ইরানের সঙ্গে বড় ধরনের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার খুব কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র এমনটাই জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস। টাইমস অব ইসরায়েলের প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, পরিস্থিতি দ্রুত সামরিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে। অ্যাক্সিওসের তথ্য অনুযায়ী, পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ হলে ইরানে কয়েক সপ্তাহ ধরে সামরিক অভিযান চালাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকটি সূত্রের বরাতে অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, সম্ভাব্য এ অভিযান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ উদ্যোগ হতে পারে। গত জুনে ইসরায়েলের নেতৃত্বে ১২ দিনের সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্র এতে যোগ দিয়েছিল এবং ইরানের ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছিল। নতুন অভিযান হলে সেটির পরিধি আরও বড় হতে পারে এবং ইরানের শাসনব্যবস্থার জন্য আরও বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। যদিও সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দ্বিতীয় দফার পরোক্ষ পরমাণু আলোচনা শেষ হয়েছে। আলোচনা শেষে এক ইতিবাচক বার্তা দিয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, জেনেভা বৈঠকে তেহরান ও ওয়াশিংটন চুক্তির ‘মূল নীতিগুলোর’ বিষয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার মাঝেই হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে মহড়া চালিয়েছে ইরানও। পারস্য উপসাগরে মোতায়েন করা যুক্তরাষ্ট্রের রণতরীগুলো ‘সমুদ্রের তলদেশে ডুবিয়ে’ দেওয়া হতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি।
জানুয়ারিতে ইরানে বিক্ষোভ দমনে হাজারো মানুষের মৃত্যু হলে ট্রাম্প সামরিক অভিযানের খুব কাছাকাছি চলে গিয়েছিলেন। পরে প্রশাসন দ্বিমুখী কৌশল নেয় একদিকে পারমাণবিক আলোচনা, অন্যদিকে বড় ধরনের সামরিক প্রস্তুতি। মিডল ইস্ট মনিটরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার ট্রাম্পের উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনার ও স্টিভ উইটকফ জেনেভায় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে তিন ঘণ্টা বৈঠক করেন। উভয়পক্ষ কিছু অগ্রগতির কথা বললেও মতপার্থক্য এখনো রয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স বলেন, কিছু ক্ষেত্রে আলোচনা ইতিবাচক হলেও ইরান এখনো প্রেসিডেন্টের নির্ধারিত ‘লালরেখা’ মানতে প্রস্তুত নয়। জেনেভায় দ্বিতীয় দফা পারমাণবিক আলোচনা শুরুর দিনই যুক্তরাষ্ট্রকে কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। তুরস্কভিত্তিক সংবাদ সংস্থা আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি মন্তব্য করেছেন পারস্য উপসাগরে মোতায়েন করা মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো চাইলে ‘সমুদ্রের তলদেশে ডুবিয়ে দেওয়া’ সম্ভব।
অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি দ্রুত বাড়ছে। বর্তমানে সেখানে দুটি বিমানবাহী রণতরী, এক ডজন যুদ্ধজাহাজ, শত শত যুদ্ধবিমান ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন রয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, ১৫০টিরও বেশি সামরিক কার্গো ফ্লাইটে অস্ত্র ও গোলাবারুদ পাঠানো হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে। গত ২৪ ঘণ্টায় এফ-৩৫, এফ-২২ ও এফ-১৬সহ আরও ৫০টি যুদ্ধবিমান পাঠানো হয়েছে। সূত্রগুলো বলছে, ইরান পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বড় ধরনের ছাড় না দিলে ট্রাম্প পিছু হটবেন না।
টাইমস অব ইসরায়েল জানিয়েছে, ইসরায়েলি কর্মকর্তারাও কয়েক দিনের মধ্যেই যুদ্ধ শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে কিছু সূত্র বলছে, সিদ্ধান্ত নিতে আরও কয়েক সপ্তাহ লাগতে পারে। সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম অ্যাক্সিওসকে বলেছেন, হামলা কয়েক সপ্তাহ পরে শুরু হতে পারে। তবে ট্রাম্পের এক উপদেষ্টা দাবি করেছেন, সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা খুবই বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরানকে দুই সপ্তাহের মধ্যে বিস্তারিত প্রস্তাব দিতে বলা হয়েছে। এর আগে গত বছরের ১৯ জুন হোয়াইট হাউজ একইভাবে দুই সপ্তাহ সময় দিয়েছিল। তিন দিন পর তারা ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’ শুরু করে। অ্যাক্সিওস দাবি করেছে, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক অগ্রগতির সম্ভাবনা শেষ এমন কোনো প্রমাণ নেই। কিন্তু আসন্ন যুদ্ধের প্রমাণ দিন দিন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
এদিকে, লাইভ ফায়ার মহড়ার জন্য গত মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালি সাময়িকভাবে বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পরোক্ষ আলোচনার মাঝে এ ধরনের পদক্ষেপ, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বাড়াতে এবং নতুন কোনো যুদ্ধের পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। প্রথমবারের মতো এ গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জলপথ বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে ইরান। হরমুজ প্রণালি বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেলের পরিবহন পথ। তবে প্রণালিটি সত্যিই বন্ধ হয়েছে কি না, তাৎক্ষণিকভাবে তা জানা যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা শুরুর পর ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, ইরানি বাহিনী হরমুজ প্রণালির দিকে লাইভ ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে এবং ‘নিরাপত্তা ও সামুদ্রিক উদ্বেগ’-এর কারণে কয়েক ঘণ্টার জন্য এটি বন্ধ থাকবে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি সতর্ক করে বলেছেন, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাবাহিনীও কখনো এমন ধাক্কা খেতে পারে, যা থেকে সে আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না।