শান্তিপূর্ণ ভোট, অভিযোগ গণনায়

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ভোটগ্রহণ শেষ হয়েছে। ভোট গ্রহণের দিন বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ঘটনা ঘটলেও, গত কয়েকটি নির্বাচনের তুলনায় ছিল শান্তিপূর্ণ। ভোটাররাও উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দিয়েছেন। তবে নির্বাচনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী একে অপরের বিরুদ্ধে কারচুপি, জালিয়াতি এবং কেন্দ্র দখলসহ নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগ তুলেছে। সার্বিক বিষয়ে ইসির ভাষ্য, অতীতের যে কোনো মানদন্ডে অত্যন্ত ভালো ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়েছে।

ভোট শেষে আনুষ্ঠানিক ফলাফল ঘোষণার শুরুতে সার্বিক বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, আমাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী একটা সুন্দর নির্বাচন হলো, আমি বলব না যে এটা একটা পারফেক্ট নির্বাচন। পারফেক্ট নির্বাচন কোথাও হয় না। আমি আমেরিকার নির্বাচন দেখেছি, আপনারাও দেখেছেন। অনেক ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হয়। এখানে যেটুকু হয়েছে, আমার মনে হয়, ইতিহাস যদি আমরা দেখি, যে কোনো মানদ-ে এটা অত্যন্ত ভালো এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ‘জাতিকে আমরা যে ওয়াদা দিয়েছিলাম, সে ওয়াদা আমরা পরিপূর্ণ করতে পেরেছি বলে আমরা মনে করি।’

সাংবিধানিকভাবে প্রতি পাঁচ বছর পরপর নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও মাত্র ২ বছর ১ মাসের মাথায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কোটা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়। জুলাই ও আগস্টের কয়েক সপ্তাহে কয়েক শতাধিক আন্দোলনকারী নিহত হন। এমন পরিস্থিতে ৮ আগস্ট অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন। একই বছরের ২১ নভেম্বর অবসরপ্রাপ্ত সচিব এ এম এম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন হয়। বিএনপি ও সমমনা দলগুলো ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের দাবি জানালে, সরকার ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত নির্বাচন পেছানোর ইঙ্গিত দেয়। এ সময় গণভোট নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়। এ নিয়ে সরকার গত বছরের ১৩ নভেম্বর  জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে অনুষ্ঠিত করার ঘোষণা দেয়। এরপর গত ১১ ডিসেম্বর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ  নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল ৬০টি, এরমধ্যে নির্বাচনে অংশ নিয়েছে ৫০টি। নিবন্ধন স্থগিত থাকায় আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। অন্যদিকে ভোট বয়কটের ডাক দেয় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল ও বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি।

ইসির এক আসনে প্রার্থীর মৃত্যুর হওয়ায় ২৯৯ আসনে গত বৃহস্পতিবার ভোট গ্রহণ হয়। নির্বাচনে ২ হাজার ২৮ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। এর মধ্যে স্বতন্ত্র ছিল ২৭৩ জন। ইসির সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী  বেসরকারিভাবে ২৯৭টি আসনে বিএনপি জয়ী হয়েছে ২১১টি আসনে। আর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ৬৮টি আসনে বিজয়ী হয়েছে। এনসিপি ৬টি ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২টি আসনে বিজয়ী হয়েছে। এছাড়া ইসলামী আন্দোলন, গণ-অধিকার পরিষদ, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি, গণসংহতি আন্দোলন ও খেলাফত মজলিস এই পাঁচটি দল একটি করে আসনে জয়ী হয়েছে। এছাড়া সাতটি আসনে জয়ী হয়েছে স্বতন্ত্র প্রার্থী।

তফসিল ঘোষণায় পর বেশ কয়েকটি জায়াগায় সংঘাত-সংঘর্ষ ও নিহতের ঘটনায় ভোটের পরিবেশ নিয়ে সংশয় তৈরি হয়। নানা শঙ্কার কথা উঠে আসে  গোয়েন্দা রিপোর্টেও। নির্বাচন কমিশন  ৪২,৭৭৯টি কেন্দ্রের মধ্যে অর্ধেক কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে। এসব কেন্দ্রে পরিবেশ সুষ্ঠুু রাখতে নেওয়া হয় বিশেষ পরিকল্পনা। তবে ভোটের দিন বেশ কয়েকটি সংসদীয় আসনে ব্যালটে সিল, জাল ভোট, প্রার্থীর ওপর হামলার চেষ্টা, প্রধান এজেন্টকে মারধর, কেন্দ্রে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে হামলা-সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

