ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ দ্বিপক্ষীয় আলোচনা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সম্মেলনে যোগ দিতে ভারতে পৌঁছেছেন। তিন দিনের এই সফরের শুরুতে গত সোমবার মধ্যরাতে তিনি ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানী মুম্বাইয়ে অবতরণ করেন। মঙ্গলবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও মাখোঁর মধ্যে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা হবে। মোদির কার্যালয় থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানানো হয়, দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক জোরদার করাই এই আলোচনার লক্ষ্য। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ভারত ও ফ্রান্সের কৌশলগত অংশীদারত্ব মজবুত এবং নতুন ও উদীয়মান বিভিন্ন ক্ষেত্রে তা সম্প্রসারণ করার ওপর জোর দেওয়া হবে।
এ ছাড়া আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দুই নেতা মতবিনিময় করবেন এবং ‘ভারত-ফ্রান্স উদ্ভাবন বর্ষ’ বা ইয়ার অব ইনোভেশন-এর উদ্বোধন করবেন। তবে মাখোঁর ভারত সফরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে ১১৪টি বাড়তি রাফাল জেট কেনার চুক্তি। আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে টেকসই ও কার্যকর যুদ্ধাস্ত্রের অন্যতম হলো ফরাসি দ’সল্ট রাফাল জেট বিমান। তবে গত বছরের মে মাসে পাকিস্তানের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত যুদ্ধে প্রথমবারের মতো ভূপাতিত হয় ভারতীয় বিমানবাহিনীর রাফাল। পাকিস্তানের কাছে থাকা চীনে নির্মিত জে-১০ যুদ্ধবিমানের হাতে পরাস্ত হতে হয় ফ্রান্সের গৌরব ‘রাফালকে’। তবে ওই ঘটনার পরও রাফালে ভরসা হারায়নি নয়াদিল্লি।
জানা গেছে, আরও শতাধিক রাফাল জেট কিনতে যাচ্ছেন মোদি। গতকাল মুম্বাইয়ে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এদিকে, ফ্রান্সের সঙ্গে যৌথভাবে হ্যামার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করবে ভারত। গতকাল মঙ্গলবার ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য কর্নাটকের রাজধানী ব্যাঙ্গালুরুতে দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং এবং ফ্রান্সের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ক্যাথরিন ভাউত্রিনের মধ্যে এ সংক্রান্ত একটি চুক্তি স্বাক্ষর হবে।
ভারতের জাতীয় দৈনিক দ্য হিন্দু এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, চুক্তি স্বাক্ষর হলে সামনের দিনগুলোয় ‘ফিফটি-ফিফটি’ অংশীদারত্বের ভিত্তিতে এই ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করবে ভারতীয় কোম্পানি ভারত ইলেকট্রনিক্স লিমিটেড এবং ফরাসি কোম্পানি সাফরান ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড ডিফেন্স।
২০১৭ সালে ক্ষমতাগ্রহণের পর এটা ফরাসি নেতার চতুর্থ ভারত সফর। দুই নেতার বৈঠকে বিলিয়ন ডলারের যুদ্ধবিমান কেনার চুক্তি হতে পারে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি। এই চুক্তির মাধ্যমে নয়াদিল্লির সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা চালাবে প্যারিস।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাখোঁকে ‘মাই ডিয়ার ফ্রেন্ড’ আখ্যা দিয়ে মোদি বলেন, তিনি দুই দেশের ‘দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে চান। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে দুই নেতার মধ্যে বৈঠক হয়। তিনিও এক্সে পোস্ট করে মোদিকে ‘ডিয়ার ফ্রেন্ড’ আখ্যা দেন। মাখোঁ বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক আরও গভীর হবে। গত সপ্তাহে নয়াদিল্লি নিশ্চিত করে, তারা রাফাল জেটের একটি বড় অর্ডার দিতে যাচ্ছে। এর আগে জানুয়ারিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি সই করে নয়াদিল্লি। বিশ্লেষকরা একে মাইলফলক চুক্তি হিসেবে অভিহিত করেন।
মোদির সঙ্গে বৈঠকের আগে শাবানা আজমি ও মনোজ বাজপাঈসহ কয়েকজন বলিউড তারকার সঙ্গে দেখা করেন মাখোঁ ও তার স্ত্রী। পাশাপাশি, ২০০৮ সালের সন্ত্রাসী হামলায় নিহতদের স্মরণে আয়োজিত অনুষ্ঠানেও যোগ দেন তিনি। মোদি এবং মাখোঁর আলোচনা হয়েছে মূলত দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করার ক্ষেত্রে। নতুন এবং উদীয়মান ক্ষেত্রগুলোয় দুই দেশ কীভাবে আরও সফল এবং অংশীদারত্বের মাধ্যমে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে তার ওপরও বিশেষ আলোকপাত করা হয় বৈঠকে। পাশাপাশি, প্রধানমন্ত্রী মোদি এবং প্রেসিডেন্ট মাখোঁ আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর ওপর নিজেদের মতবিনিময় করেন।
