ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণ, অন্তর্ভুক্তি ও প্রতিযোগিতামূলক হয়েছে বলে এক পর্যবেক্ষণে তুলে ধরে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। এই নির্বাচনে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর কোনো উপাদান দেখা যায়নি বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নির্বাচনে ২১ শতাংশ জাল ভোটের তথ্যটি সঠিক নয় বলেও জানিয়েছে টিআইবি।
‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রক্রিয়া ও হলফনামাভিত্তিক পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক টিআইবির প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল সোমবার রাজধানীর ধানম-িতে টিআইবির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এই প্রতিবেদন তুলে ধরা হয়েছে। টিআইবি জানিয়েছে, ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে প্রতিনিধিত্বশীল নমুনায়ন পদ্ধতি ব্যবহার করে দৈবচয়নের ভিত্তিতে ৭০টি আসন বেছে নিয়ে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনের ওপর সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। নির্বাচন গ্রহণযোগ্য মাত্রায় অংশগ্রহণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়েছে বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘এই নির্বাচনে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর কোনো উপাদান দেখা যায়নি। পেছনে কোনো ইঞ্জিনিয়ারিং হতে পারে তবে আমাদের বিবেচনায় আমরা কোনো ইঞ্জিনিয়ারিং পাইনি। টিআইবির দৃষ্টিতে মোটামুটিভাবে গ্রহণযোগ্য, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হয়েছে।’
১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। সার্বিক নির্বাচনী পরিবেশ বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ৯৯ শতাংশ প্রার্থীই ৫৮টি আচরণবিধির কোনো না কোনোটি লঙ্ঘন করেছেন। নির্বাচনের দিনেও কেন্দ্রগুলোয় স্বতন্ত্র নারীপ্রার্থীর ওপর হামলা, কেন্দ্রের বাইরে ভয়ভীতি প্রদর্শন, স্বতন্ত্র প্রার্থীর পোলিং এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া, কিছু কেন্দ্রে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর এজেন্টদের ঢুকতে না দেওয়া, বানোয়াট নিয়মের অজুহাতে ভোটারদের হেনস্তা করা, একজনের ভোট অন্যজন প্রদান, ভোটের সময় টাকা বিতরণের মতো ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া ভোটার তালিকার সঙ্গে নাম ও ছবি না মেলায় অনেক ভোটার কেন্দ্রে গেলেও ভোট দিতে পারেননি।
নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার বিষয়ে টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই ৭০ আসনে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে ৪৫টি, প্রতিপক্ষের ভোটার কর্মী-সমর্থকদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা ঘটেছে ৩৪টি, বাড়িঘর-অফিসে হামলা হয়েছে ১৮টি, একই দলের বিদ্রোহীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে ১৬টি।
সার্বিক পর্যবেক্ষণে টিআইবি বলেছে, শুরুতে তুলনামূলক সুস্থ প্রতিযোগিতার লক্ষণ দেখা গেলেও, ক্রমান্বয়ে রাজনৈতিক দল এবং প্রার্থীরা নির্বাচনী কার্যক্রমের পুরনো রাজনৈতিক চর্চা বজায় রেখেছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘নির্বাচনী সহিংসতার পাশাপাশি পতিত কর্তৃত্ববাদী শক্তির ঘোষিত নির্বাচনবিরোধী তৎপরতার ফলে অস্থিতিশীলতা এবং ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগ বিরাজ করেছে। আগের মতো রাজনৈতিক দল এবং প্রার্থীরা নির্বাচনে অর্থ, ধর্ম ও পেশি, পুরুষতান্ত্রিক ও গরিষ্ঠতান্ত্রিক শক্তির ব্যবহার শুধু অব্যাহতই রাখেননি, বরং বিশেষ করে অর্থ ও ধর্মের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
