ফল বাজারে অস্বস্তি মাংসে কিছুটা স্বস্তি

রাজধানীর হাতিরপুল কাঁচা বাজারে রাস্তার পাশেই আল্লাহর দান ফল স্টোর। খেজুর আর মাল্টা কিনতে দোকানে আসেন মাঝবয়সী মো. মনসুর আলী। বেশ কয়েকটি ফলের দাম জানতে চাইতেই দোকানের কর্মচারীর সঙ্গেই তর্কাতর্কিতে জড়িয়ে পড়েন। দরকষাকষির পর এক কেজি সাদা আপেল (আফ্রিকান) আর আধা কেজি খেজুর কিনতেই গুনতে হয়েছে ৮২০ টাকা। অর্থাৎ রমজান শুরু হতেই দেশি-বিদেশি ফলের দাম অস্বাভাবিক বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে খেজুর, মাল্টা ও আপেলের দাম। কলা, বরই, পেঁপে, পেয়ারা, তরমুজসহ দেশীয় ফলেও দিতে হচ্ছে বেশি দাম। 

গতকাল শুক্রবার রাজধানীর হাতিরপুল, বড় মগবাজার ও মোহাম্মদপুর কাঁচাবাজার ও কারওয়ান বাজার ঘুরে দোকানগুলোতে টাঙানো দামের তালিকা থেকে দেখা যায়, মাল্টা, আঙুর, আপেল ও খেজুরের চাহিদা ব্যাপক বেড়েছে। ইফতারের আগেই প্রতিটি দোকানে ভিড় ছিল। ভোক্তারা প্রতিকেজি মাল্টা ও কমলা কিনছেন ৩২০- ৩৬০ টাকায়। এছাড়া সাদা ও লাল আপেল ৩৬০-৪০০ টাকা, সবুজ আপেল ৪০০-৪৫০ টাকা, সবুজ আঙুর ৪৩০-৪৫০ টাকা, লাল আঙুর ৫২০-৫৫০ টাকা ও নাশপাতি ৪৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রতিকেজি ডালিম বিক্রি হচ্ছে ৫০০-৬০০ টাকায়।

সুপার মার্কেটগুলোতে দাম আরেকটু বেশি। চাইনিজ কমলার কেজি ৪৪৫ টাকা, কিনো কমলা ৪০০ টাকা, সবুজ আঙুর ৫০০, লাল অস্ট্রেলিয়ান আঙুর ৬৯৫ টাকা, লাল আপেল ৪৪০, সবুজ আপেল ৪৭৫, মাল্টা ৩২৫ টাকা, নাশপাতি ৪১০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, পাইকারি বাজারে ১ পেটি কমলার দাম কয়েক হাজার টাকা বেড়েছে। ফলে বিদেশি ফলের বাজারে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। ক্রেতারা জানিয়েছেন, সপ্তাহের ফলের দাম ৫০ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। কোনো কোনো ফল ১৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

মনসুর আলীর দেশ রূপান্তরকে বলেন,‘রোজার সুযোগে লাভ (মুনাফা) করার হিড়িক বেড়ে যায়। টাঙিয়ে দেওয়া দামের তালিকা দেখে উত্তেজিত হয়ে গিয়েছিলাম। প্রতিটি পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে।’ 

এই মূল্যবৃদ্ধির জন্য সরবরাহ ব্যবস্থায় জটিলতাকে দায়ী করছেন অনেক ব্যবসায়ী। তারা বলেন, আমদানি করা ফলের চালান বন্দরে আটকা পড়ে আছে। এই সরবরাহ ঘাটতি ও রমজানের অতিরিক্ত চাহিদাই দাম বৃদ্ধির কারণ।

মোহাম্মদপুর বাজারের খুচরা বিক্রেতা সোহেল রানার ভাষ্য, রমজান এলেই ক্রেতা বাড়ে। সেই সুযোগটাই নেন পাইকারি ব্যবসায়ীরা। দাম বাড়িয়ে দেন। আমরাও বেশি দামে কিনে আনি।’ 

রমজানে সবচেয়ে বেশি চাহিদা থাকে খেজুরের। সেই খেজুরের দামই এবার সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। মানভেদে কেজিপ্রতি ১০০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা। অনেক দোকানে গত সপ্তাহের তুলনায় কেজিতে ১০০ থেকে ১২০ টাকা বেশি দাম চাওয়া হচ্ছে। খেজুর মানভেদে কেজি ৬০০-১৫০০ টাকা। কম দামের ‘জাহিদি’ খেজুরের দাম মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ী আরাফাত হোসেন বলেন, ‘চাহিদা অনেক, কিন্তু সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। মানুষের চাহিদার তুলনায় পণ্যের জোগান যখন অনেক কমে যায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই দাম বেড়ে যায়।’

