যে জিম্বাবুয়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের গত আসরে কোয়ালিফাই করতে পারেনি, সেই দলটি বিশ্বকাপে এসে অস্ট্রেলিয়া, শ্রীলঙ্কা, আয়ারল্যান্ডের গ্রুপে অপরাজিত থেকে সুপার এইটে উঠে গেল! খর্বশক্তির দলটির এই নবযাত্রার পেছনের অন্যতম নায়ক ব্রায়ান বেনেট। চলতি আসরে এখন পর্যন্ত কোনো বোলার তাকে আউট করতে পারেনি। ব্রায়ানের এই যাত্রার শুরু হয়েছিল হারারের দক্ষিণ-পূর্বে গোরোমোনজির একটি বাড়ির পেছনের নেট থেকে।
ছোটবেলার স্মৃতি তুলে ধরে বেনেট এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমার মনে আছে, তিন বা চার বছর বয়সে প্রথমবার ব্যাট হাতে নেই। আমার এক যমজ ভাই আর এক ছোট ভাই আছে। বাবা বাড়িতেই নেট বানিয়ে দিয়েছিলেন। তাই স্কুল থেকে ফিরলেই অনুশীলন করতে পারতাম। যমজ ভাই থাকায় আমি কখনো একা ছিলাম না। সবসময় খেলার সঙ্গী পেতাম।’
ব্রায়ান ও তার যমজ ভাই ডেভিডের একজন ব্যাট করতেন, অন্যজন করতেন বোলিং। প্রতিদিন স্কুলের পর, প্রতি সপ্তাহান্তে চলত অনুশীলন। তাদের বাবা কেলি নিজেও ইয়ং মাশোনাল্যান্ডের হয়ে ক্লাব ক্রিকেট খেলেছেন। তিনি বেশ কয়েকটি প্রথম-শ্রেণির ম্যাচ খেলেছিলেন অ্যান্ডি ফ্লাওয়ারদের প্রজন্মের ক্রিকেটারদের সঙ্গে। তাই পরিবারের পেশা ব্লুবেরি চাষ হলেও ক্রিকেট ছিল রক্তে মিশে।
চলতি বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত ৩ ম্যাচে ২ ফিফটিতে ১৭৫ রান করা বেনেট বলেন, ‘বাবা জাতীয় দলে খেলেননি, কিন্তু অনূর্ধ্ব-১৯ দলে ছিলেন এবং ক্লাব ক্রিকেট খেলেছেন। তাই ক্রিকেট সব সময়ই আমাদের পরিবারের অংশ ছিল।’
কোভিড মহামারিতে কলেজজীবনের শেষ দুই বছর প্রায় নষ্ট হয়ে যায়। কোনো টুর্নামেন্ট কিংবা কোনো ম্যাচ ছিল না। পরিস্থিতি সামাল দিতে ২০২২ সালে বেনেট এক বছরের জন্য দক্ষিণ আফ্রিকার কিংসউড কলেজে যান। যমজ ভাই ডেভিডও সঙ্গে ছিলেন। সেখানে প্রথম ম্যাচেই তিনি ১০০ বলে ১৫১ রানের ইনিংস খেলে প্রতিপক্ষকে বিধ্বস্ত করেন। ব্রায়ানের কোচ ইয়ান টিঙ্কার বলেন, ‘দুঃখজনকভাবে কোভিডের কারণে ব্রায়ানের হাইস্কুলের শেষ বছরগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।’
জিম্বাবুয়ের সাবেক পেসার ও ব্রায়ানের কোচ অ্যান্ড্রু বার্চ স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘সে প্রতিপক্ষকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছিল। ছোট বলেও ভয় পেত না। তার কাজের নীতি অবিশ্বাস্য, আর সফল হওয়ার তাড়নাই আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে। অনেক ছেলের প্রতিভা থাকে, কিন্তু সেই তাড়না থাকে না। ওরমাঝে শুরু থেকেই ছিল। অনেক তরুণ ক্রিকেট খুব বেশি দেখে না, বা দেখলেও শুধু টি–টোয়েন্টি দেখে। কিন্তু ব্রায়ান আর তার পরিবার সত্যিই ক্রিকেট দেখে। এটা তাদের ভেতরে গেঁথে আছে।’
২০২২ অনূর্ধ্ব–১৯ বিশ্বকাপে দুই ভাই একসঙ্গে খেলেন। পরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দ্রুত উত্থান ঘটে ব্রায়ানের। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে টি–টোয়েন্টি অভিষেক হয়। এক বছরের মধ্যে তিন সংস্করণেই সুযোগ পেয়ে যান এবং প্রতিটিতে হাঁকান সেঞ্চুরি। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। দক্ষিণ আফ্রিকার কিংবদন্তি এবি ডি ভিলিয়ার্স ও ভারতের বিরাট কোহলি তার আদর্শ। আইপিএলে তার পছন্দের দল রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু।
নিজের ব্যাটিং দর্শন নিয়ে বেনেট বলেন, ‘আপনার রক্ষণ শক্ত হলে খুব বেশি কিছু আপনাকে সমস্যায় ফেলতে পারবে না। আমাদের কোচ জাস্টিন সব সময় বলেন, “বোলারের সেরা বল যদি ঠেকাতে পার, তাহলে তোমাকে আউট করা কঠিন।” তাই শক্ত ডিফেন্স, ধৈর্য, তারপর খারাপ বল মারাই মূল কথা। আমি শুধু চাই জিম্বাবুয়েকে আবার খুব প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ দলে পরিণত করতে, বড় দলগুলোর সঙ্গে লড়তে, এবং প্রতিটি বিশ্বকাপে অংশ নিতে।’
অনুশীলনের বাইরে সময় পেলে ব্রায়ান চলে যান রুয়ায় অবস্থিত পারিবারিক খামারে। এছাড়া তিনি গলফ খেলেন। গোরোমোনজির বাড়িতে ব্রায়ানের বাবার বানানো সেই পুরোনো নেট এখনো আছে। যমজ ভাই ডেভিড অবশ্য ক্রিকেট থেকে দূরে। তিনি এখন তামাক চাষ করেন, আর ব্রায়ান চাষ করেন রান। এবারের বিশ্বকাপে এখনো কোনো বোলার তাকে আউট করতে পারেনি।