বৈষম্যবিরোধী আইন শুধুই কথার কথা

রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় নিয়মিতই বৈষম্যের শিকার হন দলিত ও পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী। সামাজিক নিগ্রহ ও অস্পৃশ্যতার শিকার এসব ব্যক্তির করা অভিযোগের প্রতিকারও সুদূর পরাহত। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের সংবিধানের প্রস্তাবনায় রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হিসেবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যেখানে সব নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার সুরক্ষা, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক, সামাজিক সাম্য ও তাদের মানবসত্তার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত হবে। তবে, পাঁচ দশকের বেশি সময়ের বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। দলিত, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর প্রতি অবহেলা, তাদের নিরাপত্তাহীনতা, উচ্ছেদের খবর শোনা যায় প্রতিনিয়ত। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম মুখ্য লক্ষ্য ছিল সমাজের সব ক্ষেত্রে বৈষম্য নিরসন। কিন্তু এত রক্তক্ষয়ের পরেও রাষ্ট্রক্ষেত্রে বৈষম্য দূর হয়েছে কি না, সে প্রশ্ন উঠছে। অভ্যুত্থানের পর বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, বৈষম্য ও নিগ্রহের শিকার ব্যক্তিদের সংগঠনসহ বিভিন্ন মহলের প্রত্যাশা ছিল, হয়তো এবার বৈষম্যবিরোধী অধ্যাদেশ জারি হবে। তবে, সেই সরকারের সময়ে এ বিষয়ে কোনো উদ্যাগ নেওয়া হয়নি।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগড়িষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি জোট। সংগত কারণেই রাজনৈতিক সরকারের এই সময়ে একটি বৈষম্যবিরোধী আইনের প্রত্যাশা রয়েছে সংশ্লিষ্টদের। প্রায় চার বছর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এ সংক্রান্ত একটি বিল জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হলেও তাতে অসংগতি থাকায় আপত্তির মুখে মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে যাচাইয়ের জন্য পাঠানো হয়। পরবর্তী সময়ে সেটি আর আলোর মুখ দেখেনি। বৈষম্যবিরোধী আইনের উদ্যোগের বিষয়ে জানতে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি আপাতত কোনো মন্তব্য করতে চাননি। মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের সচিব ড. হাফিজ আহমেদ চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, আইনের বিধান অনুযায়ী, ওই বিলটি মেয়াদোত্তীর্ণ বা অকার্যকর হয়ে গেছে। বর্তমান সরকার বৈষম্যবিরোধী আইন করতে চাইলে নতুন করে প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে।

বাংলাদেশ হরিজন ঐক্য পরিষদের সাবেক সভাপতি কৃষ্ণ লাল হরিজন দেশ রূপান্তরকে জানান, তারা প্রতিনিয়তই বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। চাকরির ক্ষেত্রে হরিজন নাম শুনলে নিয়োগের আগেই তা বাতিল করে দেওয়া হয়। এ ছাড়া তাদের নিরাপত্তাহীনতা, উচ্ছেদের মতো ঘটনার সম্মুখীন হতে হয় প্রতিনিয়ত। দলিত সম্প্রদায়ের মানুষ দেশের অন্যান্য নাগরিকের মতো স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছেন না। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরেই শুনে আসছি বৈষম্যবিরোধী আইন হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারও এ বিষয়ে উদ্যোগ নেয়নি। এখন যেহেতু নতুন নির্বাচিত সরকার এসেছে তাই প্রত্যাশায় আছি যে এবার আইনটি হবে।’

চূড়ান্তের পথে থমকে যায় উদ্যোগ : ২০১৪ সালে জাতীয় আইন কমিশন ও ২০১৮-তে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বৈষম্য বিরোধ রোধে আইন তৈরির উদ্দেশ্যে পৃথক দুটি খসড়া জমা দেয় আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে। সংবিধানের ২৭, ২৮ ও ২৯ অনুচ্ছেদের ভিত্তিতে বৈষম্য বিরোধ আইন তৈরির উদ্যোগ নেয় বিগত আওয়ামী লীগ সরকার। তখনকার মন্ত্রিসভার চূড়ান্ত অনুমোদনসহ সব প্রক্রিয়া শেষে ২০২২-এর ৫ এপ্রিল ‘বৈষম্যবিরোধী বিল- ২০২২’ নামে একটি বিল আইনে পরিণত করতে জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হয়। তবে, বিলের নানা অসংগতি নিয়ে আপত্তি তুলেছিলেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও অস্পৃশ্যতার শিকার ব্যক্তিদের সংগঠনসহ বিএনপির একাধিক সংসদ সদস্য। একপর্যায়ে বিলটি পর্যালোচনা ও যাচাইয়ের জন্য পাঠানো হয় আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে। তখন সরকারের তরফে বলা হয়েছিল, এতে কিছু সংশোধন ও কমিটি মতামত দিলেই দ্রুত আইনে পরিণত করা হবে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এ বিষয়ে আর কোনো উদ্যোগই নেয়নি আওয়ামী লীগ সরকার।

প্রায় চার বছর আগে বিলটি যখন সংসদে উত্থাপিত হয় তাতে বেশ কিছু অসংগতি ছিল স্পষ্ট। বিলে কারও প্রতি বৈষম্য বা বৈষম্যমূলক আচরণ ও কাজকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। বিলের শুরুর দিকে বৈষম্যের সংজ্ঞায় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিষয়টি আসেনি। এছাড়া বিলে ‘বিরোধ’ শব্দচয়নের পরিবর্তে ‘বিলোপ’ শব্দের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে প্রস্তাবও অবজ্ঞা করা হয় তখন। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রতি বৈষম্য হলে কীভাবে আইনের প্রয়োগ ও বিচার হবে, কোন ধরনের বৈষম্য করলে কী পরিমাণ আর্থিক জরিমানা হবে তাও সেই বিলে ছিল না। শুধু তাই নয়, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান দোষী সাব্যস্ত হলে তার সাজা বা দন্ড কী হবে সেটিও সেই বিলে অনুল্লেখ্য ছিল।

অন্যদিকে বৈষম্য নিরোধে ওই বিলে মনিটরিং কমিটির সভাপতি পদে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীসহ ১৪টি মন্ত্রণালয়ের সচিব অথবা সচিব কর্তৃক মনোনীত অন্যান্য যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার ব্যক্তিদের কমিটির সদস্য হিসেবে রাখা হয়। যারা আইনের বিধান বাস্তবায়ন ও বৈষম্যবিরোধী জাতীয় কমিটি, বিভাগীয় কমিটি, জেলা কমিটির কার্যাবলি তদারকি করবেন বলে বলা হয় বিলে। তবে, আমলানির্ভর মনিটরিং কমিটি নিয়ে বিভিন্ন মহলের জোরালো আপত্তি ছিল তখন। তাছাড়া সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বড় ভূমিকা থাকলেও কমিশনের ভূমিকার বিষয়টিকে তখন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এছাড়া দলিত সম্প্রদায় বা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী প্রতিনিয়ত নানাভাবে বৈষম্যের শিকার হলেও বিলটি সংসদে তোলার আগে এসব সম্প্রদায়ের কোনো প্রতিনিধিদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা করেনি তখনকার সরকার।

আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ বিভাগের সচিব হাফিজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, ওই বিলটি (২০২২ সালের এপ্রিলে) ইতিমধ্যে ল্যাপস (মেয়াদোত্তীর্ণ) হয়ে গেছে। এর মধ্যে অনেক সময়ও চলে গেছে। বর্তমান সরকার যদি উদ্যোগ নেয় তাহলে আবার খসড়া তৈরি, স্টেক হোল্ডারদের (অংশীজন) সঙ্গে মতামত, মন্ত্রিসভার অনুমোদন, জাতীয় সংসদে বিল আকারে তোলাসহ পুরো প্রক্রিয়াটা নতুন করে করতে হবে। তিনি বলেন, ‘যে কোনো আইন করা সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয়। কেবল তো সরকার গঠন হলো। বর্তমান সরকার যদি এই আইন চায় তাহলে প্রক্রিয়া শুরু হবে।’

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কমিশনার নূর খান লিটন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সংবিধান অনুযায়ী নারী, পুরুষ, সাদা-কালো কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রতি কোনোরকম বৈষম্যের সুযোগ নেই। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখছি সমাজে এক ধরনের বৈষম্য বিরাজ করছে এবং এটি করা হয় খুব সচেতনভাবে। এই বৈষম্য নিরসনে একটি শক্ত আইন থাকলে এ প্রবণতা কমে আসবে।’ এক প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘বৈষম্য নিরসন বা এ বিষয়ে আইন করতে গেলে মন্ত্রণালয় যদি কোনোরকম সহযোগিতা চায় তাহলে মানবাধিকার কমিশন প্রস্তুত রয়েছে।’