ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যবহৃত বডিওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার শুরু করেছে থানা পুলিশসহ অপারেশনাল ইউনিটগুলো। এখন থেকে পুলিশের সব মোবাইল ডিউটি এবং অপারেশনাল কাজে ক্যামেরা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে প্রতিটা থানায় ন্যূনতম ৫০টি করে ক্যামেরা সরবরাহ করা হয়েছে। এ ছাড়া ট্রাফিক পুলিশের বডিওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার অব্যাহত রয়েছে। ক্যামেরায় ধারণকৃত ফুটেজ সংরক্ষণের জন্য সদর দপ্তরে গড়ে তোলা হয়েছে স্বতন্ত্র নেটওয়ার্ক ও সার্ভার।
থানা পুলিশ ও অপারেশনাল ইউনিটগুলোতে বডিওর্ন ক্যামেরা ব্যবহারের উদ্যোগ নেয় সদর দপ্তর। তবে সেটা কার্যকর হয়নি। ওই সময় ১০ হাজার পিস ক্যামেরা ক্রয় করে পুলিশ। তার মধ্যে বেশিরভাগ ক্যামেরা অকার্যকর হয়ে গেছে। কিছু ক্যামেরা ব্যবহার শুরু করে ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা। এরমধ্যে নির্বাচনে বডিওর্ন ক্যামেরা ব্যবহারের উদ্যোগ নেয় সরকার। এ সময় আরও ২০ হাজার ক্যামেরা ক্রয় করে পুলিশ সদর দপ্তর।
পুলিশের ঊর্ধতন এক কর্মকর্তা বলেন, বিভিন্ন সময় দেখা গেছে, পুলিশ কোনো অভিযানে গিয়ে হামলার শিকার হওয়ার পরও সাধারণ মানুষের অভিযোগের ভিত্তিতে আইনগতভাবেও ভুক্তভোগী হয় পুলিশ সদস্যরা। এখন থেকে কোথাও অপারেশনে যেতে হলে পুলিশ সদস্যদের বাধ্যতামূলকভাবে বডিওর্ন ক্যামেরা বহন করতে হবে। এতে বাহিনী কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে বলে মনে করছি।
পুলিশ সদরদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য বলছে, সারা দেশে পুলিশের হাতে রয়েছে ২৫ হাজার ৫০০ অত্যাধুনিক বডিওর্ন ক্যামেরা। এসব ক্যামেরায় নতুন করে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) সিস্টেম আপডেট করার কাজ করছে পুলিশ। এতে কোনো ব্যক্তির কোথায় অপরাধ (মব, জ¦ালাও-পোড়াওসহ ভাঙচুর) করার ফুটেজ একবার ধারণ করা গেলে, এরপর দেশের কোথাও সে অপরাধে জড়ালে ক্যামেরা স্বংক্রিয়ভাবে সিগন্যাল দেবে। এ ছাড়া অপরাধীকে শনাক্ত করতে পুলিশের কাজ সহজ করে দেবে। বডিওর্ন ক্যামেরা দিয়ে লাইভ স্ট্রিমিং করা যাবে। পুলিশ সদরদপ্তরের মনিটারিং সেলে রাখা হয়েছে পৃথক ব্যবস্থা। কোনো ভোটকেন্দ্রে সহিংসতা সৃষ্টি হলে সঙ্গে সঙ্গে আলাদা মনিটারে লাইভ চলবে। এ জন্য একটি স্বতন্ত্র সুরক্ষিত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে পুলিশ সদরদপ্তর। এ ছাড়া পুলিশের নিজস্ব ডাটা সেন্টারে সংরক্ষিত থাকবে ভোটের দিনের ধারণকৃত ছবি ও ভিডিও।
নির্বাচনে ব্যবহৃত বডিওর্ন ক্যামেরার মধ্যে আধুনিক ফিচারের এসব ক্যামেরা ভোটের সময় জুড়ে অনলাইন লাইভে ছিল। ক্যামেরা একসঙ্গে ছয় জায়গায় থানার ডক স্টেশন, ডিসি-এসপি কার্যালয়, মেট্রোপলিটন-রেঞ্জ কার্যালয়, পুলিশ সদরদপ্তর, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মনিটারিং সেল এবং প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে বসানো সেলে লাইভ চলেছিল। পুরো বিষয়টি মনিটরিং করে সদরদপ্তরের টেকনিক্যাল ইউনিট।