পর্যবেক্ষণে অনিয়মের বিষয়ে বলা হয়, ‘অবাধ, নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ এবং সবার জন্য সমান প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি এবং শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনে নির্বাচন কমিশন ও অন্যান্য অংশীজনের প্রয়াস ও সক্রিয়তা দৃশ্যমান ছিল। তবে, রাজনৈতিক সংঘাত এবং নির্বাচনে আচরণবিধি লঙ্ঘন, অনিয়ম ও অসুস্থ প্রতিযোগিতা প্রতিরোধে কমিশনের ওপর আরোপিত ক্ষমতার কার্যকর প্রয়োগ অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব হয়নি। ৯৯ শতাংশ প্রার্থী আচরণবিধির ৫৮টি বিষয়ের মধ্যে কোনো না কোনোটি লঙ্ঘন করেছেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, অনলাইন ও অফলাইন প্রচরণাসহ নির্বাচনের প্রায় প্রতিটি স্তরে দল এবং প্রার্থীরা আচরণবিধির ব্যাপক লঙ্ঘনসহ বিবিধ অনিয়ম করলেও কমিশনের সীমাবদ্ধতার কারণে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়নি। যার ফলে নির্বাচনে সব দল এবং প্রার্থীর জন্য প্রতিযোগিতার সমান ক্ষেত্র এবং সব শ্রেণির ভোটারদের জন্য পরিপূর্ণ সম-অধিকারভিত্তিক সুস্থ, নিরপেক্ষ ও নিরাপদ নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এক সাংবাদিক। জবাবে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘তৃণমূল পর্যায়ে অনেক জায়গায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে ধানের শীষ বা দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিতে বলেছিলেন। তারা ভোট দিয়েছেন। আওয়ামী লীগের শতভাগ নেতাকর্মী ভোট দেননি এটা বলার সুযোগ নেই। আমাদের দৃষ্টিতে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য মাত্রায় সুষ্ঠু, প্রতিযোগিতামূলক, অংশগ্রহণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়েছে।’
জাল ভোট বিভ্রান্তি ও টিআইরি ব্যাখ্যা : সংবাদ সম্মেলন চলাকালে নির্বাচনে জাল ভোট পড়া নিয়ে একটি পরিসংখ্যান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। বিতর্ক সৃষ্টি হয়। বিষয়টি ব্যাখ্য করে সংস্থাটি জানিয়েছে, নির্বাচনে ২১ শতাংশ জাল ভোট পড়ার যে তথ্যটি প্রচার করা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ সঠিক নয়। মূলত ভুল ব্যাখ্যার কারণে এই বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে। টিআইবি জানায়, তারা দৈবচয়নের ভিত্তিতে দেশের ৭০টি আসনের ওপর তথ্য সংগ্রহ করে একটি গবেষণা চালিয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, পর্যবেক্ষণ করা এই ৭০টি আসনের মধ্যে ২১.৪ শতাংশ আসনে জাল ভোট পড়েছে। অর্থাৎ, মোট ১৫টি (গাণিতিক হিসেবে ১৪.৯৮ শতাংশ) আসনে জাল ভোটের তথ্য পাওয়া গেছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভ্রান্তির বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সংস্থাটি পরিষ্কার করে যে, ২১ শতাংশ ‘ভোট’ নয়, বরং ২১.৪ শতাংশ ‘আসনে’ অনিয়ম হয়েছে। এসব আসনে এক বা একাধিক জাল ভোট পড়ার তথ্য পাওয়া গেছে, যার মানে এই নয় যে মোট প্রদত্ত ভোটের বড় একটি অংশ জাল ছিল।
এ বিষয়ে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের পর্যবেক্ষণ করা ৭০টি আসনের মধ্যে ২১ শতাংশ আসনে জাল ভোট পড়ার ঘটনা পরিলক্ষিত হয়েছে। তবে সেটা কয়েকটি ভোট। ধরুন কোনো একটি আসনে ১ লাখ ভোট ছিল সেখান ১ বা একাধিক জাল ভোট পড়েছে। সামগ্রিক ভোটের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই।’
প্রতিবেদন তৈরির সঙ্গে যুক্ত টিআইবির জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো মো. মাহফুজুল হক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত আসনে একটাও ঘটনা হলে সেটা রেকর্ড করা হয়েছে। এটা আসনের পার্সেন্টেজ, ভোটের পার্সেন্টেজ না।