গত ২ ফেব্রুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে জানা গেছে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১২ ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২৭৪টি সহিংসতার ঘটনার তথ্য। এর মধ্যে নির্বাচন ঘিরে ভীতি দেখানো বা আক্রমণাত্মক আচরণের ঘটনা ঘটেছে ১৬টি, প্রার্থীর ওপর আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে ১৫টি, হত্যাকা- ঘটেছে পাঁচটি, প্রতিদ্বন্দ্বী সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে ৮৯টি এবং অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহারের ঘটনা ঘটেছে তিনটি। এ ছাড়া হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা ঘটেছে ৯টি, প্রচার কাজে বাধা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে ২৯টি, নির্বাচন সংশ্লিষ্ট অফিস ও প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে ২০টি, অবরোধ ও বিক্ষোভের ঘটনা ঘটেছে ১৭টি, সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে ১টি এবং অন্যান্য ঘটনা ঘটেছে ৭০টি। তবে এসব ঘটনা বিগত তিনটি নির্বাচনের তুলনায় কম ছিল।

 ২০১৮ সালের  একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১০ ডিসেম্বর থেকে ২০১৯ সালের ২ জানুয়ারি পর্যন্ত মোট ৪১৪টি সহিংস ঘটনা ঘটে। এই সময়ে ২৩৪টি ভাঙচুর, ১৫৫টি অগ্নিসংযোগ এবং ১৪৩টি ককটেল বিস্ফোরণ ও গুলি ছোড়ার ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি রক্তপাত ও প্রাণহানি ঘটেছিল। ২০১৩ সালের ২২ ডিসেম্বর থেকে ২০১৪ সালের ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে ৫৩০টি সহিংস ঘটনায় ১১৫ জন নিহত হন। সে সময় আহতের সংখ্যা ছিল ৩১৫ জন।

পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ইসিতে

ভোটে অনিয়মের অভিযোগ তুলে বৃহস্পতিবার রাত ৪টায় ইসিতে এসে ক্ষোভ জানায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের অভিযোগ করে বলেন, ভোট গণনা ও ফলাফল ঘোষণার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নানা ধরনের অনিয়ম করেছেন। বিভিন্ন আসনের ফলাফল পরিবর্তন করা হয়েছে। একটি বিশেষ দলকে সুবিধা দেওয়ার জন্য নির্বাচন কমিশন এবং তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা এসব ষড়যন্ত্র করেছেন।

অন্যদিকে ভোট কারচুপি ও ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ঢাকা-১৪ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সানজিদা ইসলাম তুলি। ইসিতে অভিযোগ জানিয়ে তিনি বলেন, সকাল থেকেই কিছু কেন্দ্রে আমাদের পোলিং এজেন্টদের বসতে দেওয়া হয়নি। এরপর প্রশাসনের একটি অংশ দ্বারা জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা আমাদের কর্মীদের মারধর করেছে।

একই অভিযোগ করেছে ঢাকা-১৬ আসনে বিএনপি মনোনিত প্রার্থী মো. আমিনুল হক। তিনি ইসিতে অভিযোগ জানিয়ে বলেন,প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর বিরুদ্ধে ভোটের আগের রাতে অর্থ বিতরণের ভিডিও প্রমাণ রয়েছে এবং পোলিং এজেন্টদের ভয়ভীতি দেখিয়ে কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ৪০টিরও বেশি কেন্দ্রে এজেন্টদের স্বাক্ষর ছাড়াই ফলাফল শিট প্রস্তুত করা হয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে ভোট গণনার আগেই ফলাফল শিটে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেন, বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া সার্বিকভাবে ভোট ছিল শান্তিপূর্ণ। ভোটগ্রহণকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করেছে। অধিকাংশ কেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিতি ছিল স্বাভাবিক। কোথাও কোথাও বিচ্ছিন্ন অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার খবর পাওয়া গেলেও বড় ধরনের সহিংসতা বা বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটেনি বলে দাবি করেন তিনি।