এই সময়ে সাইবার হামলার মাধ্যমে হ্যাকিং করে কেউ যাতে অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি তৈরি করতে না পারে, সেই বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। অনলাইন নেটওয়ার্কে অনুপ্রবেশ করতে না পারে, এ জন্য শক্তিশালী নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। সন্দেহজনক কোনো ট্রাফিক এই নেটওয়ার্কে এলে অ্যালার্ট ও অটো ব্লকের ব্যবস্থা করা হয়েছে। হ্যাকিংয়ের চেষ্টা করলে সঙ্গে সঙ্গে তা শক্তিশালী প্রতিরোধ করার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এর জন্য সাইবার পুলিশ ইউনিটকে সর্তক অবস্থানে রাখা হয়।
বডিওর্ন ক্যামেরা অপারের্টিংয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনলাইনে থাকা বডিওর্ন ক্যামেরার জন্য ডক স্টেশন, সার্ভার ও ক্লাউডভিত্তিক ডেটা ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হচ্ছে। এই নেটওয়ার্কের কোনো স্তরে নিরাপত্তা দুর্বল হলে ভোটের সংবেদনশীল ভিডিও ফাঁস, প্রমাণ নষ্ট কিংবা তথ্য বিকৃতির ঘটনা ঘটতে পারে। সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হ্যাকাররা সুযোগ পেলে আগের সহিংসতার ভিডিও ছড়িয়ে দিতে পারে। এসব বিষয় মাথায় রেখেই বডিওর্ন ক্যামেরার অনলাইন নেটওয়ার্কে শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা হয়েছে। সন্দেহজনক কোনো ডেটা পেলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিগ্যানাল দেবে।
সাইবার হামলার পাশাপাশি পুলিশ সদস্যদের ভেতরের অপব্যবহার ঠেকাতে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ধারণকৃত ভিডিও নির্দিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যদের কে কখন কোন ভিডিও দেখবে, তা ব্যবহার করবে এ বিষয়েও সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের কথা জানিয়েছে পুলিশ সদরদপ্তর। এ জন্য ভিডিও ব্যবহারে মাল্টি-ফ্যাক্টর ভেরিফিকেশন চালু এবং প্রতিটি অডিট লগ সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। এসব লগ পরিবর্তন বা মুছে ফেলার সুযোগ নেই।
পুলিশ সদরদপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশের সব থানায় ৫০টির অধিক ক্যামেরা দেওয়া হয়েছে। যা ইতিমধ্যে অপারেশনে ব্যবহৃত হচ্ছে। ক্যামেরার ব্যাটারি ৬ ঘণ্টা সাপোর্ট দেবে। এ জন্য প্রতি সদস্যের কাছে একাধিক ব্যাকআপ ব্যাটারি দেওয়া হয়েছে। একটি ক্যামেরা ২৪-৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত লাইভে রেখে দেখা হয়েছে। এর মধ্যে ছোটখাটো যেসব সমস্যা ধরা পড়েছে, সেসব কাটিয়ে তোলা হচ্ছে।
পুলিশ সদরদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বডিওর্ন ক্যামেরা ব্যবহারের সুবিধার্থে দেশের প্রতিটি থানায় ডক স্টেশন করা হয়েছে। ওই স্টেশন থেকে তার আওতাধীন ব্যবহৃত ক্যামেরা মনিটরিং করবে। প্রতিটি ডক স্টেশন একেকটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে। থানার নির্ধারিত একজন করে উপপরিদর্শক (এসআই) পদ মর্যাদার পুলিশ কর্মকর্তা স্টেশনে বসে মাঠের সব কার্যক্রম মনিটরিং করবেন। এ ছাড়া পুলিশ কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজি, উপ-পুলিশ কমিশনার ও পুলিশ সুপারের দপ্তরে পৃথক ডক স্টেশন প্ল্যাটফর্ম থাকবে। এর জন্য সারা দেশে ৭২০টি প্ল্যাটফর্ম বসানো হচ্ছে।
পুলিশের মুখপাত্র এ.এইচ.এম. শাহাদাত হোসাইন দেশ রূপান্তরকে বলেন, পুলিশের অপারেশনাল কাজে স্বচ্ছতা নিয়ে আসতে বডিওর্ন ক্যামেরার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। দেশের সব থানায় ইতিমধ্যে ক্যামেরা পৌঁছে গেছে। ব্যবহারও শুরু হয়েছে।