আজ বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। পোশাক আর উপহারের দোকানগুলোতে লাল রঙের আধিপত্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভালোবাসার বার্তা, ফুলের দোকানে বসন্তের ফুলের সমারোহ এক কথায় সব মিলিয়ে ভালোবাসা দিবস যেন কেবল তারিখ নয়, বরং মনের অনুভূতিতে রঙ লাগানো এক উৎসব। এই দিনটি শুধু ভালোবাসার মানুষদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; ভালোবাসা ছড়িয়ে পড়ে পরিবার, বন্ধু, সহকর্মীদের মধ্যে। লিখেছেন মোহসীনা লাইজু
বদলে যাওয়া উৎসব
একটা সময় পর্যন্ত ভালোবাসা দিবস মানেই ছিল কার্ড, চকলেট, লাল গোলাপ আর লাজুক হাসি বিনিময়। কিন্তু এখন সময় বদলেছে, বদলেছে উদযাপনের ধরনও। এখন ভালোবাসা দিবস মানে একসঙ্গে সময় কাটানো, যত্নের সঙ্গে পরিকল্পনা করা, প্রিয়জনকে বুঝিয়ে বলা ‘তুমি আমার জীবন জুড়ে আছো’, কারও কাছে ক্যান্ডেল লাউট ডিনার ডেট, কারও কাছে ঘরোয়া আয়োজন, কারও কাছে প্রিয় মানুষের সঙ্গে হাত ধরে ঘুরতে যাওয়া। তবে যেভাবেই উদযাপন হোক না কেন, ভালোবাসা দিবস হলো সম্পর্কের গভীরতা আর অনুভূতির প্রকাশের দিন।
সাজপোশাকে ভালোবাসার রঙ
ভালোবাসা দিবস এলেই সাজপোশাকে আসে বিশেষ রঙের ছোঁয়া। লাল, গোলাপি, সাদা, হলুদ এই রঙগুলো যেন ভালোবাসা দিবসের অঘোষিত রঙ। এখন ট্রেন্ড শুধু লালেই আটকে নেই। প্যাস্টেল শেড, মেরুন, বেইজ কিংবা ফ্লোরাল প্রিন্টও জায়গা করে নিচ্ছে ভালোবাসার দিবসের পোশাকের তালিকায়। এ বছর ভালোবাসা দিবসের পোশাকে থাকবে সোনালি, কমলা, কোরাল রেড। সন্ধ্যা কিংবা রাতের দাওয়াতের জন্য মেরুন রঙটি বেছে নেওয়া যাবে। কালো রঙের সঙ্গে জুটি হয়ে থাকছে লাল। পোশাকে প্রাধান্য পেয়েছে সুতি, ভিসকস, লিনেন।
সালোয়ার-কামিজ এবার একটু কমই দেখা যাবে। তবে কুর্তি, টপে করা হয়েছে নিরীক্ষাধর্মী কাজ। উঁচু-নিচু কাটের পাশাপাশি পোশাকে দেখা যাবে ফোলানো ভাব। নিচের অংশে বর্ডার লাইনে চিকন নকশায় থাকছে নানা সুতার কাজ। মিলিয়ে প্রিয়জনের পোশাক তৈরি করা হয়েছে। হাতায় ফ্রিল নকশা, কোনো কোনোটি আবার সোজা কাট। প্রিন্টে
থাকবে ফুলেল নকশা। একটু ঠান্ডা ঠান্ডা থাকলে পাতলা নকশার হাতাওয়ালা কিংবা হাতাবিহীন সোয়েটারও নিতে পারেন। সেটা পোশাকের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়ারও সুযোগ রয়েছে।
এই দিন নিজেকে কেউ কেউ ফিউশনে সাজাতে চাইবেন। সেসব যুগলের পছন্দের তালিকায় থাকতে পারে শার্ট, যেটা দুজনই পরতে পারবেন। শার্টগুলোর রঙ নকশা এক হলেও, প্যাটার্নে থাকছে কিছুটা ভিন্নতা। ফিউশনধর্মী এই পোশাকগুলোতে রঙ থাকবে একটু গাঢ়। গাঢ় জলপাই, মেরুন, কালো রঙ ভালোবাসার দিনটাকে আরও জমকালো করে তুলবে।
সাজে ব্যক্তিত্বের প্রকাশ
ভালোবাসা দিবসের সাজটা একটু স্পেশাল হবে। পোশাকের সঙ্গে মিলিয়েই সাজতে হয়। দেশীয় পোশাকে একরকম সাজ আবার ওয়েস্টার্ন পোশাকে একরকম। ভালোবাসা দিবসের সাজ যে লাল হতে হয় তা বোধ হয় বদলে গেছে। প্রায় সবাই লাল রঙের পোশাক পরেন। ভালোবাসা ব্যাপারটার সঙ্গে গাঢ় নীল কিংবা শুভ্র সাদাও খুব ভালোভাবে মানিয়ে যায়। যারা নিজেকে একটু ব্যতিক্রম সাজাতে চান তারা নীল বা সাদা এই দুটো রঙ রাখতে পারেন পোশাক নির্বাচনের তালিকায়। পোশাক নির্বাচনের পরের ধাপই হলো সাজগোজ বা মেকআপ। প্রথমেই মাথায় রাখতে হবে পোশাকের রঙ কী সেটা এবং আপনি সকালে বের হচ্ছেন না সন্ধ্যায়। সকালে বের হলে খুব হালকা বেজ মেকআপ নিয়ে স্কিন কালার বা