পটুয়াখালীতে দেশের নবম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন কর্মচাঞ্চল্য। সদর উপজেলার আউলিয়াপুর ইউনিয়নের পঁচাকোড়ালিয়া গ্রামে ৪১০ দশমিক ৭৮ একর জমির ওপর নির্মাণাধীন এ ইপিজেডকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা আকাশসম। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি বদলে দেবে দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক মানচিত্র।
ইপিজেড সংশ্লিষ্টরা জানান, ইতিমধ্যে ইপিজেড এলাকার বালুভরাটের কাজ শেষ হয়েছে। দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে ড্রেনেজ, সড়ক, ভবনসহ অবকাঠামো নির্মাণ। চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে প্লট বরাদ্দ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সম্পূর্ণ দেশীয় অর্থায়নে নির্মিত এ প্রকল্পে ব্যয় হচ্ছে ১ হাজার ৪৪২ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকার দিচ্ছে এক হাজার ১০৫ কোটি টাকা, যা মোট ব্যয়ের প্রায় ৪০ শতাংশ। বাকি প্রায় ৩৩৮ কোটি টাকা আসছে বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষের (বেপজা) নিজস্ব তহবিল থেকে।
এ ইপিজেডে থাকবে ৩০৬টি শিল্প প্লট, আধুনিক কারখানা ও আবাসিক ভবন, বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র, কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি), সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (এসটিপি), হেলিপ্যাডসহ নানা সুবিধা। চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে প্লট বরাদ্দ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। প্লট বরাদ্দের পরপরই শিল্পকারখানা স্থাপনের কাজ শুরু করতে পারবেন বিনিয়োগকারীরা।
পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর পটুয়াখালীতে ইপিজেড স্থাপনের উদ্যোগ নেয় বেপজা। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ২০২৩ সালের ২৯ আগস্ট এ প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়। পদ্মা সেতু চালুর ফলে রাজধানীর সঙ্গে পটুয়াখালীর সরাসরি সড়ক যোগাযোগ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি পায়রা সমুদ্র বন্দর ও প্রস্তাবিত রেল যোগাযোগ এ অঞ্চলের সম্ভাবনাকে আরও জোরালো করেছে।
বিদ্যুৎ সুবিধার দিক থেকেও এগিয়ে পটুয়াখালী অঞ্চল। কলাপাড়ায় ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি তাপবিদুু্যুৎ কেন্দ্র চালু রয়েছে। একই ক্ষমতার আরেকটি কেন্দ্র নির্মাণাধীন। বরগুনার তালতলীতে ৩০৭ মেগাওয়াট এবং বাগেরহাটের রামপালেও বিদু্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। এসব বিষয় বিবেচনায় রেখেই পটুয়াখালীতে ইপিজেড স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে বেপজা।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বরিশাল বিভাগের প্রথম এই ইপিজেড আয়তনে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম। প্রকল্পের মেয়াদ শুরু হয় ২০২৩ সালের জুলাইয়ে, শেষ হওয়ার কথা ২০২৬ সালের জুনে। প্রকল্পের আওতায় চারটি ছয়তলা কারখানা ভবন, তিনটি ১০ তলা ও চারটি ৬ তলা আবাসিক ভবন, অফিস ভবন, বিদ্যুৎ সাবস্টেশন, ১৫ কিলোমিটার এইচটি লাইনসহ নানা অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। বিনিয়োগকারীদের জন্য কুয়াকাটায় প্রায় ৮ একর জমিতে আলাদা ক্লাব তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।
এই ইপিজেডে কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, পোশাক, ইলেকট্রিক্যাল-ইলেকট্রনিকস এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতের শিল্প গড়ে উঠবে। ইপিজেড চালু হলে প্রত্যক্ষভাবে অন্তত ১ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। পরোক্ষভাবে আরও ২ লাখ মানুষের কাজের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। পটুয়াখালী ইপিজেডে প্রায় ১৮ হাজার ৩৬০ কোটি টাকার বিদেশি বিনিয়োগ আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। উৎপাদন শুরু হলে এখান থেকে বছরে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকার পণ্য রপ্তানি হতে পারে।
পটুয়াখালী ইপিজেড প্রকল্পের পরিচালক শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘গ্যাস থাকলে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা পাওয়া যায়। তবে গ্যাস ছাড়াও শিল্প স্থাপন সম্ভব। উত্তরা ও মোংলা ইপিজেড তার উদাহরণ। ভোলা থেকে বরিশালে গ্যাস আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে করে পটুয়াখালীতেও গ্যাস আসার সুযোগ সৃষ্টি হবে।’
তিনি আরও বলেন, প্রকল্প এলাকার প্রায় ৩০০ একর জমি ইতিমধ্যে প্রস্তুত করা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ সড়ক ও প্রাচীরের কাজ দ্রুতগতিতে চলছে। জমি অধিগ্রহণে ক্ষতিগ্রস্ত ১৫৪ পরিবারের পুনর্বাসনের কাজও চলমান। অনেক বিনিয়োগকারীর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে প্লট বরাদ্দ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। প্লট বরাদ্দের পর শিল্পকারখানা স্থাপনের কাজ শুরু করতে পারবেন বিনিয়োগকারীর। সব মিলিয়ে পটুয়াখালী ইপিজেড দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক মানচিত্রকে সম্পূর্ণরূপে বদলে দেবে।
ক্যাপশন : পটুয়াখালী সদরের ইপিজেড এলাকায় শেষ হয়েছে বালুভরাটের কাজ।