নির্বাচন পর্যবেক্ষণ সংস্থা ফেমার প্রেসিডেন্ট মুনিরা খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা যেটাকে একটি ক্রেডিবল নির্বাচন বলি, সেখানে কিছু বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, নির্বাচন হতে হবে অবাধ যাতে একজন ভোটার নিজের ভোট নিজে দিতে পারেন। দ্বিতীয়ত, নির্বাচন হতে হবে নিরপেক্ষ অর্থাৎ যারা সরকারে আছেন কিংবা নির্বাচন কমিশনে দায়িত্ব পালন করছেন, তারা যেন তাদের নিরপেক্ষতা বাস্তবে প্রদর্শন করেন। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নির্বাচন সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়া। যেখানে কোনো সন্ত্রাস থাকে না, মানুষ অবাধে ভোট দিতে পারে সেটাকেই আমরা মোটামুটি একটি সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন বলতে পারি।

তিনি বলেন, কোনো দেশেই শতভাগ অভিযোগমুক্ত নির্বাচন দেখা যায় না। কোনো না কোনো অভিযোগ বা অসন্তোষ থাকবেই। কারণ লাখ লাখ মানুষের অংশগ্রহণে নির্বাচন হয়, সেখানে ছোটখাটো সমস্যা হওয়া অস্বাভাবিক নয়। অনেক বড় কর্মযজ্ঞে ছোটখাটো এমন ত্রুটি হতেই পারে। তাই এমন একটি সমস্যার জন্য পুরো নির্বাচনকে অস্বীকার করা ঠিক নয় বলে আমি মনে করি।

মুনিরা খান বলেন, অনেক ক্ষেত্রে কিছু ত্রুটি দেখেছি। কিছু অভিযোগও নজরে এসেছে।  আমরা এর আগে অনেক নির্বাচন দেখেছি। ভালোও হয়েছে, খারাপও হয়েছে, অনেক সময় প্রতারিতও হয়েছি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো ছিল। সবাই ভোট দিতে পেরেছে। নির্বাচন কমিশনও নির্বাচন দিনে কোথাও বড় ধরনের গন্ডগোল হতে দেয়নি। আমি নিজে কয়েকবার গিয়ে ভোটের হার দেখেছি, কর্মকর্তারা আমাকে তথ্য দিয়েছেন কত শতাংশ ভোট পড়েছে তা দেখিয়েছেন। সব মিলিয়ে বিভিন্ন সূচক বিবেচনায় আমি মনে করি এটি মোটামুটি একটি ক্রেডিবল নির্বাচন হয়েছে।

শপথ পড়াচ্ছেন কে : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হয়েছে। এখন নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ কে পড়াবেন তা নিয়ে চলছে আলোচনা ও বিশ্লেষণ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দ্বাদশ জাতীয় সংসদ ভেঙে দিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি। সেই সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগ করেছেন। ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু রয়েছেন কারাগারে। ফলে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা কার কাছে শপথ নেবেন এ নিয়ে চলছে বিশ্লেষণ।

গতকাল নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, ‘আজ-কালের মধ্যে নির্বাচনে বিজয়ীদের গেজেট প্রকাশ হতে পারে। গেজেট প্রকাশের তিন দিনের মধ্যে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পড়াতে হয়। আমরা মনে করি, সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ডেপুটি স্পিকার অথবা স্পিকারের অনুপস্থিতিতে তারা যদি কোনো কারণে শপথ পড়াতে না পারেন, তাহলে তিন দিনের পর চতুর্থ দিন প্রধান নির্বাচন কমিশনার শপথ পাঠ করাবেন। এটা হলো আইনের ভাষা।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের স্পিকারও নেই, ডেপুটি স্পিকারও নেই; না হলে যেটা গেজেট হবে, এর তিন দিনের পর চতুর্থ দিনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার শপথ পড়াবেন এতটুকুই আমরা বুঝি।’