ন্যুড কালার কিংবা অন্য যেকোনো হালকা কালারের লিপস্টিক ব্যবহার করে আপনার মেকআপ শেষ করতে পারেন। যারা মেকআপ করতে অভ্যস্ত না তারা বেজ মেকআপ নিতে প্রথমে মুখ ভালোভাবে পরিষ্কার করে একটু টোনার লাগিয়ে নিন। তারপর প্যানস্টিক মুখে, ঘাড়ে, চোখের নিচে খুব ভালো করে হাত দিয়ে চেপে চেপে নিন। যদি কারও মুখে ব্রণের দাগ বা গর্ত থাকে সেখানে একটু বেশি পরিমাণে লাগিয়ে নিয়ে হাত দিয়ে ভালো করে মিশিয়ে নিন। তারপর একটু সময় দিতে হবে, মেকআপটা যাতে ত্বকে মিশে ভালোভাবে। এরপর পাফটা একটু ভিজিয়ে নিয়ে প্যান কেক লাগিয়ে নিন আপনার গায়ের রঙের শেডের সঙ্গে মিলিয়ে। যদি আপনি চান মেকআপটা একটু দীর্ঘস্থায়ী হোক এবং
থাকুক অনেকক্ষণ, তাহলে রেগুলার ফেস পাওডার ভালো করে মুখে, ঘাড়ে বুলিয়ে নিন। যাদের খুব বেশি তৈলাক্ত ত্বক তাদের ক্ষেত্রে এটা খুব কাজে দেয়। এবার চোখে শেড লাগিয়ে আইলাইনার বা কাজল দিয়ে সুন্দর করে চোখটা এঁকে নিন। আইব্রো পেন দিয়ে আইব্রো একটু শেপ করে নিন। গালের মাঝ বরাবর থেকে কান পর্যন্ত খুব হালকা শেডের কোনো ব্লাশ অন দিয়ে নিন। এতে করে মুখটা দেখতে শার্প লাগবে। এবার লিপস্টিক পরার পালা। দিন হলে হালকা কোনো কালার আর সন্ধ্যা হলে ডিপ কোনো কালারের লিপস্টিক আপনি পরতে পারেন। মুখের সাজ তো হয়ে গেল এখন বাকি রইল চুল। আপনি সালোয়ার-কামিজ বা গাউন পরলে চুল খোলা রাখতে পারেন। এতে ক্যাজুয়াল একটা লুক আসবে। আর যদি শাড়ি পরেন তাহলে হাতখোঁপা বা কর্লি করে একপাশে গুঁজে দিতে পারেন একটি বা দুটি লাল গোলাপ। আর হ্যাঁ, শাড়ি পরলে কপালে টিপও পরতে পারেন।
ভিন্ন মাত্রায় উপহার
ভালোবাসা দিবসের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো উপহার। কিন্তু উপহার মানেই যে দামি কিছু হতে হবে এটা ভুল ধারণা । তরুণদের পছন্দ বদলেছে। এখন মানুষ বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে অনুভূতিকে। একটি হাতে লেখা চিঠি, পুরনো কোনো ছবির অ্যালবাম, নিজের হাতে বানানো কিছু এগুলো অনেক সময় দামি উপহারের চেয়েও বেশি মূল্যবান হয়ে ওঠে। কারণ এসব উপহারের ভেতরে থাকে সময়, যত্ন আর আন্তরিকতা। অবশ্য আধুনিক জীবনে জনপ্রিয় কিছু উপহারও আছে ফুল, চকলেট, পারফিউম, বই, গিফট বক্স, পোশাক। তবে এগুলো দেওয়ার সময় যদি প্রিয়জনের পছন্দ-অপছন্দ মাথায় রাখা যায়, তাহলে উপহার হয়ে ওঠে আরও অর্থবহ।
উপহারের ভাবনায় সম্পর্ক
ভালোবাসা দিবস এখন আর শুধু প্রেমিক-প্রেমিকার দিন নয়। বাবা-মা, ভাইবোন, বন্ধু সবাই এই দিনের অংশ। তাই উপহার বাছাইও হয় সম্পর্ক অনুযায়ী। প্রেমের সম্পর্কে উপহার হয় একটু ব্যক্তিগত, যেখানে থাকে স্মৃতি আর ভবিষ্যতের ইঙ্গিত। বন্ধুর জন্য উপহার হয় মজার, হালকা, আনন্দের। পরিবারের জন্য উপহার হয় যতেœর যা বলে দেয়, ‘তোমাদের কথা আমি ভাবি।’ এই দিনটি আসলে মানুষকে ভাবতে শেখায়, আমার জীবনে কারা গুরুত্বপূর্ণ এবং আমি তাদের জন্য কী করতে পারি।
ভালোবাসা দিবস মানে লাল গোলাপ, সুন্দর সাজ, পছন্দের উপহার এসব তো আছেই। কিন্তু তার চেয়েও বড় বিষয় হলো অনুভূতির আদান-প্রদান। একটি হাসি, একটি আলিঙ্গন, একটি নির্ভরতার হাত এসবই ভালোবাসার প্রকৃত ভাষা। এই ভালোবাসা দিবসে সাজ হোক নিজের মতো, উপহার হোক হৃদয় থেকে আর উদযাপন হোক আন্তরিকতায় ভরা। কারণ শেষ পর্যন্ত ভালোবাসা কোনো দিনের মধ্যে বন্দি থাকে না, ভালোবাসা বেঁচে থাকে মানুষে মানুষে, প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ।