প্রথম ভোটের আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকায় পৌঁছান আমেরিকা প্রবাসী রিসালাত। কিন্তু কেন্দ্রে গিয়ে জানলেন, নিয়মের বেড়াজালে ভোট দিতে পারবেন না। তবু হার মানেননি। দুর্ঘটনায় ভাঙা পা আর ক্লান্তি উপেক্ষা করে অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর দায়িত্ববোধে ভর করে দিনের শেষে হাসলেন রিসালাত। অবশেষে ব্যালটে সিল পড়েছে তারও। গতকাল দুপুর সোয়া ১২টার দিকে ঢাকা-১০ আসনে ধানম-ির কাকলী স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে গিয়ে চোখে পড়ে স্ক্র্যাচে ভর দিয়ে সিঁড়ি ভেঙে তিনতলায় উঠছিলেন রিসালাত। চোখেমুখে তার প্রথমবারের ভোট দেওয়ার আনন্দ। মুহূর্তেই সে আনন্দ ফুটো হওয়া বেলুনের মতো চুপসে গেল, যখন জানলেন তিনি ভোট দিতে পারবেন না। পছন্দের প্রার্থীকে বহু কাক্সিক্ষত ভোট দিতে দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাচনী কর্মকর্তাদের কাছে ধরনা দিয়েও কোনো কাজ না হওয়ায় খানিকটা হতাশ আবার আশা নিয়ে বসেছিলেন তিনি। ঘড়িতে তখন বাজে দুপুর ১টা।
এ সময় দেশ রূপান্তরের সঙ্গে আলাপকালে রিসালাত জানান, প্রবাসী হওয়ায় তিনি পোস্টাল ভোটের আবেদন করেছিলেন। সে পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা থেকে ডাকযোগে পোস্টাল ব্যালট পাঠানো হয় তার কাছে। কিন্তু সেটি পৌঁছাতে দেরি হওয়ায় ভোট না দিয়ে সোজা দেশে চলে এসেছেন। সঙ্গে পোস্টাল ব্যালটটিও এনেছেন। কিন্তু এখন তিনি ভোট দিতে পারছেন না।
সেখানে দায়িত্বরত প্রিসাইডিং অফিসার সৈয়দ শাফকাত মাহমুদ জানান, যারা পোস্টাল ভোটার তাদের এখানে সরাসরি ভোট দেওয়ার কোনো সুযোগ না থাকায় তার ভোট নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। একপর্যায়ে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার সঙ্গে ফোনে ঘটনাটি বলেন প্রিসাইডিং অফিসার। কিন্তু তাতে কাজ না হওয়ায় শেষমেশ রিসালাতকেও পুরো বিষয়টি ভালোভাবে বুঝিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেন শাফকাত মাহমুদ।
এবারের নির্বাচনে সশরীরে এবং পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ডাকযোগে এ দুই উপায়ে ভোট দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়। দুবার যাতে কেউ ভোট দিতে না পারেন, সেজন্য যিনি পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার আবেদন করবেন তার আর সশরীরে ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই।
নিয়ম অনুযায়ী দেশের অভ্যন্তরে যেসব সরকারি কর্মকর্তা নিজ নির্বাচনী এলাকার বাইরে দায়িত্ব পালন করবেন অথবা প্রবাসী যারা আছেন, তাদের আগে থেকেই ডাকযোগে এই পোস্টাল ব্যালট পাঠানো হয়। এরপর তিনি ওই ব্যালটে ভোট দিয়ে সেটি আবার ডাকযোগে সংশ্লিষ্ট নির্বাচন কার্যালয়ে পাঠাবেন। ভোটগ্রহণ (১২ ফেব্রুয়ারি) চলাকালের মধ্যে ফিরতি ব্যালট পৌঁছানোর পরই সেটি গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হবে।
এ বিষয়ে রিসালাতের ভাষ্য হলো, পোস্টাল ব্যালটটি তার কাছে দেরিতে পৌঁছেছে। এরপর তিনি আমেরিকার সংশ্লিষ্ট ডাক বিভাগে যোগাযোগ করে জানতে পারেন, ওই ব্যালটে ভোট দিয়ে তা বাংলাদেশে পাঠালে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পৌঁছানো সম্ভব নয়। সে কারণেই মূলত তিনি ব্যালটটি নিয়ে এসেছেন। যেভাবেই হোক ভোট দিতে চান এমন ইচ্ছে পোষণ করে তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন পর এবার মানুষ নির্বিঘেœ তার নিজের ভোট দিতে পারছেন। নতুন বাংলাদেশ গড়ার এই লাইনে আমিও থাকতে চাই।’
বিষয়টি নিয়ে তখন এই প্রতিবেদক যোগাযোগ করেন ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার ও রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ের সঙ্গে। সেখানকার একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, পোস্টাল ভোট সরাসরি গ্রহণের কোনো সুযোগ নেই। সে ক্ষেত্রে ওই ভোটার স্থানীয় ডাক বিভাগের মাধ্যমে পাঠালে তা গ্রহণ করা হবে।
রিসালাতকে এমন পরামর্শ দেওয়ার পর ভাঙা পা নিয়েই তিনি ছুটে যান ঝিগাতলা পোস্ট অফিসে। সেখান থেকেও প্রথমে তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হলে তিনি আবার এই প্রতিবেদককে ফোন দেন। এ সময় তার ফোনে পোস্ট অফিসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে দেশ রূপান্তর। একপর্যায়ে রিসালাতকে ঢাকার গুলিস্তানে জিপিওতে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। এবার জিপিওতে ছুটে যান তিনি। এরপর সেখানে দায়িত্বরত ডাক বিভাগের কর্মকর্তারা তার পোস্টাল ভোটগ্রহণ করেন। তখন বিকেল পৌনে ৪টা বাজে। ভোট দেওয়া শেষে আবার এই প্রতিবেদককে ফোন করে আনন্দ-উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। যেন বিশ্ব জয় করেছেন তিনি।
সন্ধ্যায় তার সারা দিনের এই কর্মকা- নিয়ে তৈরি একটি রিল (ছোট্ট ভিডিও) পাঠান দেশ রূপান্তরের কাছে। যেখানে দেখা যায়, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে একটি ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ে ভোট দিতে বের হন তিনি। বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করে বলতে থাকেন আমি ভোট দিতে যাচ্ছি। সবাইকে জানান দিতে দিতে রাজ্যের উচ্ছ্বাস নিয়ে যান ভোটকেন্দ্রে।
রিসালাত জানান, যে কারণে ভোট দিতে এই ঝামেলা হলো সেটা যৌক্তিক। তারপরও সবার সহযোগিতায় শেষ পর্যন্ত ভোট দিতে পেরে খুবই ভালো লাগছে। দেশ জুড়ে শান্তিপূর্ণ একটা ভোট অনুষ্ঠানের জন্য অধ্যাপক ইউনূস ও তার সরকারকে ধন্যবাদ জানান। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্ন, তা নির্বাচিত সরকার পূরণ করবে বলে আশা করেন তিনি।