কয়েকটি স্থানে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর অফিস ভাঙচুর, সমর্থকদের ওপর হামলা, প্রার্থীর সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও প্রচারণায় বাধা দেওয়ার মতো কিছু ঘটনা ভোট উৎসবের আমেজে কিছুটা হলেও ছেদ পড়েছে।
রিটার্নিং অফিসার কার্যালয় থেকে পাওয়া তথ্যমতে, চট্টগ্রামের মোট ১৬ আসনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র মিলে এবার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী রয়েছেন ১১৫ জন। এর মধ্যে চট্টগ্রাম-১ আসনে ৭ জন, চট্টগ্রাম-২ আসনে ৮ জন, চট্টগ্রাম-৩ আসনে ৪ জন, চট্টগ্রাম-৪ আসনে ৯ জন, চট্টগ্রাম-৫ আসনে ৬ জন, চট্টগ্রাম-৬ আসনে ৪ জন, চট্টগ্রাম-৭ আসনে ৮ জন, চট্টগ্রাম-৮ আসনে ৬ জন, চট্টগ্রাম-৯ আসনে ১০ জন, চট্টগ্রাম-১০ আসনে ৯ জন, চট্টগ্রাম-১১ আসনে ১১ জন, চট্টগ্রাম-১২ আসনে ৮ জন, চট্টগ্রাম-১৩ আসনে ৭ জন, চট্টগ্রাম-১৪ আসনে ৮ জন, চট্টগ্রাম-১৫ আসনে ৩ জন ও চট্টগ্রাম-১৬ আসনে ৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
বিভিন্ন এলাকার ভোটারদের সঙ্গে আলাপে জানা যায়, এবারের নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা ভোটারদের কাছে গিয়ে নানা প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি ছড়িয়েছেন। মানুষের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা ও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রামে নিজেদের ভূমিকাকে বড় করে দেখানোর প্রবণতা লক্ষ করা গেছে অধিকাংশ প্রার্থীর কাছে। কেউ কেউ এলাকায় উন্নয়ন কর্মকা-ে নিজের কিংবা দলের অবদান তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। এদের মধ্যে ১৬ আসনে অন্তত ৩৫ জন প্রার্থী মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকতে পারেন বলে বিভিন্ন এলাকার ভোটারদের সঙ্গে আলাপ আলোচনায় উঠে এসেছে।
প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সাবেক এক মন্ত্রী ও চার সাংসদ
এবারের নির্বাচনে চট্টগ্রামে একজন সাবেক মন্ত্রী ও চারজন সাবেক সংসদ সদস্য প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন। এরা হলেন চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা) আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, চট্টগ্রাম-৩ আসনে বিএনপির মোস্তফা কামাল পাশা, চট্টগ্রাম-৬ আসনে বিএনপির গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, চট্টগ্রাম-১৩ আসনে বিএনপির সরওয়ার জামাল নিজাম ও চট্টগ্রাম-১৫ আসনে জামায়াতে ইসলামীর মুহাম্মদ শাহজাহান চৌধুরী। ভোটের মাঠে এবারও হেভিওয়েট প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে তাদের।
চার নারী প্রার্থী
চট্টগ্রামের তিন আসনে এবার চার নারীপ্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এরা হলেন- চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী জিন্নাত আকতার, চট্টগ্রাম-১০ (ডবলমুরিং-খুলশী) আসনে বাসদ (মার্কসবাদী) এর আসমা আকতার ও ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ-এর সাবিনা খাতুন এবং চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা) আসনে বাসদ (মার্কসবাদী) এর দীপা মজুমদার।
মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকছেন যারা :
প্রচারণা ও জনসমর্থন বিবেচনায় চট্টগ্রামের মোট ১৬টি আসনের মধ্যে এবার কোথাও দ্বিমুখী আবার কোথাও ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনার আভাস মিলছে। চট্টগ্রাম-১ (মিরসরাই) আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন ‘ধানের শীষ’ প্রতীকের প্রার্থী বিএনপির নুরুল আমিন ও জামায়াতে ইসলামী মনোনীত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের অ্যাডভোকেট ছাইফুর রহমান। চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনে বিএনপির প্রার্থী সারোয়ার আলমগীর (ধানের শীষ), জামায়াতে ইসলামীর নুরুল আমীন (দাঁড়িপাল্লা) ও বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির সৈয়দ সাইফুদ্দিন আহমেদ (একতারা) এর মধ্যে ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে। চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ) আসনে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে ধানের শীষের মোস্তফা কামাল পাশা ও দাঁড়িপাল্লার মুহাম্মদ আলাউদ্দিন সিকদারের মধ্যে। চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকু-) আসনে বিএনপি প্রার্থী আসলাম চৌধুরীর মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হলেন জামায়াতে ইসলামীর আনোয়ার সিদ্দিক। চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসনে বিএনপির মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের