বেসরকারি খাতের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিপুল পরিমাণ বকেয়া বিল পরিশোধ না হলে রমজান ও গ্রীষ্ম মৌসুমে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ার আশঙ্কার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশন (বিপ্পা)। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর বনানীর একটি হোটেলে বিদ্যুৎ খাতের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় সংগঠনটির নেতারা এসব কথা বলেন।
সংগঠনটি বলছে, গত বছর জুলাই মাসের পর থেকে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো নিয়মিত বিল পাচ্ছে না। নতুন সরকারের সময়ে উৎপাদন চালু রাখতে তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে বকেয়ার কারণে জ্বালানি তেল আমদানির জন্য ব্যাংকে ঋণপত্র খুলতে না পারায় কেন্দ্র পরিচালনায় বড় সংকট তৈরি হয়েছে।
বিপ্পার পক্ষ থেকে বলা হয়, বিদ্যুৎ সরবরাহ অব্যাহত রাখার সদিচ্ছা থাকলেও এত বিপুল বকেয়া রেখে বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে কেন্দ্র চালানো সম্ভব নয়। বিশেষ করে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ার সময় সামনে রেখে এ পরিস্থিতি উদ্বেগজনক।
সংগঠনের সূচনা বক্তব্যে জানানো হয়, ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব পড়ার পর থেকেই বিদ্যুৎ বিলের বকেয়া বাড়তে শুরু করে। সে সময় দুই দফা বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে আগের সরকার আংশিকভাবে বকেয়া পরিশোধ করে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে চার মাসের বকেয়া ছিল। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত আগের বকেয়াসহ কিছু বিল পরিশোধ করা হলে বকেয়া কমে তিন মাসে নেমে আসে। তবে এরপর আবার পরিস্থিতি অবনতির দিকে যায়।
এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিপ্পা সভাপতি কেএম রেজাউল হাসনাত বলেন, জুলাইয়ের পর থেকে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। উল্টো বিল না দিয়ে জরিমানা আদায়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তার অভিযোগ, ইচ্ছাকৃতভাবেই এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে, যাতে নতুন সরকারের সময়ে লোডশেডিং নিয়ে সংকট তৈরি হয়। একই সঙ্গে দেশি ও বিদেশি বিদ্যুৎ কোম্পানির ক্ষেত্রে ভিন্ন আচরণ করা হচ্ছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রেখে সরকারকে চাপ দেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বকেয়ার কারণে কেন্দ্র চালানো না গেলে সেটাকে নতুন সরকারের কাছে ‘ব্ল্যাকমেইল’ মনে হওয়াটা স্বাভাবিক। তবে বাস্তবে এটি কোনো চাপ সৃষ্টির কৌশল নয়। উৎপাদন চালু রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে। শুধু বাস্তব সমস্যাগুলো সরকারকে জানানো হচ্ছে ব্যাংকে ঋণপত্র খুলতে না পারায় জ্বালানি তেল কেনা যাচ্ছে না, এটাই মূল সংকট।
বিপ্পা জানায়, গত বুধবার সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদা ছিল ১৩ হাজার মেগাওয়াট, যা গত কয়েক বছরে এ সময় দেখা যায়নি। এর অর্থ, আসন্ন গ্রীষ্মে বিদ্যুতের চাহিদা আরও বাড়তে পারে। অথচ বকেয়া বিল নিয়ে উদ্যোক্তাদের সঙ্গে আগের সরকার কোনো কার্যকর আলোচনা করেনি। সংগঠনটি মনে করিয়ে দেয়, দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৫০ শতাংশ আসে বেসরকারি খাত থেকে। তারা নতুন সরকারের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করতে আগ্রহী হলেও বাস্তবতা অনুযায়ী ‘সাধ ও সাধ্যের’ সমন্বয় জরুরি।
চুক্তি অনুযায়ী দেশের সব বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কেনে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। নিয়ম অনুসারে একটি কেন্দ্র বছরে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ সময় মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য উৎপাদন বন্ধ রাখতে পারে। এর বাইরে কেন্দ্র বন্ধ থাকলে ক্যাপাসিটি পেমেন্ট পাওয়া যায় না, বরং জরিমানার বিধান রয়েছে। তবে বকেয়া বিল জমে যাওয়ায় অনেক কেন্দ্র চালাতে না পারলেও ২০২২ সালের জুলাই থেকে বন্ধ সময় হিসাব না করেই বিল পরিশোধ করেছিল পিডিবি। পরে অন্তর্বর্তী সরকার এসে জরিমানা আদায়ের সিদ্ধান্ত নেয়।
পিডিবি ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ের জরিমানা ও অতিরিক্ত ক্যাপাসিটি পেমেন্ট সুদসহ আদায়ের উদ্যোগ নিতে চলতি বছর ২ ফেব্রুয়ারি সিদ্ধান্ত নেয়।
এ প্রসঙ্গে বিপ্পার সাবেক সভাপতি ইমরান করিম বলেন, জরিমানা আদায় আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হতে হবে। বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ না করায় আর্থিক সক্ষমতা হারিয়ে কেন্দ্র চালানো সম্ভব হয়নি। এ অবস্থায় জরিমানা আদায় আইনসম্মত নয়। বিষয়টির একটি গঠনমূলক সমাধান প্রয়োজন। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনায় বসে নতুন সরকার চাইলে এ সংকটের সমাধান করতে পারে।