সংসদ সদস্যদের শপথের বিষয়ে সংবিধানের ১৪৮(১) অনুচ্ছেদে বলা আছে ‘তৃতীয় তফসিলে উল্লিখিত যে কোনো পদে নির্বাচিত বা নিযুক্ত ব্যক্তি কার্যভার গ্রহণের পূর্বে উক্ত তফসিল অনুযায়ী শপথগ্রহণ বা ঘোষণা (এই অনুচ্ছেদে ‘শপথ’ বলিয়া অভিহিত) করবেন এবং অনুরূপ শপথপত্রে বা ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর দেবেন। (২) এই সংবিধানের অধীন নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির নিকট শপথগ্রহণ আবশ্যক হলে অনুরূপ ব্যক্তি যেরূপ ব্যক্তি ও স্থান নির্ধারণ করবেন, সেইরূপ ব্যক্তির নিকট সেইরূপ স্থানে শপথগ্রহণ করা যাবে। একই অনুচ্ছেদের (২ক) উপ-অনুচ্ছেদ অনুসারে, ১২৩ অনুচ্ছেদের (৩) দফার অধীন অনুষ্ঠিত সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপিত হওয়ার তারিখ হতে পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে এই সংবিধানের অধীন নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা তদুদ্দেশ্যে অনুরূপ ব্যক্তি কর্তৃক নির্ধারিত অন্য কোনো ব্যক্তি যে কোনো কারণে নির্বাচিত সদস্যদের শপথ পাঠ পরিচালনা করিতে ব্যর্থ হলে বা না করলে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে উক্ত শপথ পাঠ পরিচালনা করবেন, যেন এই সংবিধানের অধীন তিনিই এর জন্য নির্দিষ্ট ব্যক্তি।’

সম্প্রতি আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল সাংবাদিকদের বলেন, ‘স্পিকার (দ্বাদশ সংসদের) পদত্যাগ করেছেন। ডেপুটি স্পিকার জেলে আছেন। ফলে এই অবস্থায় তাদের দ্বারা শপথ গ্রহণ করার কোনো সুযোগ আছে বলে আমি মনে করি না।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের আইনে আছে ওনারা যদি শপথ গ্রহণ করাতে না পারেন, তাহলে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক মনোনীত অর্থাৎ প্রধান উপদেষ্টার পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক মনোনীত ব্যক্তি শপথ গ্রহণ করাবেন।’

আসিফ নজরুল আরও বলেন, ‘তিন দিনের মধ্যে (নির্বাচিত হওয়ার পর) যদি এই শপথটা না হয়, তাহলে প্রধান নির্বাচন কমিশনারও শপথ গ্রহণ করাতে পারবেন।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের সামনে দুটি অপশনই আছে। একটি হচ্ছে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক মনোনীত কোনো ব্যক্তি শপথ গ্রহণ করাতে পারেন। সেটি প্রধান বিচারপতি হতে পারেন আর যদি এটা না হয়, তাহলে আমাদের যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার আছেন, উনিও শপথ গ্রহণ করাবেন।’

অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বেসরকারি ফলে ২৯৯ আসনের মধ্যে ২০৯টিতে জয় পেয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। তবে জয় পেলেও মামলা-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে আরও দুটি আসনে (চট্টগ্রাম-২ ও ৪) ফল ঘোষণা স্থগিত থাকবে।

নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী পেয়েছে ৬৮টি আসন। অন্যান্য দলের মধ্যে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৬টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ১টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২টি, খেলাফত মজলিস ১টি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) ১টি, গণ অধিকার পরিষদ ১টি, গণসংহতি আন্দোলন ১টি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ৭টি আসনে জয়ী হয়েছেন। সব মিলিয়ে ২৯৯টি আসনের মধ্যে ২৯৭টি আসনে গেজেট প্রকাশ করবে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।

ভোটের হার ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ।

নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানান, সারা দেশের ২৯৯টি আসনে শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। প্রাথমিক গণনা শেষে কমিশন নিশ্চিত হয়েছে, এবারের নির্বাচনে ভোটদানের হার ছিল ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ।

তিনি আরও জানান, বৃহস্পতিবার সকাল ৭টা ৩০ মিনিট থেকে বিকেল ৪টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণ চলে। বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতির খবর পাওয়া যায়নি।

দুটি আসনের ফল স্থগিত : নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে ভোটগ্রহণ হয়। এর মধ্যে ২৯৭টি আসনের ফল চূড়ান্ত করে গেজেট আকারে প্রকাশের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। চট্টগ্রাম-২ ও চট্টগ্রাম-৪ আসনের ফল মামলা-সংক্রান্ত কারণে স্থগিত থাকবে বলে আগেই জানিয়েছিল কমিশন। এ ছাড়া শেরপুর-৩ আসনে এক প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে আগেই ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়েছিল।