সঙ্গে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকবেন ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য সমর্থিত বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মুহাম্মদ নাসির উদ্দিন। চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনে বিএনপির গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকছেন সুন্নী জোটের মো. ইলিয়াস নূরী। চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) আসনে বিএনপির হুম্মাম কাদের চৌধুরী, জামায়াতে ইসলামীর ডা. এ টি এম রেজাউল করিম ও ইসলামী ফ্রন্টের অ্যাডভোকেট ইকবাল হাছানের মধ্যে ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে। চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও) আসনেও মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসতে পারেন বিএনপির এরশাদ উল্লাহ, জামায়াতে ইসলামীর মুহাম্মদ আবু নাছের ও ইসলামী ফ্রন্টের মাওলানা হাসান আজহারীর মধ্যে। এই আসনে ১১ দলীয় ঐক্য থেকে এনসিপির জোবাইরুল হাসান আরিফকে মনোনয়ন দেওয়া হলেও দাঁড়িপাল্লা নিয়ে পুরোদমে ভোটের মাঠে রয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী। চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি-বাকলিয়া) আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন ধানের শীষের আবু সুফিয়ান ও দাঁড়িপাল্লার ডা. এ কে এম ফজলুল হক। ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ মনোনীত ‘চেয়ার’ প্রতীকের প্রার্থী মাওলানা ওয়াহেদ মুরাদও শামিল হতে পারেন প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। চট্টগ্রাম-১০ (ডবলমুরিং-খুলশী) আসনে বিএনপির সাঈদ আল নোমানের সঙ্গে জামায়াতের শামসুজ্জামান হেলালী এবং চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা) আসনে বিএনপির আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর শফিউল মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন। চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপির এনামুল হক, জামায়াতে ইসলামীর ফরিদুল আলম ও ইসলামী ফ্রন্টের সৈয়দ এয়ার মোহাম্মদ পেয়ারুর মধ্যে ও চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনে বিএনপির সরওয়ার জামাল নিজাম, ইসলামী ফ্রন্টের এস এম শাহজাহান এবং জামায়াতে ইসলামীর মাহমুদুল হাসানের মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনা রয়েছে। চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ) আসনে এলডিপির ওমর ফারুক ও বিএনপির জসিম উদ্দিন আহমেদের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনে বিএনপির নাজমুল মোস্তফা আমীন ও জামায়াতে ইসলামীর মুহাম্মদ শাহজাহান চৌধুরীর মধ্যে এবং চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসনে বিএনপির মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী, জামায়াতে ইসলামীর জহিরুল ইসলাম ও স্বতন্ত্র প্রার্থী লেয়াকত আলীর মধ্যে ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনা রয়েছে।
এদিকে নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও সুন্দর করতে সার্বিক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে জানিয়ে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং অফিসার মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেছেন, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম জেলায় সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, এবারের নির্বাচন শুধু ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ব্যালট দেওয়া বা ফলাফল জমা দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে উপস্থিতি নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য। ভোটাররা যেন হাসিমুখে ভোট দিয়ে নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারেন, সে ব্যবস্থাই নেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসক জানান, প্রায় ৪০ হাজারের বেশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মাঠে কাজ করছেন। এ ছাড়া প্রায় ১১২ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করছেন। কোন ম্যাজিস্ট্রেট কোন ভোটকেন্দ্রের দায়িত্বে থাকবেন, সে অনুযায়ী বিভিন্ন স্ট্রাইকিং ফোর্স যুক্ত করা হয়েছে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মহড়া শুরু করেছে বলেও জানান তিনি।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য মতে, এবারের নির্বাচনে চট্টগ্রামের ১৬ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৬৬ লাখ ৮২ হাজার ৫১৭ জন। এর মধ্যে ৩৪ লাখ ৮৩ হাজার ৮৮৭ জন পুরুষ, ৩১ লাখ ৯৮ হাজার ৫৬০ জন নারী ও ৭০ জন হিজড়া ভোটার রয়েছেন।