এদিকে দেশে উৎপাদিত ফলের বাজারেও স্বস্তি নেই। কলার ডজনপ্রতি দাম বেড়েছে ৩০ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত। সাগর কলা এখন ডজনে ১৫০ টাকা, যা কয়েকদিন আগেও ছিল ১০০ থেকে ১২০ টাকা। শবরি কলা ১৫০ থেকে ১৮০ টাকা এবং বাংলা কলা ১০০ থেকে ১৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

বিক্রেতারা বলছেন, দেশীয় ফলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে কলার দাম। পাশাপাশি বরই কেজিতে ১২০ থেকে ২০০ টাকা, পেয়ারা ১০০ থেকে ১৫০ টাকা এবং দেশি পেঁপে ৮০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত দুই থেকে তিন দিনের ব্যবধানে এসব ফলের দাম ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

বাজারে মৌসুমের আগেই দেখা যায় তরমুজ। কেজিপ্রতি ৮০ থেকে ১০০ টাকা চাওয়া হচ্ছে। আনারস প্রতিটি ৬০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ক্রেতারা বলছেন, মৌসুমের শুরুতেই এমন দাম অস্বাভাবিক। তবে বিক্রেতাদের দাবি, সরবরাহ সীমিত থাকায় দাম কিছুটা বেশি।

এখনো শতকের ওপরে লেবু-শসা-বেগুন

রোজা শুরুর আগেই সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছিল লেবু, শসা ও বেগুনের দাম। এসব পণ্যের দাম দুই থেকে পাঁচ গুণ বেড়েছিল। বাজারে যেসব লেবু সাধারণত ২০ থেকে ৩০ টাকা হালিতে পাওয়া যেত, রোজার আগের দিন প্রতিহালি লেবু কিনতে হয়েছে ১০০ থেকে ১২০ টাকায়। এখনো সেই দামেই বিক্রি হচ্ছে। এদিকে, বেগুনের দাম কেজিপ্রতি বেড়েছে ৪০ টাকা পর্যন্ত। রোজার তিন চারদিন আগে এ পণ্যের দাম ছিল ৬০ থেকে ৮০ টাকা, গতকাল ভোক্তাদের কিনতে হয়েছে ১০০ থেকে ১২০ টাকা দরে।

মোহাম্মদপুর টাউন হল কাঁচাবাজারের নিয়মিত ক্রেতা বেসরকারি চাকরিজীবী সাদরুল হাসান বলেন, ‘রোজা এলেই দাম বাড়ে। এটা স্বাভাবিক হয়ে গেছে। সরবরাহ থাকুক আর না থাকুকÑ দাম বাড়বেই।’ 

এই বাজরের ব্যবসায়ী সামশুল হক বলেন, গত প্রায় এক সপ্তাহ ধরে রোজার জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব সবজির দাম বেড়েছে। আড়ত থেকে আমাদের বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। তাই লাভ রেখে পাইকারি দাম থেকে কেজিতে ১০-২০ টাকা লাভে বিক্রি করছি।

ডিম-মাংসে কিছুটা স্বস্তি

সপ্তাহ দুই আগে বাজারে প্রতিকেজি ব্রয়লার মুরগির দাম ছিল ১৬০-১৭০ টাকা। প্রথম রমজানে হঠাৎ দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থাৎ গত বুধবার বিক্রি হয়েছিল ২০০-২২০ টাকায়। তবে গতকাল কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা কমে ১৯০-২০০ টাকায় বিক্রি হয়। এদিকে, সোনালি ১০ থেকে ১৫ টাকা কমে ৩০০ থেকে ৩২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ডিমের দামও স্থিতিশীল। প্রতি ডজন ডিম ১১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বিক্রেতারা বলছেন, ডিমের সরবরাহ ঠিক থাকায় আপাতত দাম বাড়েনি।

এদিকে খাসির মাংসের দাম অপরিবর্তিত থাকলেও গরুর মাংসের দাম বেড়েছে। এক কেজি গরুর মাংস কিনতে গুনতে হচ্ছে ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকা পর্যন্ত, যা রোজার আগে ছিল ৭৫০ থেকে ৭৮০ টাকা। তবে আগের মতোই খাসির মাংস প্রতিকেজি ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ী ইফতা চৌধুরী বলেন, রোজার শুরুতে অনেকে বেশি পরিমাণে পণ্য কেনেন। চাহিদা বাড়ে, সঙ্গে দামও বাড়ে। তবে রোজা আরও এগোলে চাহিদা কমে যাবে, তখন দামও কমে যাবে।