১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতার পরপরই ভারত ও ফ্রান্সের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়। ২০২৪ সালে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ১৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। সম্প্রতি দুই দেশের মধ্যে বিশেষ করে প্রতিরক্ষা খাতে সম্পর্ক জোরদার হয়েছে। গত এক দশক ধরে সামরিক উপকরণের উৎস হিসেবে রাশিয়ার বিকল্প খুঁজছে ভারত। সে উদ্যোগের অংশ হিসেবে ফ্রান্স থেকে রাফাল জেট কেনা হয়।
গত সপ্তাহে ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে জানা যায়, রাফাল জেট কেনার প্রস্তাব ‘অনুমোদন’ পেয়েছে। জেটগুলোর বেশিরভাগই ভারতে নির্মাণ করা হবে। ১১৪টি রাফাল জেটের দাম ধরা হয়েছে ৩০ বিলিয়ন ইউরো (৩৫ বিলিয়ন ডলার)।
প্যারিসভিত্তিক সংগঠন সায়েন্সেস প্রো সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ-এর ভারত বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টোফ জ্যাফ্রেলট এই চুক্তিকে ‘শতাব্দীর সেরা চুক্তি’ আখ্যা দেন। ইতিমধ্যে প্যারিসের কাছ থেকে ৬২টি রাফাল জেট কিনেছে ভারত। প্রস্তাবিত চুক্তি অনুযায়ী জেট কেনা হলে ভারতের বিমানবহরে মোট ১৭৪টি রাফাল জেট থাকবে। বর্তমানে ভারতীয় বিমানবাহিনীতে ৩৬টি রাফাল জেট আছে। ফরাসি প্রেসিডেন্টের কার্যালয় থেকে এই চুক্তিকে ‘ঐতিহাসিক’ বলা হয়েছে।
গত এক দশকে ভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা অংশীদারদের অন্যতম ফ্রান্স। মোদি-মাখোঁ বৈঠকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি ও এর প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতিতে তৈরি হওয়া অস্থিরতা নিয়ে আলোচনা হতে পারে বলে জানান গেছে। পাশাপাশি, এ অঞ্চলে চীনের প্রভাবও থাকবে আলোচনায়।
হ্যামার ক্ষেপণাস্ত্র চুক্তি
প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং এবং ফ্রান্সের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ক্যাথরিন ভাউত্রিনের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি চুক্তির মাধ্যমে যৌথভাবে হ্যামার ক্ষেপণাস্ত্র বানাবে ভারত ও ফ্রান্স। গতকাল মঙ্গলবার ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য কর্নাটকের রাজধানী ব্যাঙ্গালুরুতে ১০ বছর মেয়াদি ‘হ্যামার মিসাইল’ যৌথ উৎপাদনের বিষয়সহ এই প্রতিরক্ষা চুক্তি করে দুই দেশ। হ্যামার ফ্রান্সের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি একটি স্মার্ট এয়ার টু সারফেস ক্ষেপণাস্ত্র। ১৯৯৭ সাল থেকে এই ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে ফরাসি কোম্পানি সাফরান ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড ডিফেন্স।
হ্যামার ক্ষেপণাস্ত্রের ‘হ্যামার’ নামটি মূলত হাইলি অ্যাগিল মডিউলার মিউনিশন এক্সটেন্ডেড রেঞ্জ-এর সংক্ষিপ্ত রূপ। এটি যুদ্ধবিমান, বিশেষ করে ফ্রান্সের সর্বাধুনিক যুদ্ধবিমান রাফাল থেকে নিক্ষেপযোগ্য। মূলত রাফাল জেটে ব্যবহারের জন্যই এই ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা হয়। স্মার্ট এবং প্রিসিশন-গাইডেড হ্যামার ক্ষেপণাস্ত্র সর্বোচ্চ ৭০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁত এবং নির্ভুলভাবে আঘাত হানতে সক্ষম।
চলতি ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুর দিকে ১১৪টি রাফাল যুদ্ধবিমান কেনার জন্য ফ্রান্সের সঙ্গে চুক্তি করেছে ভারত। সেই চুক্তির শর্ত অনুসারে, চলতি ২০২৬ সাল শেষ হওয়ার আগেই ১৮টি রাফাল তৈরি অবস্থায় (ফ্লাইং কন্ডিশনে) পাবে ভারত। বাকিগুলোও তৈরি হবে ভারতেই এবং তাতে ভারতীয় প্রযুক্তিরও ব্যবহার করা হবে সেই বিমানগুলোয়।
২০২০ সালে প্রথম ফ্রান্সের কাছ থেকে রাফাল কেনে ভারত। এই রাফালগুলোতে ব্যবহারের জন্যই ফ্রান্সের সঙ্গে হ্যামার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির চুক্তি করছে ভারত। চুক্তিতে আরও বলা হয়েছে, অদূর ভবিষ্যতে সামরিক খাতের বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের বন্ধুত্ব ও সহযোগিতাপূর্ণ সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করা হবে।